ভ্রমণগদ্য
Published : 12 Apr 2026, 12:46 PM
আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুক চিরে জেগে ওঠা এক রহস্যময় দ্বীপপুঞ্জ ‘আজোরেস’। পর্তুগালের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জকে বলা হয় ‘আটলান্টিকের মুক্তো’। এই দ্বীপপুঞ্জেরই অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম দ্বীপ হলো ‘সাও মিগেল’।
সেখানে পা রাখলে প্রথমেই নাকে আসবে এক তীব্র গন্ধ- পোড়া সালফার বা গন্ধকের সেই ঘ্রাণ জানান দেবে, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক ঘুমন্ত দানবের পিঠের ওপর। সাও মিগেলের এই রহস্যময় অঞ্চলের নাম ‘ফুর্নাস’, যেখানে মাটি কথা বলে, মাটি নিশ্বাস ফেলে।
কুয়াশা আর ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা এই উপত্যকায় দেখা মেলে পৃথিবীর এক আদিমতম ও আশ্চর্যজনক রান্নার দৃশ্যের। এখানে আগুনের লেলিহান শিখা নেই, আধুনিক ইলেকট্রিক ওভেন নেই, নেই গ্যাস সিলিন্ডারের ঝনঝনানি। অথচ মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে রাজকীয় সব খাবারের স্বাদ। আগ্নেয়গিরির তপ্ত জঠরে দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধ হওয়া এই খাবারের নাম ‘কোজিদো দাস ফুর্নাস’। প্রকৃতির অবারিত দানকে মানুষের সৃজনশীলতায় রূপান্তর করার এমন রোমাঞ্চকর উদাহরণ পৃথিবীতে সত্যিই বিরল।
ফুর্নাস উপত্যকায় যখন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, যখন পর্যটকদের কোলাহল শুরু হয়নি, তখনই স্থানীয় ‘মেস্ত্রে’ বা প্রধান বাবুর্চিরা তাদের রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আগ্নেয়গিরির তাপকে রান্নায় ব্যবহার করার এই প্রক্রিয়াটি যেমন ধৈর্যের, তেমনি এক সুনিপুণ শিল্পের বহিঃপ্রকাশ। এই বিশেষ খাবারের নাম ‘কোজিদো’, যা পর্তুগিজ ভাষার একটি শব্দ, আক্ষরিক অর্থ ‘সিদ্ধ করা’।
কিন্তু এই সিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য। স্থানীয়রা বিশাল এক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে স্তরে স্তরে সাজান নানা পদের মাংস। গরুর মাংস, শূকরের মাংস এবং মুরগির মাংসের পাশাপাশি সেখানে স্থান পায় পর্তুগালের বিখ্যাত ‘চোরিজো’ ও ‘মরসেলা’ নামক বিশেষ এক ধরনের সসেজ। মাংসের এই পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে দেওয়া হয় গাজর, মিষ্টি আলু, বাঁধাকপি আর আলু দিয়ে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রান্নায় এক ফোঁটা পানিও দেওয়া হয় না। মাটির নিচের প্রচণ্ড তাপ আর মাংস ও সবজির নিজস্ব রসেই তৈরি হয় এই ‘কোজিদো’। পাত্রটির মুখ সাদা কাপড় দিয়ে বেঁধে তার ওপর শক্ত ঢাকনা বসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে মাটির কোনো ধূলিকণা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
তারপর শুরু হয় আসল কর্মযজ্ঞ। ফুর্নাসের হ্রদ বা লেকের পাশে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে স্থানীয় প্রশাসন গর্ত তৈরি করে রেখেছে, যেগুলোকে পর্তুগিজ ভাষায় বলা হয় ‘বুরাকো’। এই গর্তগুলো আসলে আগ্নেয়গিরির সুড়ঙ্গের মতো কাজ করে, যেখান থেকে অনবরত তপ্ত বাষ্প বের হতে থাকে। পাত্রটিকে দড়ির সাহায্যে সেই গর্তের গভীরে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং ওপর থেকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। গর্তের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয় একটি বিশেষ নম্বর প্লেট, যাতে রান্নার মালিক বা রেস্তোরাঁ সহজেই তা শনাক্ত করতে পারে।
মাটির নিচের তাপমাত্রা সেখানে প্রায় ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। এই ধীরগতির রান্না বা ‘স্লো কুকিং’ প্রক্রিয়ায় খাবারটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময়ে আগ্নেয়গিরির ভূগর্ভস্থ তাপ মাংসের তন্তুগুলোকে এতটাই কোমল করে তোলে যে তা মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। এছাড়া মাটির খনিজ উপাদান মিশ্রিত বাষ্প খাবারে যোগ করে এক বিশেষ আভিজাত্য, যা পৃথিবীর অন্য কোনো আধুনিক চুলোয় পাওয়া হয়তো সম্ভব নয়।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আজোরেস দ্বীপপুঞ্জে আগ্নেয়গিরির তাপ ব্যবহার করে রান্নার এই ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দীর পুরনো। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে যখন লিসবন বা ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মানুষ এই দ্বীপে বসতি স্থাপন শুরু করে, তখন জ্বালানি কাঠের অভাব ছিল প্রকট। আটলান্টিকের ঝোড়ো হাওয়ায় কাঠ জোগাড় করা এবং আগুন জ্বালিয়ে রাখা ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই প্রতিকূলতা থেকেই দ্বীপবাসীরা প্রকৃতির এই অবারিত তাপশক্তিকে কাজে লাগানোর কৌশল রপ্ত করে।
তারা লক্ষ্য করেছিল, মাটির যে অংশ থেকে বাষ্প বের হচ্ছে, সেখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি। জীবনধারণের এই অনন্য কৌশল সময়ের আবর্তে আজ এক বিশ্ববিখ্যাত রন্ধনশৈলীতে পরিণত হয়েছে। ‘বিবিসি ট্রাভেল’ এবং ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর মতো আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো এই ‘জিওথার্মাল’ বা ভূ-তাপীয় রান্নার পদ্ধতিকে পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর খাদ্যাভ্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি আজ কেবল ক্ষুধার অন্ন নয়, বরং আজোরেসের মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিতালির এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে ফুর্নাস উপত্যকায় এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। শত শত পর্যটক ভিড় করেন সেই নির্দিষ্ট এলাকায়। যখন বাবুর্চিরা হাতে কোদাল নিয়ে মাটির ঢিবি সরাতে শুরু করেন, তখন চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। মাটির নিচ থেকে যখন সেই বিশাল তপ্ত পাত্রটি দড়ি দিয়ে টেনে তোলা হয়, তখন সেখান থেকে নির্গত হওয়া সুবাসে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
পর্যটকদের জন্য এটি এক শিহরণজাগানিয়া অভিজ্ঞতা। মাটি খুঁড়ে খাবার বের করার এই দৃশ্যটি যেন কোনো প্রাচীন গুপ্তধন আবিষ্কারের গল্পের মতো। যারা এই খাবারের স্বাদ নিয়েছেন, তাদের মতে কোজিদোর স্বাদ অন্য সব স্টু বা ঝোল জাতীয় খাবার থেকে আলাদা। এর হওয়ার মূল কারণ হলো এর ‘আর্থি’ বা মাটির সোঁদা গন্ধ এবং সালফারের হালকা এক ধরনের ছোঁয়া।
পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘পাবলিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রান্নায় কোনো কৃত্রিম মশলার আধিক্য থাকে না, বরং উপাদানের নিজস্ব গুনাগুন আগ্নেয়গিরির তাপে একীভূত হয়ে এক জাদুকরী স্বাদ তৈরি করে।
এই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর স্থানে পৌঁছানো এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। আটলান্টিকের এই নিভৃত দ্বীপে যাওয়ার প্রধান প্রবেশপথ হলো বিমানপথ। পর্তুগালের রাজধানী লিসবন এবং বাণিজ্যিক শহর পোর্তো থেকে নিয়মিত সরাসরি ফ্লাইট পরিচালিত হয় আজোরেসের সাও মিগেল দ্বীপের প্রধান শহর পন্তা দেলগাদাতে।
পর্তুগালের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা ‘ট্যাপ এয়ার পর্তুগাল’ এবং স্থানীয় ‘সাতা এজোরস এয়ারলাইনস’ পর্যটকদের সেবা দিয়ে থাকে। লিসবন থেকে উড়াল দেওয়ার মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন এই আগ্নেয়গিরির দ্বীপে। পন্তা দেলগাদা বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে বা ট্যাক্সিতে করে প্রায় ৪০ মিনিটের একটি চমৎকার পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে আপনি পৌঁছাতে পারবেন ফুর্নাস উপত্যকায়। রাস্তার দুপাশে থাকা নীল রঙের ‘হাইড্রেনজিয়া’ ফুল আর ঘন সবুজ পাহাড় আপনাকে এক রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যাবে।
আজোরেস দ্বীপপুঞ্জ মোট ৯টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত, যার প্রতিটিই আগ্নেয়গিরির প্রভাবে সৃষ্ট এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াতের জন্য পর্যটকরা ছোট ছোট অভ্যন্তরীণ বিমান বা বিশাল ফেরি ব্যবহার করেন। তবে ফুর্নাসের এই কোজিদো খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে হলে সাও মিগেল দ্বীপেই থাকতে হয় বেশি। ফুর্নাস অঞ্চলে শুধু যে রান্নাই হয় তা নয়, এখানে রয়েছে তপ্ত পানির প্রস্রবণ বা ‘হট স্প্রিং’, যেখানে পর্যটকরা শরীর জুড়িয়ে নিতে পারেন।
এছাড়া রয়েছে বিশাল সব বোটানিক্যাল গার্ডেন, যার মধ্যে ‘টেরা নস্ট্রা পার্ক’ অন্যতম। আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত কাদা বা ‘মাড পুল’ দেখার অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এখানকার প্রকৃতি যেমন রুদ্ররূপ দেখাতে জানে, তেমনি মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছে তার অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা।
পর্তুগালের এই দূরবর্তী দ্বীপে প্রকৃতির এই অদ্ভুত পাকশালা যেন মানুষের সৃজনশীলতা আর ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। আগ্নেয়গিরির সেই উত্তপ্ত গর্ত থেকে যখন শেষ পাত্রটি তুলে আনা হয়, তখন বোঝা যায় কেন আজও মানুষ যান্ত্রিক সভ্যতা ছেড়ে এই আদিম স্বাদের সন্ধানে আটলান্টিকের পাড়ি দেয়। এই অভিজ্ঞতা কেবল পর্যটন নয়, বরং প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক যাত্রা। আগ্নেয়গিরির তাপে রান্না হওয়া সেই খাবারের প্রথম গ্রাসটি যখন মুখে যায়, তখন মনে হয়- প্রকৃতির চেয়ে বড় রাঁধুনি আর কেউ নেই।