Published : 04 Aug 2026, 05:07 PM
কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, দম আটকে আসা এবং তীব্র মৃত্যুর ভয়ে শরীর অবশ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বলা হয়।
হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে প্রিয় কোনো মানুষের এমন আকস্মিক ছটফটানি বা তীব্র ভয় চোখের সামনে দেখলে যে কেউ নিজেই ভয় পেয়ে যান এবং বুঝতে পারেন না তৎক্ষণাৎ কী করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, ‘প্যানিক অ্যাটাক’ সাধারণত ৫ থেকে ৩০ মিনিটের মতো স্থায়ী হয় এবং এটি শারীরিকভাবে বিপজ্জনক বা প্রাণঘাতী নয়, তবে ওই মুহূর্তে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে প্রতিটি সেকেন্ড অন্তহীন মনে হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘কাম ডটকম’য়ে-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মার্কিন মনোবিদ ডা. ক্রিস মোসুনিক বলেন, “প্যানিক অ্যাটাকের সময় ভুল সান্ত্বনা বা জোর করে শান্ত করার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে।”
তাই আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া কোনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিক রক্ষাকবচ দেওয়ার ৮টি পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন এই মনোবিদ।
নিজের মনকে সবার আগে শান্ত করা
প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তি ওই মুহূর্তে চারপাশের পরিবেশ থেকে তীব্র অনিরাপত্তা অনুভব করেন। তাই পাশে থাকা মানুষটি যদি নিজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তবে রোগীর ভয় আরও বেড়ে যায়।
এর প্রতিকারে প্রথমে নিজেকে গভীর শ্বাস নিয়ে শান্ত করতে হবে, গলার আওয়াজ নিচু ও নরম রাখতে হবে এবং খুব ধীরস্থায়ীভাবে নড়াচড়া করতে হবে।
পাশে থাকা মানুষের এই বাহ্যিক স্থিরতা, রোগীকে অবচেতনভাবেই একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
নীরব ও স্থির উপস্থিতি বজায় রাখা
আতঙ্কের সময় মানুষের মনকে চারপাশের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা একা করে দেয়। তাই কোনো কথা না বলে শুধু রোগীর পাশে শান্তভাবে বসে থাকা জরুরি। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি একা থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে তাকে জোর না করে শুধু এটুকু বলা উপকারী যে— ‘ঠিক আছে, আমি তোমার খুব কাছেই আছি’। আর প্রতি কয়েক মিনিট পর পর তার খোঁজ নেওয়া ভালো।
স্পর্শ করার আগে অনুমতি নেওয়া
ভয় পাওয়া মানুষটিকে থামাতে, অনেকে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরেন বা হাত চেপে ধরেন।
তবে মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, তীব্র আতঙ্কের সময় হুট করে শরীর স্পর্শ করলে অনেকে এটিকে অন্য কোনো আক্রমণ বা শ্বাসরোধের মতো আরও বড় হুমকি মনে করতে পারেন।
তাই তার হাত ধরার আগে বা কাঁধে হাত দেওয়ার আগে খুব নরম সুরে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া উচিত যে, সে স্পর্শ চাইছে কি না।
ছোট ও আশ্বস্ত করার মতো বাক্য বলা
এই সময়ে বড় কোনো প্রশ্ন করা, যেমন— ‘কী হয়েছে?’ বা ‘এমন কেন হচ্ছে?’, মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।
এর বদলে খুব ছোট ও সহজ বাক্য ব্যবহার করা উচিত, যেমন— ‘আমি তোমার সাথেই আছি’, ‘তুমি এখন পুরোপুরি নিরাপদ’ বা ‘তোমার ভয়ের কিছু নেই’।
গভীর ও ধীর শ্বাসের মডেল হওয়া
আতঙ্কিত হলে মানুষ খুব দ্রুত ও অগভীরভাবে শ্বাস নেয়, যা রক্তে অক্সিজেনের ভারসাম্য নষ্ট করে মাথা ঘোরাভাব সৃষ্টি করে।
রোগীকে মুখে ‘লম্বা শ্বাস নাও’ বলার চেয়ে নিজের শরীর দিয়ে তার সামনে একটি সঠিক ছন্দ বা রিদম তৈরি করা বেশি কার্যকর।
রোগীকে চোখের দিকে তাকাতে বলে নিজের ৪ সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া এবং ৬ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে ধীর গতিতে শ্বাস ছাড়ার কসরতটি দেখালে, রোগীও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গতি অনুসরণ করতে শুরু করে।
‘৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং টেকনিক’
কারও মন যখন আতঙ্কের কাল্পনিক জগতে হারিয়ে যায়, তখন তাকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘গ্রাউন্ডিং’ থেরাপি জাদুকরী ভূমিকা রাখে।
এজন্য রোগীকে চারপাশের পরিবেশ থেকে নিচের ৫টি জিনিস খুব ধীরে ধীরে মুখে বলতে উৎসাহিত করা উপকারী।
৫টি জিনিস: যা চোখ দিয়ে দেখা যাচ্ছে।
৪টি জিনিস: যা হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাচ্ছে।
৩টি জিনিস: যা কান দিয়ে শোনা যাচ্ছে।
২টি জিনিস: যার গন্ধ নাক দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে।
১টি জিনিস: যার স্বাদ মুখ দিয়ে অনুভব করা যাচ্ছে।
শান্ত ও কোলাহলমুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া
যদি ‘প্যানিক অ্যাটাক’টি কোনো জনাকীর্ণ রাস্তা, বাস, কনসার্ট বা শপিং মলের মতো অতিরিক্ত আলো ও শব্দের জায়গায় হয়, তবে রোগীকে দ্রুত কোনো শান্ত, মৃদু আলো এবং বাতাস চলাচল করে এমন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
তবে স্থান পরিবর্তনের আগে অবশ্যই তাকে আলতো করে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া নিরাপদ।
জরুরি সেবার সময় জানা
সাধারণ ‘প্যানিক অ্যাটাক’ ক্ষতিকর না হলেও, যদি রোগীর তীব্র বুক ব্যথা ৩০ মিনিটের পরও না কমে, যদি অজ্ঞান বা অবশ হয়ে যায়, তীব্র শ্বাসকষ্ট হতে থাকে বা আগে কোনো হৃদরোগের ইতিহাস থাকে, তবে এটিকে প্যানিক অ্যাটাক ভেবে ঘরে ফেলে রাখা চরম ভুল হবে।
এক্ষেত্রে একটুও দেরি না করে অবিলম্বে রোগীকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকা বাধ্যতামূলক।
যা করা থেকে বিরত থাকা উচিত
‘শান্ত হও’ বলা যাবে না: রোগীকে ভুলেও ‘শান্ত হও’ বা ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বা ‘তুমি নাটক করছ’— এই ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যাবে না। এটি রোগীর মনে তীব্র ক্ষোভ, লজ্জা এবং মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ফোন ব্যবহার না করা: রোগীর কষ্টের সময় পাশে বসে মোবাইল স্ক্রোল করা বা টেক্সট করা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এটি রোগীকে আরও বেশি একাকী করে তোলে।
শান্ত হওয়ার পর
‘প্যানিক অ্যাটাক’ পুরোপুরি কেটে যাওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন।
এই সময়ে তাকে কোনো প্রশ্ন না করে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি দেওয়া এবং কিছুক্ষণ শান্তিতে ঘুমানোর বা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই তাকে সুস্থ করে তুলবে।
আরও পড়ুন
নির্দিষ্ট সময়সীমার কাছাকাছি আসলেই কেন বাড়ে কাজের গতি?