ভ্রমণগদ্য
Published : 20 Jan 2026, 01:00 PM
“তুমি আর আমি এক পৃথিবী হতে, হাজার মাইল ভ্রমণ শেষে, দেখা হবে বেইজিংয়ে এসে।” ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকের সেই জাদুকরী থিম সং ‘ইউ অ্যান্ড মি’ মনের গহীন কোনো গহ্বর থেকে হঠাৎ প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। লরিন রাইট আর লিউ হুয়ানের সেই সুরটা বাস্তবে বাজছিল না, বাজছিল স্মৃতির পাতায়।
মানুষের মন বড় অদ্ভুত এক আধার; কখন কোন বিস্মৃত সুর সেখানে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকে এবং মুহূর্তের ইশারায় তা বর্তমানের পটে ভেসে ওঠে, তা বলা দুষ্কর। সকালের রাজকীয় জলখাবার শেষ করে আমাদের বিশাল ট্যুরিস্ট বাসটি যখন জিংচেং এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বেইজিং শহরের বুক চিরে উত্তরের দিকে তীব্র গতিতে যাত্রা শুরু করল, তখন বেইজিংয়ের সেই অলিম্পিক সুরটিই যেন আমার শিরায় শিরায় নতুন এক রোমাঞ্চ জাগাচ্ছিল।
আমাদের গন্তব্য ছিল ‘ন্যাশনাল এক্সপেরিমেন্ট স্টেশন ফর প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার সেন্টার’ (সিএনইএসপিএসি)। হোটেল থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি কেবল একটি গবেষণা কেন্দ্র নয়, বরং এটি হলো চীনের আধুনিক কৃষি বিপ্লবের এক বিশাল গবেষণাগার এবং বিশ্বমানের প্রযুক্তির এক মহতী প্রদর্শনী।
রাজধানী বেইজিং কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নয়, এটি আজ বিশ্ব বিজ্ঞানের এক অনন্য তীর্থস্থান। ‘নেচার ইনডেক্স’ অনুযায়ী বেইজিং টানা ৯ বছর ধরে বিশ্বের এক নম্বর ‘সায়েন্স সিটি’র গৌরবময় মুকুট পরে আছে। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় আর পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই শহরের ধমনিতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবনের রক্ত সঞ্চার করছে।
এমন একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শহরের চওড়া রাজপথ দিয়ে যখন আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো এক অপ্রতিরোধ্য ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি। শহরের ব্যস্ততা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত কারুকার্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন সময়ের চেয়েও দ্রুতগামী কোনো এক মহাজাগতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
ভিয়েনা হোটেল ছাড়ার আগে সকালের নাস্তার টেবিলে যে আয়োজন দেখেছিলাম, তা চীনের বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যেরই এক খণ্ড প্রতিচ্ছবি। আমাদের পাতে ছিল হাতের তালুর মতো বিশাল সাইজের ধবধবে সাদা ‘মুমু’ বা ডাম্পলিং, স্টিমড বা ভাপে সেদ্ধ করা। সঙ্গে ছিল নানা পদের চালের পিঠা, হাতে টানা দীর্ঘ নুডুলস- যা দীর্ঘায়ুর প্রতীক হিসেবে চীনাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এছাড়া ছিল পাউরুটি, টাটকা বাটার, সেদ্ধ ডিম, কর্নফ্লেক্স আর গরম দুধের সঙ্গে কড়া লিকারের চা।
পশ্চিমের উরুমচির রুক্ষ আর মশলাদার খাবারের তুলনায় বেইজিংয়ের এই নাস্তা ছিল বেশ মোলায়েম, সুপাচ্য ও স্বাস্থ্যকর। বিশাল এই চীনের একেক অঞ্চলের খাদ্য সংস্কৃতি যে কতটা ভিন্ন হতে পারে, তার রহস্যময় পাঠ যেন আমি এই নাস্তার টেবিল থেকেই পাচ্ছিলাম। উত্তরের এই বেইজিংয়ে খাবারের স্বাদে এক ধরনের রাজকীয় আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের মিশেল সুস্পষ্ট।
প্রকৃতি আর আধুনিক স্থাপত্যের এক অনবদ্য মিতালি হলো এই বেইজিং সিটি। গতকাল ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরে ঢোকার সময়ই সবুজের সেই সমারোহ দেখে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। রাস্তার দুই পাশে শুধু গাছ আর গাছ, মনে হচ্ছিল কোনো এক গহীন অরণ্যের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে এই আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে।
বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, বেইজিং শহরের প্রায় ৪৫ শতাংশ ভূমিই বনভূমি দ্বারা আবৃত। একটি আধুনিক মেগাসিটি কীভাবে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর হতে পারে, বেইজিং তার এক সার্থক উদাহরণ। ভোরের হালকা কুয়াশা আর মোলায়েম স্নিগ্ধ পরিবেশ যেন সেই ব্যাপক সবুজায়নেরই এক জীবন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছিল। ফুরফুরে আমেজ আর সতেজ অক্সিজেন আমাদের বাসের ভেতরের গুমোট ভাবটাকে নিমিষেই কাটিয়ে দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই আমার মনে পড়ে গেল উরুমচির সেই প্রাণবন্ত উইঘুর যুবক আব্দুস সালামের কথা। কয়েকদিন আগে এক বিকেলে যখন উরুমচির স্যাটেলাইট স্কয়ারে তার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তখন সে বেইজিং নিয়ে তার আবেগের কথা বলেছিল। সালামকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “সালাম, তোমাদের এই বিশাল দেশের কোন শহরটি তোমার সবচেয়ে প্রিয়?” সে একটু হেসেই বলেছিল, “সাংহাই আধুনিক ঠিকই, কিন্তু বেইজিং হলো চীনের আত্মা। বেইজিং মানেই ইতিহাস, বেইজিং মানেই বিপ্লব।”
সালাম তার মোবাইলে অনুবাদ করে আমাকে জানিয়েছিল ১৯৪৯ সালের সেই ঐতিহাসিক পহেলা অক্টোবরের মাহেন্দ্রক্ষণের কথা। সেই শনিবারে তিয়েন আনমেন স্কয়ারের লাল গেট টাওয়ারে দাঁড়িয়ে জননেতা মাও সেতুং যখন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা হলো এবং চীনের মানুষ এখন থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো”, সেটিই ছিল আধুনিক চীনের নতুন যাত্রার শুরু। তিয়েন আনমেন স্কয়ারের সেই ইতিহাস কেবল চীনের নয়, বরং পুরো এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছিল।
বেইজিংয়ের মাটি ও বাতাসের পরতে পরতে আজও সেই বিপ্লবের তেজ অনুভূত হয়। এখানেই সূচিত হয়েছিল ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ এবং পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের নানা কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ। আজও ‘ভবিষ্যতের সুপারপাওয়ার’ চীনের সব মহাপরিকল্পনা এই বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অফ পিপল’ থেকেই চূড়ান্ত রূপ পায়।
সালামের কথাগুলো বাসের জানালার বাইরে দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্যের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সে বেইজিংকে কেন ‘উৎসবের নগরী’ বলেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারছিলাম। বসন্ত উৎসব, লণ্ঠন উৎসব, ড্রাগন বোট উৎসব আর মধ্য-শরৎ উৎসব- প্রতিটি অনুষ্ঠানই বেইজিংয়ের মানুষের জীবনে নতুন প্রাণের জোয়ার আনে।
বিশেষ করে চীনা নববর্ষ বা বসন্ত উৎসবের সময় পুরো বেইজিং যখন লাল লণ্ঠনে সেজে ওঠে এবং ঐতিহ্যবাহী ‘ডাম্পলিং’ আর ‘সিয়া গাও’ খাওয়ার ধুম পড়ে, তখন শহরটা এক মায়াবী স্বর্গপুরীতে পরিণত হয়। পরিবার পরিজনদের সঙ্গে মিলনমেলা আর দুর্ভাগ্য দূর করতে ফাটানো আতশবাজির আলোয় যখন বেইজিংয়ের আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় কোনো এক পৌরাণিক রূপকথা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ১৫ দিনের সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু থাকে এই বেইজিং, যা পুরো চীনের সংস্কৃতির এক মহামিলন মেলা।

হঠাৎ সহযাত্রী এমির মৃদু চিৎকারে আমি বর্তমানে ফিরে এলাম। এমি জানালার বাইরে আঙুল দিয়ে বিশাল আকাশছোঁয়া এক স্থাপত্য দেখাচ্ছিল, “লুক, দ্যাটস বেইজিং’স টলেস্ট বিল্ডিং, চায়না জুন!” জানালার বাইরে তাকাতেই আমার মনে হলো আমরা যেন কোনো এক অত্যাধুনিক সায়েন্স ফিকশন মুভির ‘গ্লাস সিটি’র ভেতর দিয়ে চলছি। শত শত আকাশচুম্বী দালানের ভিড়ে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ১০৯ তলার এই দানবীয় অট্টালিকা। বেইজিংয়ের এই আকাশচুম্বী স্থাপত্যটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘সিআইটিআইসি টাওয়ার’, যা ‘চায়না জুন’ নামে পরিচিত।
৫২৮ মিটার উঁচু এই ভবনের নকশা করা হয়েছে প্রাচীন চীনের ব্রোঞ্জের মদের পাত্র ‘জুন’-এর আদলে। এটি কেবল ভবন নয়, চীনের প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার এক চরম পরাকাষ্ঠা। কাচের দেয়ালে সূর্যের তীর্যক আলোর প্রতিফলন এক অদ্ভুত অপার্থিবতা তৈরি করছিল, মনে হচ্ছিল এটি কোনো এক মহাজাগতিক বাতিঘর যা ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে।
বেলা দশটার দিকে আমাদের বাস যখন সিএনইএসপিএসি-র প্রাঙ্গণে থামল, তখন আমরা এক নতুন জগতের দরজায় দাঁড়িয়ে। এটি কেবল কৃষিকেন্দ্র নয়, বরং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কৃষিজ রূপ। সেখানে পা রাখতেই আমাদের চোখে পড়ল ‘বিদু’ নেভিগেশন স্যাটেলাইট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় ট্রাক্টর, যা কোনো চালক ছাড়াই নিখুঁতভাবে জমি চাষ করতে সক্ষম।
ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে যেভাবে ফসলের রোগ নির্ণয় এবং কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে, তা দেখে আমাদের প্রথাগত কৃষি ব্যবস্থার দৈন্যদশা মনে পড়ে গেল। সেখানকার ইন্টারনেটে অব থিংস ডিভাইসগুলো মাটির প্রতিটি কণার আর্দ্রতা, পিএইচ মান এবং পুষ্টির তথ্য মুহূর্তের মধ্যে কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় গ্রিনহাউজগুলোতে কৃত্রিমভাবে আবহাওয়ার নিয়ন্ত্রণ আর রোবটিক হার্ভেস্টারদের কার্যক্রম দেখে আমি বারবার শিহরিত হচ্ছিলাম।
মনে মনে ভাবছিলাম, বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে যদি এই প্রযুক্তির অন্তত ১০ শতাংশও প্রয়োগ করা যেত, তবে আমাদের কৃষকদের ভাগ্য আমূল বদলে যেত এবং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কোনো চিন্তাই থাকত না। চীনের এই কৃষি বিপ্লব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিজ্ঞান আর শ্রমের সমন্বয় ঘটলে মরুভূমিকেও শস্যশ্যামল করা সম্ভব।
দুপুর দেড়টার দিকে সিএনইএসপিএসি পরিদর্শন শেষ করে আমরা গেলাম বেইজিং শহরের বিখ্যাত ‘লাউলানটিং’ নর্থওয়েস্ট কুইজিন নামক এক সুসজ্জিত হালাল রেস্টুরেন্টে। চীনের জ্যাম ঢাকার মতো প্রাণঘাতী নয়; সেখানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালিং আর রাস্তাগুলোর সুনিপুণ বিন্যাস জ্যামকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না।

রেস্টুরেন্টে আমাদের গাইড চ্যাং হুই-এর সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখটি ছিল আমাদের জন্য এক বিশেষ পাওনা। মধ্যবয়সী এই গাইড নারী সব কথাতেই অকারণে হাসতেন। তার সেই নির্মল হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অমায়িক আতিথেয়তা আর বেইজিংয়ের আভিজাত্য আমাদের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল। লাঞ্চের আইটেমগুলোতে ছিল চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া, হাতে তৈরি লম্বা নুডুলস আর মশলাযুক্ত গরুর মাংসের সিজলিং।
মধ্যাহ্নভোজের রাজকীয় তৃপ্তি নিয়ে আমরা চলে এলাম ‘চায়না অ্যাগ্রিকালচারাল মিউজিয়াম’-এ। এটি চীনের এক অনন্য কৃষি ইতিহাস সংরক্ষণাগার। এই মিউজিয়ামটি কেবল কোনো প্রদর্শনী নয়, চীনের অস্তিত্বের শেকড় খোঁজার এক জার্নি। সেখানে আদিম গুহাবাসী মানুষ কীভাবে আগুনের ব্যবহার শিখল, কীভাবে বুনো পশুদের পোষ মানিয়ে পশুপালন শুরু করল এবং পরবর্তীকালে কীভাবে ধানের চাষ শুরু হলো- সবকিছুই নিপুণভাবে থ্রি-ডি অবয়বে এবং ডায়োরামায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
চীনের জিজিয়াং প্রদেশে প্রায় ১০ হাজার বছর আগের ধানের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা তাদের দীর্ঘ কৃষিজ ঐতিহ্যের প্রমাণ দেয়। সেই প্রাচীন লাঙল থেকে শুরু করে আজকের স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত ড্রোন- সবকিছুই যেন এক সুতোয় গাঁথা। চীন তাদের ইতিহাসকে যেভাবে কাচের আবরণে যত্ন সহকারে রক্ষা করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে, তা সত্যিই বিশ্বের যেকোনো জাতির জন্য এক অনুসরণীয় আদর্শ।
বিকেলে যখন হোটেলে ফিরে এলাম, তখনো আমাদের চোখেমুখে বেইজিংকে দেখার প্রবল তৃষ্ণা। বেইজিংয়ের মতো এই সুবিশাল গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়ার মজাই আলাদা। আমি আর মুকুল স্যার পরিকল্পনা করলাম আমরা কোনো গাইড ছাড়াই মেট্রোতে করে বেইজিংয়ের সিটি সেন্টারের দিকে যাবো। বেইজিং মেট্রো বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম এবং আধুনিক মেট্রো নেটওয়ার্ক।

মেট্রোর ম্যাপ খুঁজতে গিয়ে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে যখন আমরা কিছুটা অসহায় বোধ করছিলাম, ঠিক তখনই আমাদের সামনে ত্রাতা হয়ে এলো লেভেন্ডা। কালো গাউন পরা এই তরুণী ছিল হোটেলের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। চীনে আসার পর থেকে যে ল্যাংগুয়েজ ব্যারিয়ার বা ভাষার দেয়াল আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, লেভেন্ডার স্পষ্ট ইংরেজি শুনে মনে হলো মরুভূমিতে মরূদ্যান খুঁজে পেলাম। লেভেন্ডা কেবল আমাদের ম্যাপ বুঝিয়ে দিল না, বরং তার ডিউটি শেষ হওয়ায় সে নিজেই আমাদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল কাছের মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত।
ফুটপাত ধরে লেভেন্ডার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমরা বেইজিংয়ের দৈনন্দিন জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখছিলাম। রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য ঘুরছে ছোট ছোট স্বয়ংক্রিয় রোবট-ক্লিনার, মোড়ে মোড়ে সাজানো শেয়ার্ড বাইসাইকেল আর মানুষের কর্মব্যস্ততা। লেভেন্ডার কাছ থেকে জানলাম বেইজিং মেট্রোর প্রতিটি স্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কঠোর এবং প্রযুক্তিনির্ভর।
বেইজিংয়ের সেই মায়াবী গোধূলি বেলায় লেভেন্ডার সান্নিধ্যে আমরা যখন অজানা এক গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালাম, তখন বেইজিংকে আর অচিন কোনো শহর মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, এই শহরটি হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের চাদর গায়ে দিয়ে অত্যন্ত আধুনিক এক ডিজিটাল হৃৎপিণ্ড নিয়ে আমাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
নতুন চীনের এই অচিন পথে আমরা যেন প্রতিনিয়ত নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করছিলাম। বেইজিং আমাদের চেতনার মূলে এক অমোঘ সত্য গেঁথে দিচ্ছিল, যে জাতি তার ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে এবং বিজ্ঞানের চোখে ভবিষ্যৎ দেখে, তাদের অগ্রযাত্রা পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারে না। বেইজিংয়ের প্রতিটি আকাশচুম্বী দালান আর প্রতিটি সবুজ বীথিকা যেন সেই অজেয় শক্তিরই এক একটি সগৌরব ঘোষণা।