সাক্ষাৎকার
Published : 09 Apr 2026, 03:36 PM
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম, মহিরুহে রূপান্তর কিংবা ফুল ও ফলের সমারোহ আমাদের চোখে খুব সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু এই দৃশ্যমান পরিবর্তনের আড়ালে ক্রিয়াশীল থাকে অসংখ্য জটিল জৈব-রাসায়নিক সংকেত, হরমোনের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ এবং এক বিস্ময়কর জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
উদ্ভিদের ভেতরের এই নিগূঢ় রহস্যগুলো উন্মোচনে দীর্ঘকাল ধরে নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন জাপানের ইওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবিদুর রহমান। বর্তমানে তিনি ইওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচেওয়ানের প্ল্যান্ট সায়েন্সেস বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও যুক্ত আছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়নে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর আবিদুর জাপানের কোবি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্ল্যান্ট বায়োলজিতে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টে সিনিয়র পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা সম্পন্ন করেন।
সম্প্রতি এই প্রথিতযশা বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমার এক আলাপচারিতা হয়। তার গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য এবং সমকালীন কৃষিবিজ্ঞানে এর গুরুত্ব পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
মশিউর রহমান: আপনার বর্তমান গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্ভিদ তৈরি। এই ‘স্ট্রেস-রেজিস্ট্যান্ট’ বা প্রতিকূলতা-সহনশীল উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা কেন জরুরি?
আবিদুর রহমান: বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষি নিরাপত্তা, এই দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তীব্র শৈত্যপ্রবাহ কিংবা চরম দাবদাহ ফসলের উৎপাদনকে সরাসরি ব্যাহত করছে। তাই আমরা যখন ‘স্ট্রেস-রেজিস্ট্যান্ট’ (পরিবেশের প্রতিকূলতা সহ্য করতে সক্ষম) উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করি, সেটি কেবল গবেষণাগারের তাত্ত্বিক বিষয় থাকে না, বরং বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আমার গবেষণাগারে আমরা বিশেষ করে অতিশীতল ও উচ্চ তাপমাত্রা-সহনশীল উদ্ভিদ তৈরির পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছি। আমরা এমন একটি জিন চিহ্নিত করেছি, যা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে উদ্ভিদের ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। একে অনেকটা ঘরের ‘থার্মোস্ট্যাট’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা তাপমাত্রা সামঞ্জস্য করে ঘরকে বাসযোগ্য রাখে।
প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা মডেল প্ল্যান্ট ‘অ্যারাবিডপসিস’-এ এর সফল পরীক্ষা চালিয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য হলো টমেটো, বার্লি ও গমের মতো অর্থকরী ফসলে এই জিনের প্রয়োগ ঘটানো। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে এই ধরনের উদ্ভাবন ভবিষ্যতে গেম-চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
মশিউর রহমান: হার্বিসাইড বা আগাছানাশক কেন নির্দিষ্ট কিছু গাছকে ধ্বংস করে কিন্তু ফসলকে রক্ষা করে, এই রহস্যটি বোঝা কেন প্রয়োজন?
আবিদুর রহমান: কৃষি উৎপাদনে আগাছানাশক একটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প। ফসলের সঙ্গে আলো, বাতাস ও পুষ্টির প্রতিযোগিতায় আগাছা দমনে এটি অপরিহার্য। তবে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের জায়গাটি হলো এর ‘সিলেক্টিভিটি’ বা নির্বাচন ক্ষমতা। অনেক আগাছানাশক ধান বা গমের মতো একবীজপত্রী ফসলের ক্ষতি করে না, কিন্তু দ্বিবীজপত্রী আগাছা ধ্বংস করে দেয়।
এই প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন করা গেলে আমরা আরও নির্ভুল, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব আগাছানাশক তৈরি করতে পারব। অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার বর্তমানে মাটি, পানি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের গবেষণায় আমরা তিনটি বিশেষ জিন শনাক্ত করেছি, যা নতুন প্রজন্মের পরিবেশবান্ধব আগাছানাশক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, বিজ্ঞানের লক্ষ্য শুধু ‘কী’ ঘটছে তা জানা নয়, বরং ‘কেন’ ঘটছে তার উত্তর খোঁজা। এই উত্তরই ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির ভিত্তি গড়ে দেবে।

মশিউর রহমান: ‘ফাইটোরিমিডিয়েশন’ পদ্ধতিটি আসলে কী? উদ্ভিদ কি সত্যিই পরিবেশের বিষাক্ততা দূর করতে পারে?
আবিদুর রহমান: অবশ্যই। ফাইটোরিমিডিয়েশন হলো উদ্ভিদের মাধ্যমে মাটি বা পরিবেশ থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারণের একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। শিল্পবর্জ্য বা বিভিন্ন রাসায়নিকের কারণে মাটিতে ক্যাডমিয়াম, সিসা, পারদ বা সিজিয়ামের মতো ভারী ধাতু জমে যায়, যা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করে।
আমাদের গবেষণার একটি বড় সাফল্য হলো সেই প্রোটিন বা ‘ট্রান্সপোর্টার’ অণুটিকে শনাক্ত করা, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ মাটি থেকে ক্ষতিকর ধাতু গ্রহণ করে।
এটি অনেকটা ঘরের দরজা চেনার মতো; যদি আমরা জানি কোন দরজা দিয়ে বিষাক্ত পদার্থ ঢুকছে, তবে আমরা সেই দরজা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের উপায়ও বের করতে পারব। বিশেষ করে ২০১১ সালে জাপানের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর মাটি থেকে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম অপসারণের ক্ষেত্রে আমাদের আবিষ্কৃত ‘সিজিয়াম আপটেক ট্রান্সপোর্টার’ বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্পবর্জ্য পরিশোধিত কৃষিজমি গড়তে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর হবে।
মশিউর রহমান: আপনি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কাজ করেছেন। এই দেশগুলোর গবেষণা সংস্কৃতির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন কি?
আবিদুর রহমান: একেক দেশের গবেষণার সংস্কৃতি একেক রকম। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ‘কোলাবরেশন’ বা সহযোগিতামূলক কাজের পরিবেশ খুব সুদৃঢ়। সেখানে বড় বড় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি একাধিক ল্যাব শেয়ার করে ব্যবহার করে, যা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং গবেষকদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে, জাপানে ল্যাবভিত্তিক স্বকীয়তা বেশি। প্রতিটি ল্যাব নিজস্ব সরঞ্জামে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করে। এর নিজস্ব সুবিধা থাকলেও অনেক সময় সামগ্রিক সহযোগিতার গতি ধীর হতে পারে। তবে জাপানিজদের নিয়মানুবর্তিতা এবং খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি নজর সত্যিই অতুলনীয়। বিজ্ঞানে একক সাফল্যের চেয়ে এখন দলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বই বেশি ফলপ্রসূ।
মশিউর রহমান: জাপানে গবেষণা বা ক্যারিয়ার গড়তে ইচ্ছুক বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা কতটা বড় চ্যালেঞ্জ?
আবিদুর রহমান: জাপানে কাজ করতে হলে ভাষাকে কেবল একটি অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে দেখা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাগারের ভেতরের যোগাযোগ হয়তো ইংরেজিতে সম্ভব। কিন্তু প্রশাসনিক কাজ, দাপ্তরিক নথিপত্র এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার জন্য জাপানিজ ভাষার কোনো বিকল্প নেই।
ভাষা শেখার অর্থ শুধু শব্দ জানা নয়, বরং একটি জাতির সংস্কৃতি ও শিষ্টাচারকে ধারণ করা। শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার পরামর্শ- ভুল করার ভয় ঝেড়ে ফেলে দৈনন্দিন জীবনে জাপানিজ ব্যবহারের চর্চা করুন। এটি শুধু জাপানে টিকে থাকতেই সাহায্য করবে না, বরং আপনার পেশাদার জীবনের মানও উন্নত করবে।
মশিউর রহমান: যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার (মাস্টার্স/পিএইচডি) স্বপ্ন দেখছেন, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আবিদুর রহমান: প্রথমত, আপনার ‘কেন’ পরিষ্কার থাকতে হবে। আপনি কেন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে বা একজন নির্দিষ্ট অধ্যাপকের অধীনে কাজ করতে চান, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আপনার কাছে থাকতে হবে। আজকাল অনেকেই ঢালাওভাবে শত শত অধ্যাপককে মেইল করেন, যা কোনো ফল আনে না।
বরং যে অধ্যাপকের কাছে আবেদন করবেন, তার অন্তত দুই-তিনটি গবেষণা প্রবন্ধ ভালোভাবে পড়ুন। আপনার আগ্রহের সঙ্গে তার কাজের মিল কোথায়, সেটি আপনার মোটিভেশন লেটারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন। অ্যাকাডেমিক রেকর্ডের পাশাপাশি সততা, আন্তরিকতা এবং ধৈর্য সাফল্যের চাবিকাঠি। ডিগ্রি পাওয়ার চেয়ে শেখার মানসিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মশিউর রহমান: বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
আবিদুর রহমান: আমি তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে চাই- নৈতিকতা, যোগাযোগ এবং নিষ্ঠা। নৈতিকতা ছাড়া বিজ্ঞান কখনো মানবতার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তথ্যের স্বচ্ছতা এবং অন্যের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া গবেষণার মৌলিক শর্ত।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক বিশ্বে তথ্যের আদান-প্রদান অত্যন্ত দ্রুত হতে হয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঢিলেমি ক্যারিয়ারের বড় অন্তরায়। আর তৃতীয়ত, বিজ্ঞান রাতারাতি ফলাফল দেয় না; দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা থেকেই সাফল্যের জন্ম হয়।
এছাড়া আমাদের দেশের গবেষকদের মধ্যে ঐক্য ও বড় পরিসরে দলগত কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্ম যদি কৌতূহলী হয় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে, তবে বৈশ্বিক বিজ্ঞানে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।