১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জসীম উদ্‌দীন: সৃজন ও মননে

তুমুল জনপ্রিয় অনেক ছড়া-কবিতার কবি জসীম উদ্‌দীন।

জসীম উদ্‌দীন: সৃজন ও মননে
পল্লীকবি খ্যাত জসীম উদ্‌দীন (১৯০৩-১৯৭৬)

আবু আফজাল সালেহ আবু আফজাল সালেহ

Published : 12 Jul 2024, 10:46 AM

Updated : 26 Aug 2026, 09:59 AM

ডালিমকুমার গল্প কে শোনেনি! রূপকথার গল্পটির লেখক কবি জসীম উদ্‌দীন। তিনি আমাদের বেশকিছু শিশুতোষ লেখা উপহার দিয়েছেন। কিছু ছড়া ও কিশোর কবিতা তো এখনও আমরা মুখে মুখে বলে থাকি।

আবার আমাদের অনেকে তুমুল জনপ্রিয় ছড়া-কবিতাটি যে জসীম উদ্‌দীন তা জানি না! আজ শিশুতোষ এমন কিছু ছড়া ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো।

হাসুএক পয়সার বাঁশি দুটি শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতাই তোমাদের মতো করে লেখা। একটু না হয় পড়েই দেখো-

১. এই খুকীটির সঙ্গে আমার আলাপ যদি হয়,/ সাগর-পারের ঝিনুক হয়ে ভাসবো সাগরময়;/ রঙিন পাখির পালক হয়ে ঝরবো বালুর চরে,/ শঙ্খমোতির মালা হয়ে দুলব ঢেউ এর পরে।/ তবে আমি ছড়ার সুরে ছড়িয়ে যাব বায়,/ তবে আমি মালা হয়ে জড়াব তার গায়। (আলাপ, হাসু)

২. এই খুকীটির সঙ্গে তোমার আলাপ যদি থাকে,/ বলো যেন আসমানীরে বারেক কাছে ডাকে- (খোসমানী, এক পয়সার বাঁশী)

৩. খুকুমণি! লক্ষ্মীমণি! তোমায় আমি চাঁদ বলিব,/ সন্ধ্যা মেঘের টুকরো ছিঁড়ে তোমার দুটো পায় দলিব।(কবি ও চাষার মেয়ে, এক পয়সার বাঁশী)

৪. এত হাসি কোথায় পেলে/ এত কথার খলখলানি/ কে দিয়েছে মুখটি ভরে/ কোন বা গাঙের কলকলানি।/ কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে/ কলমী ফুলের গুলগুলানি।/ কে দিয়েছে চলন বলন/ কোন সে লতার দোল দুলানী। (এত হাসি কোথায় পেলে)

ফুটবল খেলোয়াড় ইমদাদ হকের কথা কিন্তু ছোট্টবেলাতেই শুনেছি। কবি জসীম উদ্‌দীনের ফুটবল খেলোয়াড় কবিতা থেকে- আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,/ হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।/ সন্ধ্যা বেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,/ মালিশ মাখিছে প্রতি গিঠে গিঠে কাত হয়ে বিছানাতে।/ মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙা হাড়ে,/ সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।/...বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,/ ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।/ চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মতো ধাও,/ মারো জোরে মারো-গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।

বিন্নি ও শালি ধানের নাম আমরা শুনেছি, তাই না! নবান্নের সময় এসবের কদর ছিল আগেরকার সময়। এসবের খবর কিন্তু কবি জসীম উদ্‌দীনের কবিতা থেকেই বেশি শুনেছি আমরা। আরও শুনেছি মৌরীখেতে লুটোপুটি খেলা-

১. আমার বাড়ি যাইও ভোমর,/ বসতে দেব পিঁড়ে,/ জলপান যে করতে দেব/শালি ধানের চিঁড়ে।/শালি ধানের চিঁড়ে দেব,/ বিন্নি ধানের খই,/ বাড়ির গাছের কবরী কলা/গামছা বাঁধা দই।(আমার বাড়ি)

২. চির বিরিঞ্চির গাছে রে ভাই লাল টুকটুক টিয়া,/ বসে আছে মৌরী ফুলের ছাতি মাথায় দিয়া। (আবল তাবল, এক পয়সার বাঁশী)

কবি জসীম উদ্‌দীনের মানবিক সত্তাও ফুটে উঠেছে শিশুতোষ ছড়া ও কবিতায়। আবার ব্যথাতুর হয়েছে এতিম শিশুর শোকে-

১. সবার সুখে হাসব আমি/ কাঁদব সবার দুখে,/ নিজের খাবার বিলিয়ে দেব/ অনাহারীর মুখে। (সবার সুখে)

২. কোথায় আমার রাজার কুমার, শুয়ে মায়ের কোলে/ তোমার কি ঘুম ভাঙবে না এই শিশুর চোখের জলে। (পূর্ণিমা)। এতিম শিশুর জন্য ব্যথাতুর কবি। হৃদয়ে শোক এনে দাগ কেটে দেয় কবিতাটি।

৩. রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও,/ বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?/ ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ/ কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা;/ সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,/...সেই ঘরেতে একলা বসে ডাকছে আমার মা/ সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না! (রাখাল ছেলে)

৫. আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,/ রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।/ বাড়িতো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,/ একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।/ একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,/ তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।/... পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,/ বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর। (আসমানী)

এ কবিতায় গ্রামের গরিব ও হতভাগ্যের কথা তুলে ধরেছেন কবি। এ কবিতাটিও আমরা প্রায়ই পড়ে থাকি এখনও।

তোমাদের মতোই ছোট্ট মেয়ে হাসু। এই হাসু নিয়েই কবি লিখলেন হাসু কবিতা। হাসু একটি ছোট্ট মেয়ে/ এদের মতো- তাদের মতো,/ হেথায় সেথায় ছড়িয়ে আছে খোকা-খুকু যেমনি শত।/ নয় তো সে চাঁদের চাঁদকুমারী/ তারার মালা গলায় পরে/ চালায় না সে চাঁদের তরী/ সারাটি রাগ গগন ভরে.../ তবু তারে ভালোই লাগে চাঁদের দেশের চাঁদের মেয়ে/ শঙ্খমালা, রঙ্গমালা, কঙ্কাবতী, সবার চেয়ে।