১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বার্লিনে স্কুলছাত্র খুঁজে পেল প্রাচীন মুদ্রা, কী তার ইতিহাস

১৩ বছরের ওই কিশোর বার্লিনের এক মাঠে ঘুরছিল।

বার্লিনে স্কুলছাত্র খুঁজে পেল প্রাচীন মুদ্রা, কী তার ইতিহাস
ব্রোঞ্জের এই খুদে মুদ্রাটি ব্যাসে মাত্র ১২ মিলিমিটার। এটি এখন বার্লিনে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, ছবি: পেট্রি বার্লিন/ ক্রিস্টফ হ্যানিম্যান।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Apr 2026, 01:36 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

জার্মান রাজধানী বার্লিনের উপকণ্ঠে একটি সাধারণ মাঠ। আর পাঁচটা কিশোরের মতোই সেখানে ঘুরছিল ১৩ বছরের এক স্কুলছাত্র। 

হঠাৎ মাটির ওপর তার চোখে পড়ে ছোট্ট একটি ধাতব টুকরো। মাটিমাখা সেই সাধারণ বস্তুটিই যে একদিন ইতিহাস তৈরি করবে, তা হয়তো সেই কিশোর নিজেও কল্পনা করেনি।

বিশেষজ্ঞদের নিবিড় পরীক্ষার পর জানা গেছে, এই মুদ্রাটি কোনো সাধারণ প্রাচীন বস্তু নয়; এটি মহাকাব্যিক ট্রয় নগরীর একটি ব্রোঞ্জ মুদ্রা। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৩০০ বছর আগে বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ট্রয় নগরীতে এটি তৈরি করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, বার্লিনের ইতিহাসে এটাই প্রথম কোনো আবিষ্কৃত প্রাচীন গ্রিক নিদর্শন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে সেই কিশোর মুদ্রাটি নিয়ে বার্লিনের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ল্যাবরেটরিতে যায়। সেখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক ইয়েন্স হেঙ্কার জানান, মুদ্রাটি আকারে একেবারে ছোট, মাত্র ১২ মিলিমিটার। তাই প্রথম দেখায় এর গুরুত্ব বোঝা কঠিন ছিল। পরে মুদ্রাতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত করেন যে, এটি ২৮১ থেকে ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের মুদ্রা।

মুদ্রাটির এক পিঠে খোদাই করা আছে গ্রিক যুদ্ধ ও প্রজ্ঞার দেবী অ্যাথেনার ছবি, যার মাথায় রয়েছে একটি বিশেষ হেলমেট। অন্য পিঠেও দেবীর একটি দণ্ডায়মান মূর্তি, যার এক হাতে বল্লম আর অন্য হাতে সুতো কাটার টাকু।

ব্রোঞ্জের এই মুদ্রাটির সামনের পিঠে দেবী অ্যাথেনার প্রতিকৃতি এবং উল্টো পিঠে তার একটি পূর্ণ অবয়ব খোদাই করা আছে; যেখানে দেবীর ডান হাতে একটি বল্লম এবং বাম হাতে সুতো কাটার টাকু দেখা যাচ্ছে, ছবি: স্টাটলিখে মিউজিয়াম জু বার্লিন।

ব্রোঞ্জের এই মুদ্রাটির সামনের পিঠে দেবী অ্যাথেনার প্রতিকৃতি এবং উল্টো পিঠে তার একটি পূর্ণ অবয়ব খোদাই করা আছে; যেখানে দেবীর ডান হাতে একটি বল্লম এবং বাম হাতে সুতো কাটার টাকু দেখা যাচ্ছে,

তুরস্কের ট্রয় থেকে আধুনিক জার্মানির বার্লিন, এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুদ্রাটি সেখানে পৌঁছাল কীভাবে? প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটি এক বিরাট রহস্য। যে এলাকায় মুদ্রাটি পাওয়া গেছে, সেখানে ১৯৫০ এবং ৭০-এর দশকে খনন চালিয়ে দেখা গিয়েছিল যে জায়গাটি এক সময় প্রাচীন কবরস্থান ছিল।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেই আমলের জার্মান উপজাতিদের মধ্যে মুদ্রার প্রচলন ছিল না। তারা সোনা বা রুপার ধাতব মূল্যের জন্যই বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করত। হতে পারে কোনো ব্যক্তি স্মারক হিসেবে এটি নিজের কাছে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর পর তার কবরে এটি উপহার হিসেবে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এই একটি মুদ্রা প্রাচীন ইউরোপের বাণিজ্যিক বা সামরিক যোগাযোগের এক নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহাসিকদের মতে, সেই যুগে গ্রিকরা হয়তো উত্তর ইউরোপের উপজাতিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করত। হতে পারে কোনো জার্মান যোদ্ধা গ্রিসে যুদ্ধ শেষ করে ফেরার সময় এটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। অথবা মূল্যবান অম্বর বা টিন কেনাবেচার সুবাদে এটি সুদূর দক্ষিণ থেকে উত্তরে এসে পৌঁছেছিল।

বর্তমানে এই অমূল্য মুদ্রাটি বার্লিনের একটি জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। এক কিশোরের কৌতূহল যে হাজার বছরের পুরনো এক নিরব ইতিহাসকে এভাবে মাটির নিচ থেকে টেনে আনবে, তা সত্যিই বিস্ময়কর! ইতিহাস যে আমাদের পায়ের নিচেই লুকিয়ে থাকে, এই আবিষ্কার যেন তারই প্রমাণ।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন