Published : 16 Jun 2023, 05:13 PM
টানা সাত বছর মালিকের অধীনে কাজ করার পরে হ্যানস শেষ পর্যন্ত তাকে বলল, মালিক, আমার মনে হয় যথেষ্ট করেছি; এবারে আমার পাওনাটা মিটিয়ে দিন, আমি নিজের বাড়ি ফিরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
মালিক বললেন, তুমি তো বড়ো বিশ্বাসী আর বিনয়ী কাজের লোক ছিলে হে, সেই হিসেবে তোমার বেতনটাও ভালো হওয়া উচিত। মালিক তখন তাকে একতাল রুপো দিলেন যা ঠিক হ্যানসের মাথার সমান। হ্যানস কোমর থেকে বড়োসড়ো গামছাটা বিছিয়ে রুপোর টুকরোটা তাতে পেঁচাল। তারপর সেটা ঘাড়ের পেছনে ঝুলিয়ে নিয়ে খুশিমনে রওনা দিল বাড়ির পথে।
হ্যানস যখন অলসভাবে একটার পরে একটা পা ফেলে রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল, দেখল হাসিখুশি এক লোক ঘোড়ায় চেপে দুলকি চালে হ্যানসের পাশে পাশে এগিয়ে যাচ্ছে। বাহ্, বিস্ময়ে হ্যানসের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ঘোড়ার পিঠে চড়ে এভাবে যাওয়া নিশ্চয় খুব মজার! লোকটি ঘোড়ার পিঠে এত আরামে বসে আছে যে দেখে মনে হচ্ছে নিজের বাড়িতে আরামদায়ক কোনো চেয়ারে বসে আছে। ভেবেই পাই না যে কী করে লোকটি কোনো পাথরে হোঁচটও খায় না, জুতোতে এতটুকু আঘাতও লাগতে দেয় না, আবার সবকিছু সামলে সোজা হয়ে বসেও আছে।
ঘোড়ার পিঠে বসা লোকটি হ্যানসের কথা শুনে ফেলল। বলল, তা যা বলেছ, হ্যানস। কিন্তু তুমি তাহলে পায়ে হেঁটে যাও কেন?
কী করি! হ্যানস বলল, আমার তো এই ভারি জিনিসটা বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে; সত্যি কথা বলতে কী, এটা রুপোর, আমি তো এর ভারে মাথাটাই সোজা করতে পারছি না। আর দুঃখের কথা কী বলব, এটা আমার ঘাড়টাকেও একেবারে ব্যথায় কুঁকড়ে দিচ্ছে।
আচ্ছা, তবে বদলে নাও না কেন? ঘোড়ার পিঠ থেকে লোকটি বলল। আমি তোমাকে আমার ঘোড়াটা দিয়ে দিই আর তুমি আমাকে দিয়ে দাও তোমার ভারি রুপোর টুকরোটা।
দিতে পারলে আমি খুশিই হবো, হ্যানস বলল, কিন্তু সমস্যা কী জানো, এটা টেনে নিয়ে যেতে তোমার কিন্তু খুব কষ্ট হবে।
লোকটি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। হ্যানসের হাত থেকে রুপোর দলাটা নিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিল ঘোড়ার লাগামটা। ঘোড়ার পিঠে চড়তেও সাহায্য করল হ্যানসকে। তারপর বলল, যখন তুমি অনেক দ্রুত যেতে চাইবে, তখন ঠোঁট চেপে নিয়ে একটু চাপ দিয়ে আলাদা করে জোরে জোরে শব্দ করবে। তারপর চিৎকার করে বলবে, হাট্ হাট্।
ঘোড়ার পিঠে চড়ে হ্যানস খুব খুশি হলো। ধীরে ধীরে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে তার মনে হলো আরেকটু দ্রুত গেলে মন্দ হয় না। আর তাই সে দুই ঠোঁট একসঙ্গে করে জোরে জোরে খুলতে লাগল, বিচিত্র আওয়াজ করে নিয়ে হাট্ হাট্ বলে চিৎকার করতে লাগল। ঘোড়াটি সর্বশক্তি দিয়ে তার সর্বোচ্চ গতিতে দৌড় লাগাল। হ্যানস বুঝতেই পারল না তখন তার কী করা উচিত। আর তাই মুহূর্তেই ঘোড়ার পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল রাস্তার ধারের এক ডোবায়।
হ্যানসের ঘোড়াটা দ্রুত ছুটে হারিয়েই যেত যদি তখন রাস্তার উল্টোদিক থেকে একটি গরু খেদিয়ে নিয়ে আসা রাখাল তাকে না ঠেকাত। হ্যানস তাড়াতাড়ি ধাতস্থ হলো আর কোনরকমে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের উপর খানিকটা বিরক্ত আর হতাশ হয়ে সে রাখালকে বলল, এরকম একটা বন্য জন্তুর পিঠে চড়ে পথ পাড়ি দেওয়া মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। বোকা জন্তুটা এমন জোরে লাফ দিয়েছে আর পিঠ থেকে আমাকে এমনভাবে উড়িয়ে ফেলেছে যেন সে আমার ঘাড়টা আরেকটু হলে ভেঙেই দিয়েছিল আর কী।
যাই হোক, এরকম একটা জন্তু থেকে আমার মন একেবারে উঠে গেছে। তোমার গরুটা কিন্তু এর থেকে অনেক ভালো; মালিক তার পেছনে পেছনে অবসর সময়ে বেশ আরাম করে হেঁটে যেতে পারে, আবার গরুটা থেকে প্রতিদিন অনায়াসে কম-বেশি দুধ, মাখন বা পনিরও পেতে পারে।
কী করলে আমি এরকম একটা গরু পেতে পারি বলতে পার?
ভালো কথা, রাখাল বলল। তোমার যখন আমার গরুটাকে এতই পছন্দ, তবে তোমার ঘোড়ার বদলে নিয়ে নিলেই তো পার!
অবশ্যই! খুশিমনে হ্যানস বলে উঠল। রাখাল লাফিয়ে ঘোড়ায় চড়ল আর মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল। হ্যানস মনে মনে ভাবল, ভালো জেতা জিতেছে সে। তারপর ধীরে ধীরে গরুটা নিয়ে হাঁটা দিল।
আমার কাছে যদি কেবল এক টুকরো রুটি থাকে (অন্তত এক টুকরো রুটি তো আমি কোথাও না কোথাও থেকে জোগাড় করেই ফেলব), তবে আমি যখন খুশি তখন মাখন কিংবা পনির দিয়ে রুটিটা খেতে পারি। আবার যদি আমার পিপাসা লাগে তবে অনায়াসে গরুটা দুইয়ে দুধ খেয়ে নিতে পারি। এর চেয়ে বেশি আর কী চাই আমার? মহানন্দে বলল হ্যানস। হাঁটতে হাঁটতে সে একটা রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। সেখানে এসে কিছু রুটি খেল আর নিজের কাছে থাকা শেষ পয়সাটা পর্যন্ত খরচ করে খুব করে বিয়ার খেয়ে নিল। তারপর গরুটা নিয়ে মায়ের গ্রামের দিকে রওনা দিল।
দুপুর হতে না হতেই গরম বাড়তে লাগল। দুপুর নাগাদ হ্যানস সবুজ লতাপাতা বিছানো চওড়া একটা মাঠের প্রান্তে এসে উপস্থিত হলো যা পেরোতে তার এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে। ততক্ষণে রোদে আর তাপে হ্যানসের গলা শুকিয়ে জিহ্বাটা তালুর সঙ্গে আটকে যেতে লাগল। আমি জানি এখন আমাকে কী করতে হবে, হ্যানস মনে মনে ভাবল; খুব সহজ ব্যাপার, আমি গরু দোয়াব আর চটপট কিছু দুধ খেয়ে নেব। হ্যানস তখন গরুর দড়িটাকে একটা গাছের সঙ্গে বাঁধল আর চামড়ার কাপটা জায়গামতো রাখল। কিন্তু তাতে এক ফোঁটা দুধও জমা হলো না।
নিজের ভাগ্যটাকে আরেকবার ঝালিয়ে দেখার জন্য সে যখন কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতিটা নিয়ন্ত্রণে আনতে চাচ্ছিল, ঠিক তখনই অস্বস্তির যন্ত্রণায় অবাধ্য পশুটা তার মাথা বরাবর দিল এক লাথি। কপালে গুঁতো খেয়ে হ্যানস সেখানে বহুক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকল। ভাগ্য ভালো ছিল যে ছোটো ঠেলাগাড়িতে একটা শূকর নিয়ে সেখানে এক কসাই এসে উপস্থিত হয়েছিল ঠিক তখনই।
জ্ঞান ফেরানোর পরে কসাই হ্যানসকে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে তোমার? হ্যানস তার দুঃখের কথা কসাইকে জানাল। কসাই তার হাতে একটা বোতল ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই যে এই বোতল থেকে পানি খেয়ে নাও আর পিপাসা মেটাও। তোমার গরু তোমাকে কোনো দুধই দেবে না। সত্যি কথা বলতে কী, তোমার গরুটা খুবই বয়স্ক আর এই অবস্থায় কসাইখানায় নিয়ে গিয়ে কেটে ফেলা ছাড়া একে দিয়ে আর কিছুই হওয়ার আশা নেই।
হায় হায়! হ্যানস আর্তনাদ করে উঠল। এই গরুটার যে এরকম অবস্থা সেটা কে জানত? একে জবাই করে তো আমার কোনো লাভ হবে না, গরুর মাংস আমি দুই চোখে দেখতে পারি না। গরু না হয়ে এখন এটা যদি একটা শূকর হতো তাহলেও কথা ছিল। তখন অন্তত সেটার মাংস দিয়ে না-হয় ভালো কিছু একটা বানানো যেত।
তা যা বলেছ, ভাই, কসাই বলল। তবে তোমার যদি ভালো লাগে তো গরুটার বদলে আমি আমার শূকরটা তোমাকে দিয়ে দিতে পারি।
বলো কী! সত্যি, এই দয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয় তোমার ভালো করবেন, বলে হ্যানস কসাইকে গরুটা দিয়ে তার বদলে ঠেলাগাড়ি থেকে তার শূকরটা নিয়ে নিল। তারপর পায়ের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা ধরে শূকরটাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। ধীরগতিতে হেঁটে যাওয়ার সময় তার কাছে যাবতীয় অদলবদল ঠিকঠাকই মনে হচ্ছিল। হ্যানসের ভাগ্যে কিছুটা ঝড়ঝাপটা ছিল বটে, তবে সবকিছু শেষ হয়ে তখন সে ভালোই ছিল।
চলবে...