Published : 27 Dec 2025, 06:54 PM
ঢাকার ধানমণ্ডির সাতমসজিদ সড়কের পাশের বড় ভবনের রেস্তোরাঁ আর ভাসমান ‘ফুড-কার্ট’গুলোতে সন্ধ্যা হতেই জ্বলে ওঠে রঙিন সাইনবোর্ড। পুরো এলাকা জুড়ে কাবাবের রেস্তোরাঁ আর ছোটখাট দোকানের কমতি নেই। তাই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেই বাতাসে ভেসে আসে কয়লার আগুনে ঝলসানো মাংসের ঘ্রাণ।
আর এই ঘ্রাণই যেন জানান দেয় এখন কাবাবের সময়। বিশেষ করে শীতের সন্ধ্যায় ধানমণ্ডি আর ঝিগাতলার রাস্তায় হাঁটলে বোঝা যায়, কাবাব শুধু খাবার নয়, এটি শীতকালীন ঢাকাই জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
শীতে কাবাব যে কারণে জনপ্রিয়
শীতকালে স্বাভাবিকভাবেই গরম গরম খাবারের দিকে ঝোঁক থাকে। পাশাপাশি মজাদার তবে শক্তি মিলবে এমন খাবারের চাহিদাও থাকে।
ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় হালকা খাবারের চেয়ে ভারী, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি তৃপ্তি দেয়। কাবাব সেই চাহিদাই পূরণ করে। কয়লার আগুনে তৈরি কাবাব গরম থাকে, মসলার ঝাঁজ শরীরে উষ্ণতাও আনে।
ধানমন্ডি ‘কাবাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’- এর জ্যেষ্ঠ খাদ্য-পরিবেশক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, “কাবাবের চাহিদা থাকে সারা বছর তবে শীতে কিছুটা বাড়ে। প্রতিদিন প্রায় ১০ কেজির গরুর মাংসের কাবাব আর ৮০টি মুরগির বিভিন্ন ধরনের কাবাব তৈরি হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত চলে খাওয়া-দাওয়া। বলা যায় শীতে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় চাহিদা।”

ধানমণ্ডি: কাবাবপ্রেমীদের পরিচিত ঠিকানা
ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকা বহু ধরনের খাবারের জন্যই পরিচিত। সন্ধ্যায় এই এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি রেস্তোরাঁর আলোক সজ্জা, যার অনেকগুলোতেই কাবাব বিশেষ আকর্ষণ।
এই এলাকার সব থেকে পুরানো আর জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ হল স্টার কাবাব। ধানমণ্ডি ১৯ নম্বর সড়কের এই কাবাবের দোকানে বিকাল থেকে কাবাব তৈরির কাজ শুরু হয়।
গরু, খাসি ও মুরগির বিভিন্ন ধরনের কাবাবের স্বাদ এখানে ক্রেতাদের ধরে রাখে। অনেকেই বসে খেতে পছন্দ করেন, কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে কিনে নিয়ে যান আর দুটোর একটিতেই যারা নেই তারা ঘরেই অর্ডার করে কিনে কাবাবের স্বাদ নেন।
এছাড়া ধানমণ্ডি দুইয়ের এই রেস্তোরাঁর শাখায় একটু বেলা হলেই পাওয়া যায় সব রকমের কাবাব।
এই এলাকায় গরু ও খাসির মাংসের শিক কাবাব আর বেহারি কাবাব মূল আকর্ষণ হয়ে উঠছে। দাম তুলনামূলক মাঝারি হলেও স্বাদের প্রশংসা আছে।
গরম লাচ্ছা পরোটার সঙ্গে কাবাবের ‘স্মোকি’ ঘ্রাণ শীতের সন্ধ্যায় অনেকের কাছেই আলাদা।
ধানমণ্ডির আরও আকর্ষণ হল বহুতল ভবনের ভেতরে থাকা আধুনিক গ্রিল ও কাবাব রেস্তোরাঁগুলো। পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে বসে খাওয়ার জন্য এসব জায়গা জনপ্রিয়।
এখানে কাবাবের দাম একটু বেশি হলেও পরিবেশ আর স্বাদের কারণে ক্রেতারা এখানে যেতে পছন্দ করেন।

ঝিগাতলা: পুরানো স্বাদের খোঁজে
ধানমণ্ডির পাশেই ঝিগাতলা এলাকা। এখানে কাবাবের দোকানগুলো তুলনামূলক ছোট হলেও স্বাদের দিক দিয়ে ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়।
ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে থাকা কাবাব ঘরগুলোতে সন্ধ্যার পর ভিড় লেগেই থাকে। শামি কাবাব, চাপ কাবাব আর শিক কাবাব এখানকার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া আইটেম।
এই এলাকায় রাশিন নামের এক ক্রেতা বলেন, “ঝিগাতলার কাবাবে এখনও পুরান ঢাকার স্বাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়।”
ঝিগাতলার ছোট এক কাবাব দোকানের দোকানি ফয়সাল জানান, তার কাবাবের মূল মজাই হল মসলার সঠিক ব্যবহার আর ধৈর্য ধরে মাংস তৈরি করা।
শীতের সময়ে সে আগুনের তাপ ঠিক রেখে কাবাব বানায়, যাতে মাংস শুকিয়ে না যায়, আবার কাঁচাও না থাকে।

বাংলাদেশে জনপ্রিয় কাবাবের ধরন
বাংলাদেশে কাবাবের ধরন অনেক হলেও শীতের মৌসুমে কিছু নির্দিষ্ট কাবাবই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শিক কাবাব প্রায় সব জায়গাতেই পাওয়া যায় এবং এটি সবচেয়ে পরিচিত। বেহারি কাবাব এর মসলাদার স্বাদ আর নরম গঠনের জন্য শীতের বিশেষ আকর্ষণ।
চাপ কাবাব সাধারণত খাসির মাংসে তৈরি হয় এবং এর ঝাল ও ঘন স্বাদ শীতে বেশ মানানসই।
শামি কাবাব তুলনামূলক হালকা হলেও সন্ধ্যার নাশতায় এর জনপ্রিয়তা কম নয়।
বটি কাবাব, টিক্কা কাবাব, হারিয়ালি কাবাবও চলে সমান তালে। রেশমি ও আফগানি কাবাবও এখন ধানমণ্ডির আধুনিক রেস্তোরাঁগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে।

কাবাবের সঙ্গে যা না হলে চলে-ই না
কাবাবের স্বাদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সঙ্গে থাকে উপযুক্ত রুটি।
কাবাব দোকানগুলোতে লাচ্ছা পরোটা অনেক বেশি জনপ্রিয়। পাশাপাশি তন্দুরি নান, বাটার নান, গার্লিক নান, রুমালি রুটি আর খামিরি রুটির চাহিদাও কম নয়।
কাবাবের সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, শসা, লেবু আর সবুজ চাটনির বিশেষ এক সালাদ থাকে যা বাড়ায় খাবাবের মজা।
কেউ কেউ আবার গরম ডাল বা হালকা ঝোল সবজি যোগ করে নেন, যাতে খাবার আরও জমে ওঠে। আর ঝাল ঝাল, গরম কাবাবের পর মিষ্টি ধরনের খাবার খেতে পছন্দ করেন অনেকেই, যেমন- নানান স্বাদের লাড্ডু বা মালাই শাহি টুকরা।

রাস্তার পাশে যদি এমন খাবার খেতে চান যেতে হবে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে সেখানে ছোট দোকানে মিষ্টির দোকান পেয়ে যাবেন।
দেশি, মুঘলাই বা অন্য সব ধরনের কাবাবের দামই তুলনামূলক সস্তা। শিক কাবাব জায়গা ভেদে ১২০ থেকে ১৮০ টাকা, বেহারি কাবাব ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, শামি কাবাব ৫০ থেকে ৭০ টাকা, চাপ কাবাব ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। নরম গ্রিলড কাবাব, ধরন ভেদে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা হতে পারে।
আরও পড়ুন
অর্গানিক খাবারের রেস্তোরাঁ নিয়ে স্বাগতা