Published : 14 Sep 2026, 02:55 PM
সিনেমার আঁধার ঘেরা ঘরে বসে বড় পর্দায় রোমাঞ্চের চোখ রাখা আর হাতে ধরা থলিয়ে থেকে মচমচে গরম পপকর্ন মুখে পুরে দেওয়া—এই দুটো অভিজ্ঞতা আজ একে অপরের পরিপূরক। পপকর্ন আর সিনেমার এই অটুট বন্ধুত্ব কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। একসময় অভিজাত প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা পপকর্নকে ‘নিম্নমানের ও অপরিচ্ছন্ন’ খাবার মনে করতেন। শত বছরের এই ভুল ধারণা ভেঙে কীভাবে পপকর্ন সারা বিশ্বের মানুষের প্রিয় স্ন্যাক্স আর সিনেমা হলের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হলো, তার ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর।
পপকর্নের উৎস আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের প্রাচীন আমেরিকায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, পেরু ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বছর আগে থেকেই এই বিশেষ ধরনের ভুট্টা ফুটিয়ে খেত। পরবর্তীতে উত্তর আমেরিকার আদিবাসী প্রজাতি আইরোকোইসরা মাটির পাত্রে গরম বালুর ভেতরে ভুট্টার দানা দিয়ে পপকর্ন তৈরি করত এবং তা স্যুটেও ব্যবহার করত। স্প্যানিশ অভিযাত্রীরাও ষোড়শ শতকে আদিবাসীদের এই স্ন্যাক্স তৈরির কথা লিখে রেখে গেছেন। উনিশ শতকের দিকে আমেরিকার পরিবারগুলোর কাছে শীতের রাতে আগুনের পাশে বসে বা বনভোজনে পপকর্ন খাওয়া একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়।
পপকর্নকে সাধারণ মানুষের ঘর থেকে বের করে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শিকাগোর ব্যবসায়ী চার্লস ক্রিটরসের। ১৮৮৫ সালে তিনি পপকর্ন ও বাদাম ভাজার বাষ্পচালিত একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ডস ফেয়ারে এটি প্রথমবারের মতো সবার সামনে প্রদর্শিত হয়। এরপর শতকের শুরুতে রাস্তায় রাস্তায় পপকর্নের ঘোড়ার গাড়ি ও হাতে টানা গাড়ি ঘুরতে শুরু করে এবং মেলা, সার্কাস কিংবা রাস্তার পারফর্মেন্স দেখতে আসা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসে এই সস্তা অথচ সুস্বাদু খাবারটি।
সিনেমার ইতিহাস যখন শুরু হয়, তখন সিনেমা হল বা মুভি প্যালেসগুলো ছিল বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। সেখানে ধুলোবালি মুক্ত দামি কার্পেট এবং রাজকীয় সাজসজ্জা থাকত। তৎকালীন সিনেমা হলের মালিকেরা পপকর্ন বিক্রি নিষিদ্ধ করেছিলেন, কারণ দর্শকরা পপকর্ন খেলে নোংরা হতো কার্পেট এবং হাত দিয়ে সিট নষ্ট হওয়ার ভয় থাকত। তার ওপর তখন সিনেমা ছিল একদম নির্বাক, অর্থাৎ কোনো আওয়াজ হতো না। দর্শকরা যদি মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখার সময় পপকর্ন চিবোনোর মচমচে শব্দ করত, তবে তাতে সিনেমা দেখার মূল আনন্দ নষ্ট হয়ে যেত। তাই সিনেমা দেখতে ঢোকার আগে বাইরের হকারদের কাছ থেকে কেনা পপকর্ন জমা রেখে হলে ঢুকতে হতো।
এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায় দুটি বড় ঘটনার পর। প্রথমটি হলো ১৯২৭ সালে সিনেমায় শব্দ বা ‘টকিস’-এর আগমন। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর ডায়লগের আওয়াজে পপকর্ন চিবোনোর শব্দ আর ঢাকা পড়ে যায়। দ্বিতীয় কারণটি ছিল ১৯৩০-এর দশকের আমেরিকার মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন। যখন মানুষ কঠিন আর্থিক কষ্টে ভুগছিল, তখন বিনোদনের একমাত্র সস্তা মাধ্যম ছিল ৫ সেন্টের একটা মুভি টিকেট আর মাত্র ৫ সেন্টের এক ব্যাগ পপকর্ন।
মহামন্দার কঠিন সময়ে জুলিয়া ব্র্যাডেন নামের এক বিধবা নারী কানসাস সিটির একটি সিনেমা হলের বাইরে পপকর্নের স্টল বসানোর অনুমতি চান। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একটি থেকে চারটি স্টল চালু করেন এবং বছরে হাজার হাজার ডলার আয় করতে শুরু করেন। সিনেমা হলের মালিকেরা তখন বুঝতে পারেন, সিনেমার টিকেটের চেয়ে পপকর্ন বিক্রিতে লাভ অনেক বেশি। একে তো ভুট্টার দাম কম, আর লাভ হয় ৭০ শতাংশেরও বেশি!
১৯৩৮ সালে আর. জে. ম্যাককেনা নামের এক হল মালিক টিকেটের দাম কমিয়ে দিয়ে সিনেমা হলে পপকর্ন বানানোর যন্ত্র বসিয়ে দেন, যেন মানুষ হলে ঢুকেই আগে পপকর্ন কেনে। এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন চিনি রেশনের আওতায় চলে যায় এবং ক্যান্ডি বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের সংকট দেখা দেয়, তখন পপকর্নের চাহিদা এক লাফে ৩০০ শতাংশ বেড়ে যায়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পপকর্ন শুধু আমেরিকান সংস্কৃতি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সিনেমা হলের এক অপরিহার্য অংশ। তবে দেশভেদে এর স্বাদে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। ভারতে মশলাদার পপকর্ন, জাপানে সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল মেশানো উমামি পপকর্ন, চীনে ক্যারামেল পপকর্ন, আর কলম্বিয়ায় ভাজা পিঁপড়া বা ‘হোরমিগাস কুলোনাস’-এর মতো বিচিত্র স্ন্যাক্স দিয়েও দর্শকেরা সিনেমা উপভোগ করেন। ১৯৮১ সালে মাইক্রোওয়েভে পপকর্ন তৈরির প্যাকেট প্যাটেন্ট পাওয়ার পর এটি আমাদের বসার ঘরেও জায়গা করে নিয়েছে।
তবুও, ঘরে বসে ওটিটিতে সিনেমা দেখা আর সিনেমা হলের বড় পর্দায় মাখনের সুবাস ছড়ানো গরম পপকর্নের বাটি হাতে নিয়ে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্যে আজও কোনো তুলনা হয় না। একসময়ের প্রত্যাখ্যাত এই স্ন্যাক্সটি আজ বিশ্ব বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।
সূত্র: রিডার’স ডাইজেস্ট