ভ্রমণগদ্য
Published : 02 Nov 2025, 12:13 AM
হোটেল থেকে বেশ কিছুক্ষণ গাড়ি চালানোর পর এমি আমাদের স্পোর্টস সেন্টার মেট্রো স্টেশনে নামিয়ে দিল। তখন বিকেল ৪টা। বাইরে শেষ দুপুরের আলো। ঝিরঝির বাতাস। দীর্ঘ গাছের সারি। দূরে তিয়ানশেন পর্বত। তারও দূরে তিব্বতের মালভূমি। তারও পরে ভূটান।
ভূটানের পর বঙ্গোপসাগরের ধারে বাংলাদেশ। ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। আঁশটে মাছের গন্ধ। ভ্যাপসা গরম। কিন্তু উরুমচিতে শীত শীত ভাব। তুষারাবৃত তিয়ানশেন দুপুরের পর হু হু করে শীতল শ্বাস ছাড়ে আর শিউরে শিউরে উঠে উরুমচি। সেই শিহরনের ধাক্কায় কিনা কে জানে, আমরা চারজন এগিয়ে চলি সামনে ফুটপাত ধরে। অচেনা পাখি উড়ে আকাশে। অনেক উপরে। ছোট্ট বিন্দুর মতো পাখিগুলো থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি মেট্রো স্টেশন। অনতিদূরে, ফুটপাতের ডান ধারে।
দেরি না করে মুখ হা করা মেট্রো স্টেশনের ইঁদুরের গর্তের মতো সুড়ঙ্গে আমরা ঢুকে পড়ি। উরুমচিতে আজ আমাদের প্রথম অভিযান। গ্র্যান্ড বাজার বিজয়! পৃথিবীর অন্যতম বড় বাজার। তার আগে পাতাল রেল। টেলিভিশন, সিনেমা ও ইউটিউবে বহুবার পাতালরেল দেখেছি। কিন্তু আজ যাচ্ছি নিজে চড়তে। মাটির নিচে অন্ধকার এক সুরঙ্গপথে অজগরের মতো এক যন্ত্রদানব আমাদের নিয়ে ছুটে যাবে অচিন কোনো পাতালপুরীতে! ভাবতেই রোমাঞ্চে শরীর শিউরে ওঠে।
স্টেশনে ভিড় ছিল না। চীন ভ্রমণে গিয়ে এই এক সুবিধা দেখেছি। গণপরিবহণ ব্যবস্থা। অত্যাধুনিক, পরিবেশবান্ধব, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী। বিআরটি বাসের ভাড়া মাত্র ১ আরএমবি। চীনা মুদ্রা ১ আরএমবি বাংলাদেশের ১৭ দশমিক ৮০ টাকার সমান। শহরের যেখানেই যান আপনি, এমনকি এই মেট্রোতেও, ১০-১২ কিলোমিটার যাবো মাত্র ৫ আরএমবিতে। অথচ ট্যাক্সি ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ আরএমবি। শহর যানজট ও দূষণমুক্ত রাখতে এখানকার সরকার গণপরিবহণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন চলে এলো। মাইকে কিছু ঘোষণা চলছে। চীনা ভাষায়, অবোধ্য। ট্রেনের দরজা খুলে গেলে আমরা লাফিয়ে ওঠি। আর তখনই পাগলা ঘোড়াটা দম নিয়ে খটখট অন্ধকার পথ কেটে ছুট দেয় অজানা গন্তব্যে। দরজার উপর মেট্রো ম্যাপ। ম্যাপের উপর লালবাতি। নির্দেশক। স্টেশন টু স্টেশন। দপ দপ। দু’পাশের অন্ধকার সরে গিয়ে আসে আরো অন্ধকার। অন্ধকার জমে কার মুখে? শো শো সাঁই সাঁই। অচিন পথ। কোনঠে হে? দাঁড়াও। হুট। বিভ্রম! ধাক্কায় ধাক্কায় ১২ স্টেশন। তারপর গন্তব্য।
১৩তম আরদাকিউ স্টেশনে পৌঁছলে আমরা নেমে পড়ি গন্তব্যে। নেমে পড়েই দিকভ্রষ্ট। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, সব একইরকম। মধ্যবয়সি এক নারীকে গ্র্যান্ড বাজারের কথা বললে তিনি ইশারা করে তাকে অনুসরণ করতে বললেন। পোষা বিড়ালের মতো আমরা ৪ জন নিঃশব্দে তার পিছু পিছু চলে একসময় দিনের আলো চোখে পড়তেই পথপ্রদর্শক মিলিয়ে যায়। রহস্যমানবীর খোঁজে দুই-এক পা এগোতেই জনারণ্য। বাঁ দিকে গ্র্যান্ড বাজারের আকাশমুখী টাওয়ার।
মিস্টার বিন খ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা রোয়ান অ্যাটকিনসন অভিনীত ‘মিস্টার বিন’স হলিডে’ (২০০৭) মুভিটা আমরা অনেকেই দেখেছি। যেখানে মিস্টার বিন ছুটিতে ঘুরতে বের হয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। তারপর ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন। আচমকা জেগে দেখেন, চারদিকে শত বছরের পুরনো রোমান শহরে সেই সময়ের মানুষেরা অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিংবা ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘পিকে’-এর (২০১৪) কথা বলা যায়। রাজকুমার হিরানীর এ ছবিতে হঠাৎ এক নাঙ্গা এলিয়েনের (আমির খান) ভূপৃষ্ঠে পতন ঘটে। জনাকীর্ণ গ্র্যান্ড বাজারে আমরা কারা? চেহারায় মিল নেই! পোশাকে সাদৃশ্য নেই। মেলে না ভাষাও!

দূর অতীতের চৈনিক সভ্যতায় ফিরে গেলাম নাকি? নাকি এলিয়েন? কারা? ওরা নাকি আমরা? ফিল্মি স্টাইলে হঠাৎ ভূপৃষ্ঠে পতন! কিন্তু জিল্লুর (সহকর্মী মো. জিল্লুর রহমান) কই? ওকে দেখছি না যে! ওই পথপ্রদর্শক ওকে লুকিয়ে ফেললো নাকি? কাঁধের ব্যাগে তুলে? নাকি জিল্লু নিজেই মিশে গেছে ওই জনসমুদ্রে। বুক উদোম করে। কী দুঃখে? সন্তর্পণে পা বাড়ালাম জিল্লুরকে খুঁজতে। শতশত চাপা নাক, পিটপিট চোখের মানুষ। এ প্রমোদ নগরীতে সারি সারি দোকান। বাহারি শৌখিন পণ্য। আয়না, শো পিস, ব্যাগ, স্যুভেনির, কাপ, প্লেট, ওয়ালম্যাট, অ্যান্টিক, গার্মেন্টস, পাথর, পুতুল, চকোলেট, কাজুবাজাম, কাঠবাদাম, আখরোট, কিসমিস, আরো কতো কি!
বিক্রেতারা অধিকাংশই নারী। অনেকেই আবার খাড়া নাক, মধ্যমনেত্র আঁখি। কথা বলছে অন্য ভাষায়। কারা ওরা? উইঘুর? চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ মূলত উইঘুর সম্প্রদায় প্রধান। শতকরা হিসেবে প্রায় ৪৬ শতাংশ। বাকিরা হান, হুই ও কাজাক। উরুমচিতে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ উইঘুর। ভাষা উইঘুর। উইঘুর তুর্কি উদ্ভূত ভাষা এবং আরবি হরফ খচিত।
অবশেষে ক্লান্ত লাগে। লাগারই কথা। মানুষ তো আর বকপক্ষী কিংবা অশ্ব নয় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দণ্ডায়মান থাকবে। অথচ তাই হচ্ছিলো। কারণ ঠোকাঠুকি করে কেনাকাটা। কেনাকাটায় বচসা, মাধ্যম ক্যালকুলেটর। আশ্চর্য! একবিংশ শতাব্দীর চৈনিক সভ্যতার এই অবস্থা? এটা কি মানা যায়? ঘটনাটা খুলে বলি। প্রথমত চীনে ইহজীবনে প্রথম গিয়েছি। এতদিনে সেই চীন আর আগের চীন নেই। ধনে-মানে অনেক উঁচুতে চড়ে বসেছে। পৃথিবী দাবড়াচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকাও কাত হয়ে যাচ্ছে। দু’দিন পর পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনকে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন। মানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে গিয়েছে।
প্রতিপক্ষ মানুষ কাকে ভাবে? যাকে তার সমকক্ষ ভাবে। ইউরোপ-আমেরিকার সমকক্ষ হওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয় বাপু। ইউরোপ-আমেরিকা না হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সারা পৃথিবীকে লুণ্ঠন করে, উপনিবেশ তৈরি করে চুষে-শুষে ধনী হয়েছে। কিন্তু চীন কী করলো? নিশ্চয় কোনো রহস্য আছে? কী সেটা? চীন মুল্লুকে গমন করিয়া মর্দ কী দেখিল? থাক থাক। সে কথা আপাতত থাক। তার চেয়ে বরং গ্র্যান্ড বাজারের কেনাকাটায় যাই। এ বিষয়ে কী বিপত্তি হাজির হয়েছিল সে বিষয়ে বর্ণনা করি।
গ্র্যান্ড বাজার পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বাজার। চীনের এই একটা বিষয় আমাদের বেশ আমোদ দিয়েছিল। সেটা হলো চৈনিক নির্মাণ ভাবনা। সেই গ্রেটওয়াল থেকে আজ পর্যন্ত ওরা যাই করুক বড় আকারে করে করেছে। ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। যেমন এই গ্র্যান্ড বাজার! ২০০২ সালে উদ্বোধন হওয়া এই বাজার নাকি আয়তনে পৃথিবীর বৃহত্তম! আছে এক হাজার মানুষ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ভোজনশালা। ৮০ মিটার উচ্চতার আকাশচুম্বী পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। খাকি রঙের সারবাঁধা ভবন। মধ্যএশিয়ার (কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান) ভাবধারার ইসলামিক স্থাপত্য। আর আছে উইঘুর জাতিগোষ্ঠীসহ পুরো মধ্যএশিয়ার নাচ-গান।
কিন্তু বেচাকেনার ধরনটা আমাদের মতো। অর্থাৎ দামাদামি মুলামুলি করে। প্রথম দোকানে আমরা একটা জিনিস হাতে নিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করি, হাউ মাচ? দোকানি কী বুঝে একটা ক্যালকুলেটর বের করে ডিজিট চেপে ধরে। বুঝলাম এটাই দাম। এতো আরএমবি? নিজের ঠাট বজায় রাখতে কিছুই বললাম না। দামাদামি করলে আবার ছোটলোক ভাবে কিনা! নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একটু পিছু হটতেই দোকানি ইশারায় ডেকে ফের ডিজিট চেপে ক্যালকুলেটর নিয়ে এগিয়ে আসে। ইউরেকা! দাম কমে গেছে। ধরুন ১০০ থেকে ৮০!
বাঙালি তো ছাড়ার পাত্র নয়। আমরা মুখের কথা ভুলে যাই। দোকানি আবার ক্যালকুলেটরে ডিজিট চাপে। মূল্য কমে। এভাবে চলে দামাদামি। বচসাও হয়। কেনাকাটায় যোগাযোগ স্থাপনে নতুন এক ভাষার উদ্ভব হয়, ‘ক্যালকুলেটর ভাষা’। তারপর চীনের উরুমচি, বেইজিং ও গুয়াংজু যত জায়গায় কেনাকাটা করেছি এই ‘ক্যালকুলেটর ভাষা’ বেজায় কাজে দিয়েছে। তবে যেসব বাজারে পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকে সেখানে ঝামেলা কম। ফিক্সড প্রাইস। সেখানে ‘বোবা ভাষা’। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে ইংরেজির এমন অনাদর রহস্যমূলক!
ঘুরতে ঘুরতে প্রাকসন্ধ্যায় মসজিদের ডানদিকের রাস্তায় প্রবেশ করতেই গানের আওয়াজ কানে আসে। অনতিদূরে কলের গান। আরেকটু এগিয়ে গেলে দেখতে পেলাম ভিড়। গোল হয়ে ঘিরে আছে উৎসুক পর্যটকেরা। এর নাম ‘দাবাংচেং-এর মেয়ে’। বাংলাদেশ থেকে আসার আগেই গুগল করে উইঘুরদের বিখ্যাত লোককাহিনী নির্ভর নাচ ‘দাবাংচেং-এর মেয়ে’ সম্পর্কে জেনে এসেছিলাম। যেখানে জনৈক যুবক দাবাংচেং শহরের সুন্দরী মেয়ে কেমারখানের প্রেমে পড়েছে।
গানে গানে সে কেমারখানের রূপের গুণকীর্তন করে, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় অনেকটা এমন-
ও রূপসি মেয়ে কি দীর্ঘ তোমার বিনুনি!
কি সুন্দর তোমার হরিণা চোখ
দূর পাহাড়ের ঝিরি কলকল তোমার হাসি
ও রূপসি মেয়ে তোমার জন্মে দাবাংচেং-এর রাস্তা কতো মসৃণ
তরমুজ সুমিষ্ট লাল, জুড়ায় প্রাণ
দাও তোমার মন, করবো তোমাকে বিয়ে
সাদা ঘোড়ায় করে তুলবো আমার ঘরে
বাঁধবো সুখের সংসার, ও রূপসি মেয়ে!
গানের সুরে সুরে প্রেমের গভীরতায় হাত পা দুলিয়ে নাচ। নাচের মোহময়তায় সন্ধ্যা মিলিয়ে যায়। এবার পেট চুঁ চুঁ করে ধাক্কা দেয়। কিছু খাওয়া দরকার। সমান্তরাল ডান পাশের গলিতে ঢুকে দেখি অনেকগুলো বিরিয়ানির দোকান। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে জানা যায় ভেড়ার মাংসের বিরিয়ানি। ২০ আরএমবি, আর নান ৫। বাঙালি কি বিরিয়ানির লোভ ছাড়তে পারে? বসে খেলাম। আহ! উইঘুরদের রসনায় তৃপ্ত হয়ে বেরোবার মুখে অনেকগুলো উটের দুধের দোকান। লিকুইড কিংবা পাউডার, দুটোই আছে। তবে দাম আকাশছোঁয়া। তাই উপরের দিকে তাকিয়ে নির্মেঘ আকাশ দেখে দেখে আমরা গ্র্যান্ড বাজার থেকে বাইরে বেরিয়ে আসি।
কিন্তু ট্যাক্সি ডাকার ‘দিদি চুশিং’ অ্যাপ না থাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে খালি প্রাইভেট কার খুঁজলাম। একটা দেখে হাত উঁচিয়ে ক্যালকুলেটরের পরিবর্তে মোবাইলের ডায়ালে ডিজিট চেপে দরদাম করে চড়ে বসলাম। এবার গা এলিয়ে কেমারখানের রূপের নাওয়ে ভাসতে ভাসতে হোটেলে ফিরতে থাকি।
চলবে...