Published : 12 Apr 2026, 05:16 PM
পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাতের সঙ্গে হরেক রকমের ভর্তা (যেমন- আলু, বেগুন, শুঁটকি, কালোজিরা) বাঙালির ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আর রেস্তোরাঁয় গিয়ে বাংলা খাবারের স্বাদ নওয়া যায় অনায়াসে।
রাজধানীর কয়েকটি রেস্তোরাঁয় ঘুর জানা গেল বাঙালি খাবারের আয়োজনগুলো।
নিরব হোটেল
গ্রীষ্মের গরমে মন যখন চায় ঘরের মতো সাদামাটা কিন্তু মুখরোচক খাবার, তখন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের ‘নিরব হোটেল’ অনেকেরই প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে। এখানে নেই কোনো আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা, তবে আছে নানান ধরনের বাংলা খাবার।
রেস্তোরাঁটির অন্যতম আকর্ষণ হল- প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ রকমের ভর্তা-ভাজি। বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা, টমেটো ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, চিংড়ি ভর্তা, ইলিশ ভর্তা, কলিজা ভুনা, মগজ ভুনা— নাম বলে শেষ করা যাবে না।
ফলে ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার, সবাই এখানে স্বচ্ছন্দে খেতে আসেন।
বাঙালিয়ানা ভোজ
ঢাকার পান্থপথ এলাকায় অবস্থিত এই রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় নানান পদের ভর্তা। আলু, বেগুন, শুঁটকি, টাকি মাছ, কালিজিরা— সবই মিলবে।

এই রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ জানালেন, “এখানে বসে খেলে একটা প্যাকেজ আছে ১৬৯ টাকার, বুফেতে ১১ পদের ভর্তা-ভাত-ডাল খাওয়ার সুযোগ আছে। খিচুড়ির প্ল্যাটার আছে চিকেন, মাটন হাস, কালাভুনা। অনেকে এখানে পান্তা ভাত ও ইলিশ খেতে আসেন পহেলা বৈশাখে।”
ঢাকার একটি দুতাবাসের কর্মকতা সায়মা আকতার দুপুরে খাচ্ছিলেন বাঙালিয়ানা ভোজে।
তার কথায়, “বসুন্ধারায় আমাদের বাসা। এই এলাকায় কাজে আসলে বাইরে খাই। যেহেতু পান্থপথে কয়েকটি হাসপাতাল, ডাক্তারের চেম্বার আর বিভিন্ন রুটের বাস কাউন্টার হওয়ায় এইসব রেস্তোরাঁয় ভীড় থাকে।”
অষ্টব্যঞ্জন
পান্থপথ, উত্তরা ও ওয়ারীতে শাখা রয়েছে। এখানে থালি মেনুতে থাকে কমপক্ষে তিন-চার ধরনের ভর্তা, শাকভাজি, দেশি মাছ ও ডাল। খাবারের স্বাদ ঘরোয়া, তবে পরিবেশ পরিপাটি।

ব্যবস্থাপক মো. আফনান জানালেন প্রতিদিন প্রায় ১০ রকমের ভর্তা থাকে। এছাড়াও খিচুড়ির বেশকিছু প্ল্যাটার আছে।
দূরবীন বাংলা
মহাখালির বীর উত্তম একে খন্দকার সড়কে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন চলবে টানা ৩ দিন — ১৩, ১৪ ও ১৫ এপ্রিল। ত

এখানকার ব্যবস্থাপক অনিক বলেন বিশেষ প্ল্যাটারে থাকছে, “পান্তা ভাত, সর্ষে ধোঁয়া ইলিশ ভাজা, বেগুন ভাজি, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, শুটকি ভর্তা, বরবটি ভর্তা, মরিচ ভর্তা, মিষ্টি কুমড়া ভর্তা, পেঁয়াজ ভর্তা।”
‘দূরবীন বাংলার ওয়েটিং জোনে’র চেয়ারে অপেক্ষা করতে হয়। টেবিল খালি হলেই বসার ব্যবস্থা হয়।
বাবুমশাই হেরিটেজ
ঢাকার কলাবাগান বাস স্ট্যান্ডের কাছেই দোতালায় বাবুমশাই হেরিটেজ।

ব্যবস্থাপক কিশোর সমাদ্দার বললেন “বৈশাখ উপলক্ষ্যে কয়েকটি প্ল্যাটার থাকছে। ইলিশ ভাজা, পান্তা ভাত, আলু ভর্তা, ডাল চচ্চড়ি, কাঁচা কলার ভর্তা, ইলিশ মাছ ভর্তা, বেগুন ভর্তা, মরিচের ভর্তা, সালাদ, নাড়ু- দাম ৪৩০ টাকা। আরেকটি ৩৩০টাকা।
এছাড়াও ল্যাটকা খিচুড়ি সাথে থাকছে জিভে জল আনা গরুর ঝুরা মাংস।
পাতুরি
বনানীতে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁর নামেই জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্য। মাছের পাতুরির পাশাপাশি নানান পদের ভর্তা ও দেশি খাবার পাওয়া যায়।

পরিবেশ ছিমছাম এবং খাবারে রয়েছে ঘরোয়া ছোঁয়া।
বিন্নি রেস্তোরাঁ
ঢাকার গুলশান-১ নম্বরে বিন্নি রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন স্বাদের খিচুড়ি ও বিরিয়ানির জন্য পরিচিত। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মো. রাকিব বললেন, “বৈশাখ উপলক্ষ্যে বিশেষ আয়োজনে থাকছে পান্তা ইলিশ, খিচুড়ির সহ অন্যান্য পদ।”
ভেতো বাঙালি
বেইলি রোডে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় রকমারি ডালের পদ, শাকসবজির ভাজি, শুঁটকি ভর্তা ও ঐতিহ্যবাহী খাবার।

এখানে নদীর মাছ, নানান পদের ভর্তা, ভুনা খিচুড়ি, খাসি ও মুরগির মাংসের জনপ্রিয়। পদগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।
নিরামিষ রেস্তোরাঁয়
রাজধানীর তাঁতিবাজার ও শাঁখারিবাজারের ‘জগন্নাথ ভোজনালয়’, ‘হরে কৃষ্ণ ভোজনালয়’, ‘অনুরাধা ভোজনালয়’, ‘আদি গোবিন্দ হোটেল’, ‘মদনমোহন ভোজনালয়’ এবং ‘জয় মা তারা’ ভোজনালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ভোজনপ্রেমীদের ভিড়ে মুখরিত থাকে।
এই ভোজনালয়গুলো শুধু খাবার পরিবেশন করে না, বরং প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার ঐতিহ্যকেও সংরক্ষণ করে।
যেখানে প্রবেশ করলেই একটি ঘরোয়া পরিবেশ অনুভূত হয়।
আর গরম ভাতের প্লেটের সাথে একটি ট্রেতে সুসজ্জিতভাবে মিলবে ১২ থেকে ১৪ রকমের নিরামিষ তরকারি।
এর মধ্যে রয়েছে কাঁচা কলার রসা, মটর ডাল, সাগুদানা ভুনা, পাঁচ তরকারি, লাউ তরকারি, ছানার রসা, কাশ্মিরি পনির, আলু-পটলের রসা, মুগ ডাল, বুটের ডাল, বিভিন্ন শাকভর্তা, সয়াবিন সবজি, কলার মোচার তরকারি এবং পটল-সরিষা ভুনা।
জগন্নাথ ভোজনালয়- একটি নিরামিষ আশ্রয়: জগন্নাথ ভোজনালয়, তাঁতিবাজারের ১১০ নম্বরে একটি ভবনের দোতলায় অবস্থিত। নিরামিষ খাবারের একটি প্রধান কেন্দ্র বলা যেতেই পারে। এই ভোজনালয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০টি নিরামিষ পদ তৈরি হয়।

যার মধ্যে রয়েছে ভর্তা, ডাল, ছানা, বড়া, সয়াবিন, রসা এবং ধোকা। শেষ পাতে পায়েস এবং চাটনি পরিবেশন করা হয়।
একাদশীর সময় এখানে বিশেষ খাবারের আয়োজন থাকে। যেমন- পুষ্পান্ন, খিচুড়ি, সাগুদানা ভুনা এবং শ্যামা দানার পায়েস। রান্নায় পেঁয়াজ-রসুন বাদ দিয়ে শুধু আদা এবং কাঁচা মরিচ ব্যবহার করা হয়।
বিভিন্ন পদের দাম ১০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। আর এক প্লেট ভাতের দাম ১৫ টাকা। অতিরিক্ত ভাত ৫ টাকায় পাওয়া যায়।
ভোজনালয়ে একসঙ্গে ৩৫ থেকে ৩৬ জন খেতে পারেন। তবে দুপুর ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ভিড় বেশি থাকে।
জগন্নাথ ভোজনালয় পরিচালনাকারীদের একজন গোবিন্দ কৃষ্ণ দাস বলেন, “আমরা প্রতিদিনের চাহিদা হিসেব করে রান্না করি, যাতে খাবার নষ্ট না হয়। নিরামিষ খাবার বাসি হলে কালচে হয়ে যায়, তাই তরতাজা খাবার পরিবেশনই আমাদের লক্ষ্য।”
এই ভোজনালয়গুলো শুধু খাবারের দোকান নয়। পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
অনুরাধা ভোজনালয়: ৪ তাঁতিবাজারে এটি অবস্থিত।

পরিচালনাকারীদের একজন গোকুল চন্দ্র তথ্য দেন- নাস্তা সকাল ৮টা থেকে পাওয়া যায়। অন্নভোজ ২৫টিরও বেশি পদ সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়।
এখানকার খাবারে ঐতিহ্য, স্বাদ এবং হৃদয়ের উষ্ণতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে। যারা বাঙালি রান্নার স্বাদে তৃপ্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য এই ভোজনালয়গুলো একটি আদর্শ গন্তব্য হতে পারে।
আরও পড়ুন