১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন: আধুনিক লাইব্রেরির রূপকার

“লাইব্রেরিগুলো আমেরিকানদের চিন্তাধারার মান বহুগুণে উন্নত করেছে।”

বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন: আধুনিক লাইব্রেরির রূপকার
বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের আত্মজীবনী ও ‘লাইব্রেরি কোম্পানি অফ ফিলাডেলফিয়া’।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 03:41 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

প্রাচীন যুগে রাজা-মহারাজা বা ধর্মযাজকরাই কেবল জ্ঞানচর্চার সুযোগ পেতেন। সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছানোটা সহজ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মহামানবের জন্ম হয়েছে, যারা সমাজের এই বৈষম্যকে ভেঙে সাধারণ মানুষের হাতে জ্ঞানের মশাল তুলে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ছিলেন ঠিক তেমনই একজন দূরদর্শী মানুষ। 

দেশটির একশো ডলারের নোটে ছাপা তার প্রশান্ত মুখাবয়বটি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি কেবল একজন বিজ্ঞানী, কূটনীতিবিদ বা লেখকই ছিলেন না, ছিলেন এমন এক যুগান্তকারী ব্যবস্থার প্রবর্তক যা পুরো বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আর সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি হলো ‘পাবলিক লেন্ডিং লাইব্রেরি’ বা আধুনিক পাঠাগার ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে বই পৌঁছে দেওয়ার যে ধারণা আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার বীজ রোপণ করেছিলেন এই চিন্তাবিদ।

বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের জীবনের গল্পটি রূপকথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ১৭০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন শহরে সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নেন তিনি। তার বাবা জোসিয়াহ ফ্র্যাঙ্কলিন পেশায় ছিলেন সাবান ও মোমবাতি প্রস্তুতকারক। সতেরো ভাইবোনের এক বড় সংসারে বেঞ্জামিন ছিলেন পনেরোতম সন্তান। আর্থিক অনটনের কারণে প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ তার জীবনে খুব একটা আসেনি। মাত্র দু’বছর স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তার, দশ বছর বয়সেই তাকে পড়াশোনা ছেড়ে বাবার কাজে সাহায্য করতে হয়। 

কিন্তু বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। বড় ভাই জেমসের ছাপাখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখানে কাজ করার সুবাদে প্রচুর দেশি-বিদেশি বই পড়ার সুযোগ পান। অল্প বয়সেই তিনি ‘সাইলেন্স ডুগুড’ ছদ্মনামে পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন, যা সেসময় বেশ আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সতেরো বছর বয়সে তিনি একরকম খালি পকেটে বোস্টন ছেড়ে ফিলাডেলফিয়ায় পালিয়ে যান এবং সেখানে নিজের নতুন জীবন গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করেন। 

ফিলাডেলফিয়ায় এসে তিনি মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার প্রকাশিত পত্রিকা ‘পেনসিলভানিয়া গেজেট’ এবং পঞ্জিকা ‘পুওর রিচার্ডস অ্যালম্যানাক’ ওই সময়ের যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়তা পায়। ফ্র্যাঙ্কলিন নিজের জীবনের সংগ্রাম থেকে ভালো করেই বুঝেছিলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব থাকলেও স্বশিক্ষার মাধ্যমে মানুষ বহুদূর এগোতে পারে। আর এই স্বশিক্ষার একমাত্র এবং প্রধান হাতিয়ার হলো বই। 

কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক যুক্তরাষ্ট্রে বই ছিল দুর্লভ এবং মহার্ঘ এক বস্তু। সেসময় দেশটিতে নিজস্ব প্রকাশনা শিল্প তেমন একটা গড়ে ওঠেনি, ফলে বেশিরভাগ বই-ই জাহাজে করে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইউরোপ থেকে আসত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে এত চড়া দামে ইউরোপ থেকে আসা বই কিনে পড়াটা ছিল এককথায় অসম্ভব। এই সমস্যার সমাধানের চিন্তাই তরুণ ফ্র্যাঙ্কলিনের মাথায় প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছিল।

১৭২৭ সালের কথা। ফিলাডেলফিয়ায় ‘জুনটো’ নামে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা চক্র বা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন ফ্র্যাঙ্কলিন। এই ক্লাবের সদস্যরা অভিজাত ছিলেন না; ছিলেন মূলত সাধারণ কারিগর, কেরানি, জরিপকারী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় তারা মিলিত হতেন এবং সমাজ, নীতিবিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত তর্কবিতর্ক ও আলোচনা করতেন। তাদের এই বিতর্কগুলো ছিল প্রাণবন্ত এবং গোপনীয়। 

ফ্র্যাঙ্কলিন ও তার সঙ্গীরা দ্রুতই উপলব্ধি করলেন যে, তাদের এই বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ক বিতর্কগুলোকে যৌক্তিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচুর রেফারেন্স বা প্রামাণ্য বইয়ের প্রয়োজন। তর্ক চলাকালীন কোনো একটি নির্দিষ্ট তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য নির্ভরযোগ্য বইয়ের অভাব তারা অনুভব করতে লাগলেন। কিন্তু একে তো বইয়ের দাম আকাশছোঁয়া, তার ওপর সবার কাছে সব বই থাকেও না। ঠিক এই সংকটের মুহূর্তেই ফ্র্যাঙ্কলিনের মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি এমন এক সমন্বিত লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কথা ভাবলেন যেখানে সদস্যরা নির্দিষ্ট চাঁদা বা সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে বই পড়ার সুযোগ পাবেন।

ফিলাডেলফিয়ার ‘দ্য লাইব্রেরি কোম্পানি’র পাঠকক্ষ (আনুমানিক ১৯৩৫ সাল), যা ১৮৮০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল, ছবি: দ্য লাইব্রেরি কোম্পানি অফ ফিলাডেলফিয়া।

ফিলাডেলফিয়ার ‘দ্য লাইব্রেরি কোম্পানি’র পাঠকক্ষ (আনুমানিক ১৯৩৫ সাল), যা ১৮৮০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল,

এই যুগান্তকারী ধারণা থেকেই ১৭৩১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘লাইব্রেরি কোম্পানি অফ ফিলাডেলফিয়া’। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম সাবস্ক্রিপশন বা চাঁদা-ভিত্তিক লাইব্রেরি। এর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত দিকটি ছিল একেবারেই অভিনব। প্রথমে এই লাইব্রেরির সদস্য হয়েছিলেন সমাজের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আয়ের কারিগর এবং শ্রমজীবী মানুষেরা। তারা প্রত্যেকেই অল্প মূল্যে এই লাইব্রেরির শেয়ার বা অংশীদারিত্ব কিনেছিলেন। এই শেয়ার কেনাটা কেবল টাকা দিয়ে বই পড়ার সুযোগ ছিল না, ফ্র্যাঙ্কলিন এটিকে দেখেছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের স্থায়ী বিনিয়োগ হিসেবে। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, লাইব্রেরির এই শেয়ারগুলো বংশপরম্পরায় হস্তান্তরযোগ্য ছিল, অর্থাৎ একজন সদস্যের মৃত্যুর পর তার সন্তানেরাও সেই লাইব্রেরির সুবিধা নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোগ করতে পারতেন।

ফ্র্যাঙ্কলিন সবসময় চাইতেন সাধারণ মানুষ যেন ব্যবহারিক এবং বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন জ্ঞান অর্জন করতে পারে। তাই তিনি লাইব্রেরিতে এমন সব বই রাখার পক্ষপাতী ছিলেন যেগুলো সহজ ইংরেজি ভাষায় লেখা এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে বোধগম্য। পাঠকদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই লাইব্রেরির ক্যাটালগ বা বইয়ের তালিকা তৈরি করা হতো। এই উদ্যোগটি অল্প দিনেই সাফল্য পায়। জনপ্রিয়তা ও পাঠকের সংখ্যা এতটাই দ্রুত বাড়তে থাকে যে, কিছুদিনের মধ্যেই লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। তারা নিয়ম করে যে, যারা লাইব্রেরির শেয়ারহোল্ডার বা স্থায়ী সদস্য নন, তারাও সামান্য কিছু অর্থ জামানত হিসেবে রেখে লাইব্রেরি থেকে বই বাড়িতে ধার নিয়ে যেতে পারবেন এবং পড়া শেষ হলে বই ফেরত দিয়ে নিজেদের জামানতের টাকা বুঝে নিতে পারবেন।

আজকের দিনে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নিয়ে বাড়ি যাওয়াটা খুব সাধারণ এবং প্রাত্যহিক একটি বিষয় মনে হলেও সেই সময়ে এটি ছিল সামাজিক বিপ্লব। এর গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে সমসাময়িক ইউরোপ বিশেষ করে ব্রিটেনের দিকে। সেই যুগে ব্রিটেনের বিত্তবান ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তিরা জনকল্যাণের জন্য লাইব্রেরিতে বই দান করতেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই বই কেবল লাইব্রেরির চার দেয়ালের ভেতরে বসেই পড়তে পারত। বই চুরি যাওয়ার ভয়ে অনেক লাইব্রেরিতে বইগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই শেলফের সঙ্গে লোহার শক্ত শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো! বই কোনোভাবেই লাইব্রেরির বাইরে নেওয়ার নিয়ম বা সুযোগ ছিল না। সেই শেকল বাঁধা বইয়ের একচেটিয়া যুগে ফ্র্যাঙ্কলিনের এই ‘লেন্ডিং লাইব্রেরি’ বা বই ধার দেওয়ার পদ্ধতি ছিল সাধারণ মানুষের জ্ঞানের দুনিয়ায় এক মুক্তির সনদ। তিনি বইয়ের শেকল ভেঙে তাকে মুক্ত করে দিলেন সবার জন্য।

ফ্র্যাঙ্কলিনের এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করে। ১৮০০ সালের মধ্যে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৪০টিরও বেশি এমন লেন্ডিং লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। বইয়ের এই সহজলভ্যতা দেশটির সমাজব্যবস্থায় নীরব কিন্তু শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব নিয়ে আসে। ১৭৭১ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধের যখন আর খুব বেশি দেরি নেই, তখন ফ্র্যাঙ্কলিন তার আত্মজীবনীতে এই লেন্ডিং লাইব্রেরিগুলোর ভূমিকা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণের কথা লিখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, “এই লাইব্রেরিগুলো আমেরিকানদের সাধারণ আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাধারার মান বহুগুণে উন্নত করেছে।” তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই লাইব্রেরিগুলো “সাধারণ কৃষক ও কারিগরদের অন্যান্য দেশের অভিজাত ভদ্রলোকদের মতোই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী করে তুলেছিল।”

স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৮০০ সাল পর্যন্ত যখন ফিলাডেলফিয়া শহরটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তখন ফ্র্যাঙ্কলিনের প্রতিষ্ঠিত এই ‘লাইব্রেরি কোম্পানি’ দেশটির প্রথম অলিখিত ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরা এই লাইব্রেরির বই পড়েই রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন।

১৭৯০ সালের ১৭ এপ্রিল, ৮৪ বছর বয়সে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এই সাধক ফিলাডেলফিয়ায় মারা যান। কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলো আজও মানুষের মাঝে অম্লান হয়ে আছে। ফ্র্যাঙ্কলিনের সেই ছোট্ট উদ্যোগ ‘লাইব্রেরি কোম্পানি’ আড়াইশ বছরের বেশি সময় পার করে আজ একটি স্বাধীন, সমৃদ্ধ গবেষণা গ্রন্থাগার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো এটি শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে লাইব্রেরিটি এখন জনসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।