১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

দাদি-নানির শূন্যতা: সন্তান বড় করার নতুন চ্যালেঞ্জ

আমরা হারিয়েছি যৌথ পরিবারের সেই চিরাচরিত উষ্ণতা ও ভরসা।

দাদি-নানির শূন্যতা: সন্তান বড় করার নতুন চ্যালেঞ্জ
ঠাকুমা’র গল্প বলা, শিল্পী সমর মজুমদার।

সানজিদা শাহরিয়া সানজিদা শাহরিয়া

Published : 03 Sep 2026, 01:06 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

একশো তিরিশ বছরে মানবসভ্যতা রূপান্তর দেখেছে বড় এক ক্যানভাসে। আমরা এসে পৌঁছেছি পারিবারিক আড্ডা থেকে সরাসরি গুগলের সার্চ বারে। আর এই অভাবনীয় যাত্রার মাঝপথে আমরা হারিয়েছি সবচেয়ে মূল্যবান একটি জিনিস—যে মানুষটা ঠিক পাশের ঘরে থাকতেন। আমরা হারিয়েছি যৌথ পরিবারের সেই চিরাচরিত উষ্ণতা ও ভরসা। 

আমাদের বাবার সময়ে কোনো স্মার্টফোন ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, ছিল না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব। মানব-ইতিহাসে এই প্রথম একটা প্রজন্ম এমন সব জটিল সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা পূর্বসূরিদের ছিল না। যখন জীবনযাত্রায় অনুসরণ করার মতো কেউ থাকে না, যখন কোনো উদাহরণ সামনে থাকে না, তখন মানুষ কোথায় যায়? উত্তরটা খুব সহজ—ইন্টারনেটে। আর সেখানে ভার্চুয়াল পরামর্শের যেন কোনো শেষ নেই; কিন্তু যা নেই, তা হলো সেই পরামর্শের নির্ভরযোগ্যতা।

বাস্তবতা হলো, আজকের শহরের জীবনযাত্রায় পাশের ঘরটা একদম খালি। ‘দাদি পাশের ঘরে থাকতেন’—কথাটা হয়তো পরম সত্য, কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার যে যৌথ পরিবার সবার জন্য সর্বদা সমান নিরাপদ বা সদয় ছিল না। সেখানে অনধিকার হস্তক্ষেপ, কঠোর বিচার, শারীরিক শাস্তি এবং নারীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপও ছিল। তবে এই ইতিহাস যৌথ পরিবারে হুবহু ফিরে যাওয়ার কোনো ডাক দিচ্ছে না। এই আলোচনা কেবল এটুকুই মনে করিয়ে দিচ্ছে—সংকট বা প্রয়োজনে সহায়তার যে সামাজিক হাতগুলো তখন ছিল, আজ আমরা তার সমকক্ষ কোনো কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে পারিনি।

অতীতে একটি শিশুকে বড় করে তোলার পেছনে ভূমিকা রাখতেন অনেকজন মানুষ—দাদা-দাদি, চাচা-চাচি থেকে শুরু করে পাড়ার প্রতিবেশী পর্যন্ত। আর এখনকার ব্যস্ত শহরের একলা ছোট ফ্ল্যাটে বাবা-মা কেবলই একা। বিভিন্ন গবেষণা স্পষ্টভাবে বলছে যে, দাদা-দাদির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে শিশুর আচরণগত জটিলতা অনেকটাই কমে যায়, যার ফলে অভিভাবকের মানসিক চাপও অনেকটাই হালকা হয়। কিন্তু তীব্র নগরায়ণের এ যুগে সেই আত্মিক সম্পর্কটাই আজ সবচেয়ে দুর্লভ।

আজকের আধুনিক যুগে অ্যালগরিদম ঠিক করে দিচ্ছে আপনার শিশু আসলে কী দেখবে। আগে একজন অভিভাবক অন্তত জানতেন—তার সন্তান কোন বইটি পড়ছে অথবা টেলিভিশনে কোন চ্যানেলটি দেখছে। কিন্তু এখন একটা অদৃশ্য অ্যালগরিদম ক্ষণে ক্ষণে নির্ধারণ করে দেয় সন্তান পরের মুহূর্তে কী কনটেন্ট দেখবে। আর সেই সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় সম্পূর্ণ আপনার নজরের আড়ালে, প্রতি সেকেন্ডে, হাজার হাজার বার। পরিসংখ্যান বলছে, আট থেকে এগারো বছর বয়সি প্রায় অর্ধেক শিশু রোবলক্স বা মাইনক্রাফটের মতো গেমিং প্ল্যাটফর্মে বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে—খেলার ছলে। কিন্তু সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সেই ডিজিটাল কথোপকথনের সীমানায় আপনি কিন্তু বিন্দুমাত্র নেই।

বিজ্ঞান এখনো এই নতুন পরিস্থিতির চূড়ান্ত কোনো উত্তর তৈরি করতে পারেনি। জেন আলফা এখনো বড় হচ্ছে, তারা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের মনস্তত্ত্ব বা আচরণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ একটি বিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করতে বাস্তবে বিশ বছর সময়ই লাগে, অথচ জেন আলফাকে নিয়ে আমরা পার করেছি মাত্র পনেরো বছর। অভিভাবকরা যখন প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রশ্ন করছেন, বিজ্ঞান তখনো তার বৈজ্ঞানিক উত্তর তৈরি করে চলেছে। আর বিজ্ঞানের এই শূন্যতা বা ফাঁকটার ভেতরেই অতি সহজে ঢুকে পড়ে নানা ধরনের গুজব, অজানা ভয় আর তথাকথিত ‘ইউটিউব-বিশেষজ্ঞ’দের বিভ্রান্তিকর জ্ঞান। এই সার্বিক ঘাটতির একটিও হয়তো আপনার নিজের তৈরি নয়, তবে এর সামগ্রিক পরিণতির সমান অংশীদার দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনাকেও হতে হচ্ছে।

অনেক অভিভাবকের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা কাজ করে—‘অ্যালগরিদম হয়তো আপনার সন্তানের মনোদৈহিক অবস্থা জানে বা বোঝে।’ বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদম কোনো অবস্থাতেই শিশুর ‘ভালো’ চায় না। বাস্তবে অ্যালগরিদমের একমাত্র বাণিজ্যিক লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীকে যেকোনো মূল্যে স্ক্রিনে ধরে রাখা। সেখানে শিশুর ঘুম, পড়াশোনা, শারীরিক স্বাস্থ্য কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো জায়গা নেই; অ্যালগরিদমের হিসাবের বাইরে তারা অবস্থান করে। এটি স্রেফ একটি রুক্ষ ও কাঠখোট্টা ব্যবসায়িক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

সাম্প্রতিক সংবাদপত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দিকে নজর দিলেই এই সংকটের কদর্য রূপটি ভেসে ওঠে। যখন অ্যালগরিদমই কার্যত হয়ে ওঠে চিকিৎসক, তখন পরিণতি কতটা ভয়ানক হতে পারে তা স্পষ্ট হয়। গত ২২ জুলাই ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ প্রকাশ করে মুমতাহিনা রহমান তাজরীর একটি সরেজমিন প্রতিবেদন—“ডক্টর অ্যালগরিদম: হাউ সোশ্যাল মিডিয়া বিকেম বাংলাদেশ’স আনঅফিশিয়াল সাইকিয়াট্রিস্ট”। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বহু তরুণ পেশাদার চিকিৎসকের মূল্যায়ন এড়িয়ে কেবল টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের ক্ষণস্থায়ী রিলস দেখেই নিজেদের ‘ওসিডি’, ‘এডিএইচডি’ বা উদ্বেগের মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক রোগ নিজেরাই ‘নির্ণয়’ করে ফেলছেন—এবং সেই ভুল সিদ্ধান্তে তারা আশ্চর্যজনকভাবে বেশ আত্মবিশ্বাসীও থাকছেন।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ২০২৫ সালের একটি নির্ভরযোগ্য জরিপ অনুযায়ী, প্রায় প্রতি তিনজনে একজন তরুণ কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট দেখে নিজে নিজে নিজের মানসিক রোগ নির্ণয় করেছেন। জেন জি-র ক্ষেত্রে এই হার উদ্বেগজনকভাবে প্রতি দুজনে একজন। আর সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এদের অর্ধেকেরও কম তরুণ পরবর্তীতে কোনো পেশাদার চিকিৎসকের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কথা বলেছেন বা পরামর্শ নিয়েছেন।

কিন্তু এই কনটেন্টের মান আসলে কতটা গ্রহণযোগ্য? সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, টিকটকে সবচেয়ে জনপ্রিয় এডিএইচডি বিষয়ক ভিডিওগুলোর ৫২ শতাংশ এবং অটিজম-বিষয়ক ভিডিওগুলোর ৪১ শতাংশেই ক্লিনিক্যালি ভুল তথ্য ছিল। আর সবচেয়ে ভীতিপ্রদ তথ্যটি এই আলোচনার গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়: ২০২৫ সালে ‘ইউরোপিয়ান চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকটকে ভুল তথ্যের সংস্পর্শে এলে মানুষের প্রকৃত কার্যকর জ্ঞান উল্টো কমে যায়, কিন্তু নিজের জ্ঞান নিয়ে আত্মবিশ্বাস মিথ্যেভাবে বহুগুণ বেড়ে যায়।

উক্ত প্রতিবেদনটির উপসংহার ছিল বেশ সংযত ও গভীর: সমস্যা এটা নয় যে, তরুণ বাংলাদেশিরা মনোবিজ্ঞান বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আগ্রহী হচ্ছেন—সেটা বরং সামাজিক সচেতনতার দিকে একটি বড় অগ্রগতি। মূল সমস্যা হলো, সেই গভীর আগ্রহটা তৈরি হচ্ছে কোনো প্রকার সমালোচনামূলক চিন্তা বা পেশাদার নির্দেশনা ছাড়া, যা বিপজ্জনক।

একই চিত্র বিদেশের প্রেক্ষাপটেও স্পষ্ট। বাবা-মায়েরা সবসময় সন্তানকে সঠিক উপায়ে বড় করতে চান—কিন্তু তারা অনবরত পরস্পরবিরোধী বার্তার মুখোমুখি হচ্ছেন। গত ৬ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ-সংস্থা ‘টকার নিউজ’ প্রকাশ করে স্টিফেন বিচের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল—‘হোয়াই প্যারেন্টস ফিল কনফিউজড বাই স্ক্রিন টাইম অ্যাডভাইস ফর কিডস’। প্রতিবেদনটি মূলত ‘জার্নাল অব চিলড্রেন অ্যান্ড মিডিয়া’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা পরিচালনা করেছিলেন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এডিথ কাওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্টেফানি মিলফোর্ড।

গবেষকরা চার বছরের কম বয়সি শিশুর অস্ট্রেলীয় অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে—বাবা-মায়েরা অহরহ পরস্পরবিরোধী পরামর্শের বন্যায় ক্রমাগত ভাসছেন। কেউ হয়তো বলছেন সময়সীমা বেঁধে দিতে, আবার কেউ বলছেন আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে। ফলে বাবা-মায়েরা ক্রমাগত বিভ্রান্ত, উদ্বিগ্ন এবং নিজেদের সামর্থ্য অবমূল্যায়িত হচ্ছে বলে মানসিক কষ্টে ভুগছেন। গবেষক মিলফোর্ডের কথার সারমর্ম ছিল স্পষ্ট: “বাবা-মায়েরা আসলে সন্তানের জন্য ঠিক কাজটাই করতে চাইছেন, কিন্তু তারা সবদিক থেকে পরস্পরবিরোধী ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা পাচ্ছেন। এই ক্রমাগত স্ববিরোধ থেকেই তাদের মনে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।”

ওই গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ দিক উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে পুরনো ও অচল নিয়মেই আবার ফিরে যান—কেবল এই কারণে যে, সেই পুরনো নিয়মগুলো অন্তত স্পষ্ট এবং অনুসরণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি ছিল অজানা ‘ভয়’ নিয়ে। স্ক্রিন বা প্রযুক্তি সম্পর্কে ভয়-ভিত্তিক বার্তাগুলো অভিভাবকের ভেতরের অপরাধবোধ ও মানসিক উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, আর তাদের মনে হতে থাকে তারা বুঝি সন্তান লালনে ব্যর্থ হচ্ছেন। মিলফোর্ডের নিজস্ব ভাষায়—“ওই অবচেতন ভয়টাই অভিভাবককে নিজের ভেবেচিন্তে নেওয়া স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতি সন্দিহান করে তোলে, যদিও সিদ্ধান্তটা তারা সচেতনভাবেই নিয়েছিলেন।”

অতএব, গবেষকদের মূল সুপারিশ ছিল ব্যবহারিক: কঠোর বা চরম কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের জটিলতার সঙ্গে মেলে এমন পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন—যা সমাজ থেকে ‘টেকনোপ্যানিক’ বা প্রযুক্তি-সংক্রান্ত আতঙ্ক কমাবে এবং অভিভাবকদের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন করতে সাহায্য করবে।

আমাদের দেশের গবেষণার দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতার প্রতিফলন পাই। ‘অভিভাবক ভীষণ ক্লান্ত’—এই কথাটিকে হয়তো শুধুই একটি ব্যক্তিগত আবেগি অনুভূতি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপও করা হয়েছে। ‘জার্নাল অব ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটিজ’-এ প্রকাশিত একটি অনন্য গবেষণায় বাংলাদেশে স্নায়ুবিকাশজনিত জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের সেবা প্রদানকারী যত্নদাতাদের অভিভাবকত্বের মানসিক চাপ পরিমাপ করা হয়। এই গবেষণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি প্রমাণ করে—অভিভাবকত্বের যে মানসিক চাপ, তা বাংলাদেশেও বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিমাপযোগ্য, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনাযোগ্য এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়। তাই অভিভাবকদের এই ‘ক্লান্তি’ বা অবশভাব কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; এটি একটি পরিমাপযোগ্য বৈজ্ঞানিক চলক বা ভ্যারিয়েবল।

তাহলে কি দাদির পাশের ঘরটি সত্যিই অনেক বেশি জরুরি ছিল? বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘প্লস ওয়ান’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে দুই প্রজন্মের ১১ জোড়া মা ও নানিকে নিয়ে কাজ করা হয়। সেই গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক মায়েরা সন্তান পালনের জন্য সুরক্ষামূলক ও ঐতিহ্যবাহী যে চর্চাগুলো শিখেছেন, তা মূলত এসেছে তাদের আগের প্রজন্মের কাছ থেকে। আর এই শিক্ষা কোনো আনুষ্ঠানিক বই বা সরাসরি মৌখিক উপদেশে আসেনি; বরং তারা সেটি শিখেছেন স্বচক্ষে দেখে, বয়স্কদের অনুকরণ করে এবং তাদের সান্নিধ্যে থেকে। অর্থাৎ, সন্তান প্রতিপালনের ‘ম্যানুয়াল’ বা নির্দেশিকাটি আসলে কোনো বাঁধাই করা কাগজে লেখা ছিল না; সেটি জীবন্তভাবে অবস্থান করছিল একজন বাস্তব অভিজ্ঞ মানুষের ভেতরে। কিন্তু নগরায়ণের ধাক্কায় আজ সেই অভিজ্ঞ মানুষটিই সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

এমনকি ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত দেশের ইতিহাসের প্রথম প্যারেন্টিং-স্টাইল সংক্রান্ত জরিপে গবেষকরা নিজেরাও আক্ষেপ করে লিখেছেন—এর আগে বাংলাদেশে অভিভাবকত্বের ধরণ বা প্যারেন্টিং স্টাইল নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণাই পরিচালনা করা হয়নি। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে অবাক হতে হয় যে, ২০২১ সালের আগে এদেশের অভিভাবকত্বের ধরণ বোঝার জন্য আমাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক মানচিত্রই তৈরি ছিল না।

ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মূলত সন্তান পালনে দিকনির্দেশনার চরম শূন্যতা থেকেই জন্ম হয়েছিল বাজারচলতি প্যারেন্টিং-বইগুলোর। তবে কোনো বই বা গাইডলাইন কখনোই দাদি বা নানির মতো অভিজ্ঞ মানুষের বিকল্প হতে পারে না—সত্যি বলতে বই হচ্ছে দাদি-নানিমুক্ত সমাজে দাদির অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। উদাহরণ হিসেবে, ডা. বেঞ্জামিন স্পকের বই ‘দ্য কমন সেন্স বুক অব বেবি অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার’ (১৯৪৬) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সর্বাধিক বিক্রীত নন-ফিকশন বইয়ের মর্যাদা পেয়েছিল। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, অভিভাবকত্বের জন্য বইয়ের এই বিশাল বাণিজ্যিক বাজার তৈরিই হয়েছিল মূলত যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট সামাজিক ও মানসিক শূন্যতাকে কেন্দ্র করে। আর এটাও বেশ লক্ষণীয় যে, ডা. স্পকের বইয়ের কিছু বহুল প্রশংসিত পরামর্শ (যেমন শিশুকে উপুড় করে ঘুম পাড়ানো) পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং তা চিকিৎসকদের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

আজকের এই বাণিজ্যিক পৃথিবীতে মূলত ‘ভয়’ বিক্রি হয়, কোনো মানসিক ‘স্বস্তি’ সহজে পাওয়া যায় না। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ভয়-ভিত্তিক পরম পরামর্শগুলো অভিভাবকদের ভেতরের অপরাধবোধ বাড়িয়ে দেয় এবং তাদেরকে নিজেদের চিন্তাভাবনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কেও সবসময় সন্দিহান করে তোলে। আর একজন ভীত ও অপরাধবোধে ভোগা অভিভাবকই ঘন ঘন ইন্টারনেটের চমকপ্রদ লিংকে ক্লিক করেন, নতুন নতুন বাণিজ্যিক সমাধান কেনেন।

যে প্রজন্মকে বড় করার মতো কোনো নির্দিষ্ট বা প্রতিষ্ঠিত নিয়মপত্র আগে থেকে আমাদের কাছে লেখা নেই, আর যে প্রজন্মের সন্তানকে বড় করতে গিয়ে তাদের বাবা-মায়েরা নিজেরাও প্রতি মুহূর্তে শিখছেন এবং থমকে থমকে হাঁটতে শিখছেন—সেখানে একটা চিরন্তন প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কি সত্যিই আমাদের এই জেন আলফা সন্তানকে সফলভাবে বড় করছি, নাকি অজানা এক অনিশ্চিত ডিজিটাল পৃথিবীতে কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়াই আমরা দুজনেই একসঙ্গে, পাশাপাশি বড় হয়ে উঠছি!