১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মালো উপাখ্যান: ‘স্বাধীন দেশ আমাদের ক্ষুদ্র করে রেখেছে’

মালোরা আজও গর্বের সঙ্গে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে।

মালো উপাখ্যান: ‘স্বাধীন দেশ আমাদের ক্ষুদ্র করে রেখেছে’
তিন মালো নারী, ছবি: লেখক।

সালেক খোকন সালেক খোকন

Published : 06 Sep 2026, 12:10 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

দিনাজপুরের নিভৃত গ্রাম ‘শীতল গাঁও’। সেখানে মালোদের একটি জটলায় আলাপ হচ্ছিল বিয়ে নিয়ে। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই একে একে বেরিয়ে এলো মালো সম্প্রদায়ের জন্ম-মৃত্যু আর জীবনের বিচিত্র সব আচারের কথা। 

মালো নারী গঙ্গা পরম মমতায় বর্ণনা করছিলেন তাদের সমাজচিত্র। তিনি জানালেন, মালো সমাজে নবজাতকের জন্মের সাত দিন পর ‘নুয়া’ নামক একটি বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হয়। ‘নুয়া’ শব্দের অর্থ নাপিত। সেই দিন সমাজের সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয় এবং নাপিত এসে উপস্থিত পুরুষদের চুল-দাড়ি কেটে দেন। এই নুয়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল পরিবারের পুরুষরা নবজাতকের ঘরে প্রবেশের অনুমতি পান। 

এছাড়া মালোরা শিশুর জন্মের পাঁচ বা বারো দিনের মাথায় আয়োজন করে ‘বরোহি’ অনুষ্ঠানের। সেদিন নবজাতকের চুল কাটা হয় এবং বাড়ির যাবতীয় কাপড়-চোপড় ধুয়ে শুদ্ধ করা হয়। এমনকি পুরনো মাটির আসবাব বা হাঁড়ি-পাতিল থাকলে তাও ভেঙে ফেলার নিয়ম প্রচলিত, কারণ মালোদের বিশ্বাস এতে ঘরের যাবতীয় অশুচি দূর হয়। এই বরোহির দিনই নবজাতকের নাম রাখা হয় এবং প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে তার মুখ দর্শনের সুযোগ মেলে।

আলোচনার এক পর্যায়ে উৎসবের মেজাজ ছাপিয়ে চারপাশ কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে আসে। গঙ্গার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের মুখ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি শুরু করেন মালোদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিবরণ। মালোরা তাদের মৃতদেহ দাহ করে। দাহ করার আগে মৃতের শরীর ধূপ, গোলাপজল ও সাবান দিয়ে পরম যত্নে স্নান করিয়ে হলুদ ও সিঁদুর মেখে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর টানা পাঁচ দিন পর্যন্ত মালো পরিবারে মাছ, মাংস ও তেল দিয়ে রান্না করা খাবার গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 

এই শোকের সময়টি অতিবাহিত হওয়ার পর পঞ্চম দিনে তারা ‘কুয়্যারি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেদিন মুরগি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে সমাজের অন্তত পাঁচজন ব্যক্তিকে কলাপাতায় পরিবেশন করা হয়। নাপিত এসে পরিবারের ছেলেদের চুল ফেলে দেন এবং নারীরা স্নান সেরে, নখ কেটে হলুদের জল পান করে শুদ্ধ হন।

কথার মাঝেই চঞ্চল চরণে সেখানে উপস্থিত হন প্রভু মালো। বছর চল্লিশের এই মানুষটির হাসিমাখা মুখে বিনয়ের ছাপ স্পষ্ট। গঙ্গার প্রতিবেশী প্রভু আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন মালো পাড়াটি। সঙ্গী হলো মারিয়ার বোন বাসন্তী। হাঁটতে হাঁটতে প্রভু জানালেন তাদের বংশপরম্পরার ইতিহাস। 

দিনাজপুর, রংপুর, মৌলভীবাজার ও জয়পুরহাট জেলাতেই মূলত মালো আদিবাসীদের বসবাস। মাছ ধরা তাদের আদি ও জাতিগত পেশা হলেও সময়ের বিবর্তনে আজ তারা কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাদের অন্যতম প্রধান উৎসব হলো ‘পুষনা’, যা পৌষ মাসে অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। এ সময় মালোরা দলবেঁধে তীর-ধনুক নিয়ে শিকারে বের হয়। শিকার করা প্রাণীর মাংস দিয়ে রান্না হয় তৃপ্তিদায়ক খিচুড়ি। তবে যে ব্যক্তি শিকারটি ধরেন, তাকে বিশেষ সম্মান হিসেবে মাংসের একটি বড় বা নির্দিষ্ট অংশ দেওয়া হয়। 

এছাড়া ফসল কাটার মৌসুমে ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান সংগ্রহ করা মালোদের এক প্রাচীন ঐতিহ্য। ধানের পাশাপাশি তারা দলবদ্ধভাবে মুসা বা ইঁদুরও শিকার করে থাকে। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, মালোদের এই সমৃদ্ধ আচারগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কেন এই বিলুপ্তি? প্রশ্নের উত্তরে প্রভু জানালেন এক রূঢ় বাস্তবতা। শীতল গ্রামের মাত্র নয়টি পরিবার আজ তাদের সনাতন রীতি ধরে রেখেছে। বাকিরা পারিপার্শ্বিক চাপে বা জীবনবোধের তাগিদে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলে মালোদের ধর্মকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতিগুলো ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। 

এই আলাপনের মধ্যেই আমরা এসে দাঁড়ালাম একটি জীর্ণ কিন্তু পরিপাটি বাড়ির সামনে। প্রভুর ডাকে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ষাটোর্ধ্ব এক সৌম্য বৃদ্ধ, জুয়েল মালো। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে তিনি ৭ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। সহযোদ্ধা ধীরেন মালোর প্রয়াণের পর জুয়েল মালোই এখন গ্রামের একমাত্র জীবিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। 

যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে। তিনি বলেন, “তখন তো কোনো জাত-ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ছিল না। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি। একজন আদিবাসী বা হিন্দু মুক্তিযোদ্ধা একজন মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিতে পিছপা হতো না। সবার উপরে ছিল দেশ এবং আমরা সবাই ছিলাম এক।” কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট তাকে দারুণভাবে ব্যথিত করে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “স্বাধীন দেশ আজ আমাদের ক্ষুদ্র করে রেখেছে।”

এক সময় শীতল গ্রামের এই মালোদের ছিল নিজস্ব জমিজমা। কিন্তু অভাবের তাড়নায় স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে কড়া সুদে ঋণ নিতে গিয়ে তারা টিপসই দিয়ে জমি হারিয়েছেন। মহাজনরা চাতুরতার সঙ্গে তাদের ভিটেমাটি দখল করে নিয়েছে। জমির অধিকার নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে আজও তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। মুক্তিযোদ্ধা জুয়েল মালো ক্ষোভের সঙ্গে জানান, স্বাধীন দেশে আজ তারা নিজ ভূমেই পরবাসীর মতো বেঁচে আছেন। সংবিধান আছে, কিন্তু সেখানে তাদের আত্মপরিচয় বা অধিকারের সুনির্দিষ্ট স্থান নেই। একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার কাছে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে!

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ফেরার সময় মারিয়ার বাবা ভরত মালো বেশ উৎসাহ নিয়ে জানালেন তার মেয়ের বিয়ের খবর। পাত্র রংপুরের এক ওরাওঁ পরিবারের সদস্য। ধর্মান্তরের ফলে ভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে বিয়ের যে প্রাচীন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা আজ আর নেই। খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর মালো ও ওরাওঁদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে কোনো বাধা নেই।

বাস্তবতা হলো, ধর্মান্তরিত হওয়ার ফলে মালো সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আর্থিক সচ্ছলতাও এসেছে। কিন্তু এই উন্নতির মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে—তারা নিঃশব্দে হারিয়ে ফেলছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষদের হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। 

তবুও মালোরা আজও গর্বের সঙ্গে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। আপন জাতিসত্তার প্রতি এই যে প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং মমত্ববোধ, এটাই প্রতিকূলতার মাঝে মালোদের টিকে থাকার প্রধান শক্তি।