বাচ্চা ফুলঝুরির উড়াল

গতকাল সন্ধ্যায় গল্পে গল্পে কোন একটা ফোকর দিয়ে ছোট্ট ফুলঝুরিটা খোয়াড়ে ঢুকে গেছে ঠিকই, কিন্তু আর বের হতে পারেনি। সেই থেকে যত অশান্তি! ভেতরে বাচ্চাটা কেঁদে মরছে, বাইরে ঘুরে ঘুরে মা কাঁদছে।

মারিয়া সালামমারিয়া সালাম
Published : 30 July 2022, 06:39 AM
Updated : 30 July 2022, 03:34 PM

ঘুম ভাঙতেই চমকে উঠে চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে থাকল বাবা ফুলঝুরি। পাশেই মা ফুলঝুরি নেতিয়ে পড়ে আছে। সারা সন্ধ্যা-রাত কেঁদে কেঁদে বেচারির শরীরে শক্তি বলতে কিছুই নেই।

ডানা দিয়ে মা ফুলঝুরির গায়ে আলতো হাত বুলাল বাবা ফুলঝুরি। মিহি গলায় ঘুম থেকে ডেকে তুলতে গিয়ে বুঝল, তার নিজের অবস্থাও বেশ নাকাল।

সারারাত চিল্লে চিল্লে তার গলাও ভেঙে গেছে, অনেক চেষ্টা করেও গলা দিয়ে ডাক বের হচ্ছে না। পাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় জমা জলে ঠোঁট ডুবাল একটু গলাটা ভিজিয়ে নেবে এ আশায়। এক ফোঁটা জল গলায় টেনে উঠাতে গিয়ে বুঝল শুধু গলা ভেঙেছে তা নয়, সাথে ঠোঁটেও প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে।

প্রায় সারারাত কাচের জানালাটায় ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে কখন জানালার পাশেই দু’জন ঘুমিয়ে গেছে, সেটা তারা বুঝতেই পারেনি। গায়ে প্রখর তাপ লাগাতে বাবা ফুলঝুরি বুঝল বেলা বেশ বেড়েছে। ধড়ফড় করে ডানা ঝাড়া দিয়ে ক্লান্তি আর অবসাদ ঝেড়ে ফেলে উড়ে চলল বালিহাঁসের খোয়াড়ের দিকে, যেখানে তাদের বাচ্চা ফুলঝুরি রাতে আটকা পড়েছে।

বাচ্চার উপরে খুব রাগ হচ্ছে বাবা ফুলঝুরির। ওদের বাচ্চাটা কেমন বোকা আর মিশুক হয়েছে! এই এত মিশুক হবার ফল কখনোই ভাল হতে পারে না। এখন নিজেতো কষ্ট পাচ্ছে, বাবা-মাকেও কষ্ট দিচ্ছে।

এ বাড়ির লোকেরা কোথা থেকে চারটা বালিহাঁসের বাচ্চা এনেছে কে জানে? কোন বাবা-মা’র কাছ থেকে কেড়ে আনল কিনা তাও জানে না এবাড়িতে বাসা করে থাকা অন্য পাখিরা। তবে, মৃতপ্রায় বাচ্চাগুলোকে বাতি জ্বেলে উমে রেখে, সময়মতো খাবার-পানি দিয়ে এরা বাঁচিয়ে তুলেছে। খোয়াড়ে রেখে একটা ভালো হয়েছে, বাচ্চাগুলোকে কাক ছোঁ মেরে নিতে পারেনি।

জানে বেঁচে গেলেও মনটা ভালো নেই বাচ্চাগুলোর। বাবা-মা’র জন্য দিনরাত কাঁদে। আর তাই দেখে তাদের বাচ্চা ফুলঝুরির ওদের জন্য খুব মায়া হয়। বাবা-মা’র শত মানা উপেক্ষা করে প্রতিদিন বালিহাঁসের বাচ্চাগুলোর সাথে গল্প করতে যেত।

গতকাল সন্ধ্যায় গল্পে গল্পে কোন একটা ফোকর দিয়ে ছোট্ট ফুলঝুরিটা খোয়াড়ে ঢুকে গেছে ঠিকই, কিন্তু আর বের হতে পারেনি। সেই থেকে যত অশান্তি! ভেতরে বাচ্চাটা কেঁদে মরছে, বাইরে ঘুরে ঘুরে মা কাঁদছে। আহারে! ছোট্ট এইটুকু বাচ্চা! ভাবতেই বাবার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। দ্রুত উড়ে খোয়াড়ের কাছাকাছি গিয়ে দেখলো, বাচ্চাটা এখনও কাঁদছে। সারা রাত কেঁদে কেঁদে মুখটা শুকিয়ে গেছে। এতটুকু বাচ্চা, রাত থেকে এই অবধি কিছুই পেটে পড়েনি।

মানুষকে তুমি চেনো না? কম মানুষ দেখলাম? ওদের লাভ-ক্ষতি কী ওরা নিজেরাও বুঝে? ওরা কেবল বুঝে মনের সুখ, বিনোদন। আমার ছোট্ট বাচ্চাটা কষ্টে ছোটাছুটি করে বেড়াবে আর সেটা দেখে মানুষ আনন্দ পাবে। সামান্য আনন্দের জন্য মানুষ পারে না এরকম হীনকাজ একটাও নেই।

বাবাকে দেখে ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, বাবা, মানুষটা কি দেখেছে তোমাদের? কথা বলেছ? আমাকে কি ছেড়ে দেবে? বাবা, আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাও, আমি মায়ের কাছে যাবো। হড়বড় করে কথাগুলো বলতে বলতেই চিৎকার করে কান্না শুরু করল বাচ্চাটা।

এত কাঁদে না বাবা, একটু শান্ত হও। আমি সারা রাত মানুষগুলোকে ডেকেছি। চিৎকার করে করে ডেকেছি। লোকটা দেখেছে আমাদের। এমনকি তার স্ত্রীকে ডেকেও দেখিয়েছে আমাদের। কিন্তু, বুঝতে পারেনি আমরা কী বলতে চাই। কিছুক্ষণ আমাদের দেখে জানালার পর্দা টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা, বাবা ফুলঝুরির কথা শুনে আরও ঘাবড়ে গেল বাচ্চাটা, দ্বিগুণ বেগে কান্না শুরু করল।

বাচ্চা ফুলঝুরির কান্না শুনে মা পাখি কখন এসে পাশের ডালে বসেছে কেউ জানে না। সে নিজেও চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় মূর্ছা যাবার দশা। মা-বাচ্চার কান্না শুনে অন্য পাখিরাও কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। সবাই সমস্বরে কাঁদতে থাকল।

বাড়ির লোকটি প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠেই দাঁত ব্রাশ করতে করতে পুকুরপাড়ে এসে বসল। মুখ ধুতে গিয়ে ব্যাপারটা তার কাছে একটু অদ্ভুত লাগল। এই অবেলায় এত পাখি এক জায়গায় জড়ো হয়ে এভাবে ডাকছে কেন?

আনমনে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি খোয়াড়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। মানুষ দেখে সব পাখি যে যার মতো আড়ালে গিয়ে লুকালো। কিন্তু, মা পাখির সেদিকে খেয়াল নেই, সে কেঁদে কেঁদে খোয়াড়ের চারদিকে উড়তে থাকলো। আর তার বাচ্চা খোয়াড়ের ভেতরে দুই ডানা মেলে মা, মা বলে ডাকতে থাকল।

বাচ্চার কিচিরমিচির কান্না শুনে লোকটি খোয়াড়ের মধ্যে ভালো করে দেখতে শুরু করলো। বাচ্চাপাখির সাথে চোখাচোখি হতেই দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে ফিরে চলল সে।

দ্যাখো, দ্যাখো, ওই যে লোকটা এবার তার স্ত্রীকে নিয়ে এদিকে আসছে। হাতে খোয়াড়ের চাবি মনে হচ্ছে। একটু শান্ত হও বাবা। ওরা ঠিকই তোমাকে ছেড়ে দেবে, বাবা ফুলঝুরি বাচ্চাকে বুঝাতে লাগলো।

লোকটির ফিরে যাওয়া দেখে মা আর বাবা ফুলঝুরি পড়ল আরেক দুশ্চিন্তায়। এরা আবার বালিহাঁসের বাচ্চাদের মতো আমাদের বাচ্চাকেও আটকে রাখবে নাতো? মা ফুলঝুরির প্রশ্নে চিন্তিত বাবা ফুলঝুরি মাথা নেড়ে বলল, আরে, সেরকম কিছু হবে না। তুমি একটু মাথা ঠান্ডা রাখ। আমাদের বাচ্চাতো আমাদের চোখের সামনেই আছে। একটু অপেক্ষা কর। দেখি কী করে ওরা। আমাদের বাচ্চা আটকে রেখে ওদের কী লাভ বলোতো?

মা পাখি ধরা গলায় বলল, রাখ তোমার নীতিকথা। মানুষকে তুমি চেনো না? কম মানুষ দেখলাম? ওদের লাভ-ক্ষতি কী ওরা নিজেরাও বুঝে? ওরা কেবল বুঝে মনের সুখ, বিনোদন। আমার ছোট্ট বাচ্চাটা কষ্টে ছোটাছুটি করে বেড়াবে আর সেটা দেখে মানুষ আনন্দ পাবে। সামান্য আনন্দের জন্য মানুষ পারে না এরকম হীনকাজ একটাও নেই।

মায়ের কথায় বাচ্চা পাখি আরও ঘাবড়ে চিৎকার শুরু করলো। বন্ধু বালিহাঁসগুলো হাজার সান্ত্বনার কথা বলেও ওকে শান্ত করতে পারলো না। সে কেঁদেই চললো।

দ্যাখো, দ্যাখো, ওই যে লোকটা এবার তার স্ত্রীকে নিয়ে এদিকে আসছে। হাতে খোয়াড়ের চাবি মনে হচ্ছে। একটু শান্ত হও বাবা। ওরা ঠিকই তোমাকে ছেড়ে দেবে, বাবা ফুলঝুরি বাচ্চাকে বুঝাতে লাগলো।

বাবার কথায় কেবল একটু শান্ত হয়েছে বাচ্চাটা। এমন সময়ই খোয়াড়ের দরজা খুলে লোকটি ভেতরে ঢুকলো। লোকটিকে দেখেই বাচ্চাপাখি মা, মা বলে চিৎকার করে এককোণায় লুকাতে চাইলো। বার কয়েক ডানা ঝাপটে উড়ার চেষ্টাও করল, কিন্তু তেমন লাভ হলো না। লোকটি বাচ্চা পাখিটাকে নিজের মুঠোয় নিয়ে খোয়াড় থেকে বেরিয়ে আসল।

পাখিটার মাথায় আঙুল দিয়ে আলতো করে ছোঁয়া দিতে দিতে স্ত্রীকে বলল, এইবার বুঝেছ? কাল রাতে এর বাবা-মা-ই আমাদের জানালায় মাথা ঠুকছিল। কি অদ্ভুত তাই না? তুমি কখনও ভেবেছিলে, পাখির বাবা-মায়ের এমন আবেগ? আশ্চর্য! সত্যই আমি আগে এরকম কোনদিন দেখিনি। আহারে বাচ্চাটা কতই না ভয় পেয়েছে! বাচ্চা ফুলঝুরির পালকে হাত বুলাতে বুলাতে স্ত্রীটি বলল।

আর তখনই অধৈর্য বাবা-মাকে অবাক করে, বাচ্চা ফুলঝুরি নিজের দুই ডানা মেলে দিল দু’পাশে। পা দুটিকে যতদূর সম্ভব পেছনে টেনে এনে আকাশের দিকে উড়াল দিল। টালমাটাল ডানায় ধীরে ধীরে মায়ের দিকে উড়ে চলল।

বালিহাঁসের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আসা তোমাদের একদম উচিত হয়নি, অনুযোগের সুরে লোকটিকে বলল তার স্ত্রী। মাথা দুলিয়ে লোকটি উত্তর দিল, সে ঠিক। কিন্তু, ওদের বাবা-মা ছিল না ওখানে। চিল বা কাক নিয়ে যেত। ওদের জীবন বাঁচাতেই তো নিয়ে আসা। ওদের বড় হতে দাও, ছেড়ে দেবো, সত্যি।

লোকটির কথায় স্বস্তির হাসি দিল স্ত্রীটি। এদিকে মুঠোর ভেতরে বাচ্চাটি হাঁসফাঁস করতে লাগলো। মা, মা বলে ডুকরে কেঁদে ফেললো। বাচ্চার কান্না শুনে মা পাখি কাছাকাছি ডালে এসে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। গলা চড়া করে বললো, তোমরা আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দাও, ছোট্ট বাচ্চা আমার!

সেদিকে মানুষটার কোন লক্ষ্য নেই। স্ত্রীকে বলল, ঝটপট আমার ছবি তোল। বেশ কয়েকটা ছবি তোলার পরে, লোকটি বাচ্চা হাতে ধরেই আশপাশে তাকিয়ে কী যেন খুঁজতে থাকলো। এদিকে বাচ্চার বাবা-মা’র কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ আর এই লোক হাসিহাসি মুখে স্ত্রীকে কীসব গল্প বলতে বলতে লম্বা গাছটির দিকে এগিয়ে চলল।

তারপর, বাচ্চাটিকে একটা মোটা ডালের উপরে ছেড়ে দিয়ে মাথায় আলতো করে টোকা দিয়ে বললো, যাহ! মায়ের কাছে যা।

বললেই তো হবে না, আমার বাচ্চাতো এখনও উড়াই শিখেনি। তোমরা বরং দূরে গিয়ে দাঁড়াও না বাপু, আমি গিয়ে বাচ্চা নিয়ে আসি, মা পাখি বেশ জোরেই বললো। সেকথা কারও কানে গেল না। লোকটি আর তার স্ত্রী সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।

আর তখনই অধৈর্য বাবা-মাকে অবাক করে, বাচ্চা ফুলঝুরি নিজের দুই ডানা মেলে দিল দু’পাশে। পা দুটিকে যতদূর সম্ভব পেছনে টেনে এনে আকাশের দিকে উড়াল দিল। টালমাটাল ডানায় ধীরে ধীরে মায়ের দিকে উড়ে চলল।

কিডজ পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক