Published : 07 Aug 2025, 12:43 AM
ইতিহাসের পাতায় ফার্দিনান্দ ম্যাজেলান এক বিতর্কিত নায়ক। তার জীবন ছিল দ্বন্দ্ব, সাহস আর ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। তিনি প্রথম অভিযাত্রী, যিনি নৌপথে বিশ্ব প্রদক্ষিণের এক দুঃসাহসিক অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই যাত্রার শেষটা দেখে যেতে পারেননি। ফিলিপাইনের ম্যাকতান দ্বীপের সৈকতে স্থানীয় যোদ্ধাদের বর্শার আঘাতেই তার ঘটনাবহুল জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
নিজের মিত্র শাসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে, মাত্র ৬০ জন নাবিক নিয়ে তিনি প্রায় ১ হাজার যোদ্ধার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল নিজের শক্তি প্রদর্শন করা, কিন্তু ফলাফল হয়েছিল ঠিক উলটো। এই নাটকীয় মৃত্যুই যেন তার জীবনের সারসংক্ষেপ- যেখানে গর্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর দুর্ভাগ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু কে ছিলেন এই ফার্দিনান্দ ম্যাজেলান? কীভাবে এক পর্তুগিজ অভিযাত্রী তার চিরশত্রু স্পেনের ঝান্ডা নিয়ে পাড়ি দিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ জলযাত্রায়?
এক অভিযাত্রীর জন্ম ও তার যুগ
আনুমানিক ১৪৮০ সালে পর্তুগালের এক অভিজাত পরিবারে ম্যাজেলানের জন্ম। অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারানোর পর তিনি লিসবনে রানির দরবারে একজন কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। সেটাই ছিল তার পৃথিবী চেনার প্রথম পাঠশালা।
তখন ছিল ইউরোপীয় আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। ভাস্কো দা গামা ততদিনে ভারতে পৌঁছানোর নতুন জলপথ আবিষ্কার করে ফেলেছেন, কলম্বাস খুঁজে পেয়েছেন নতুন এক মহাদেশ। বাতাসে তখন বারুদ আর লোভনীয় মসলার গন্ধ। লবঙ্গ, দারুচিনি, আর জয়ফলের মতো মসলার অর্থনৈতিক মূল্য ছিল আকাশছোঁয়া। ইউরোপের অভিজাত মহলে এগুলো ছিল মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক। কোন কোন ইতিহাসবিদ বলেন, ইউরোপীয়রা ‘পচা মাংসের গন্ধ ঢাকতে’ মসলা ব্যবহার করত। আসলে এই ধারণাটি ভুল। বরং টাটকা মাংসের স্বাদ বাড়াতেই তারা মসলার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিল।
এই মসলার উৎস ছিল ইন্দোনেশিয়ার মোলুক্কা দ্বীপপুঞ্জ, যা ‘স্পাইস আইল্যান্ডস’ নামে পরিচিত। এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎকালীন দুই পরাশক্তি স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে চলছিল এক নীরব যুদ্ধ। পোপের মধ্যস্থতায় ১৪৯৪ সালের ‘ট্রিটি অব টোর্দেসিলাস’ চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর সব অনাবিষ্কৃত ভূমিকে দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। পূর্ব দিক পর্তুগালের, আর পশ্চিম দিক স্পেনের। কিন্তু এই চুক্তি বিবাদ না মিটিয়ে বরং নতুন দখলের দৌড়কে আরও উসকে দেয়।
বিশ্বাসঘাতকতা ও নতুন পরিকল্পনা
তরুণ ম্যাজেলান পর্তুগালের হয়ে বহু অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ভারত, আফ্রিকা আর মালয়েশিয়ায় যুদ্ধ করেছেন, এমনকি মালাক্কা জয়েও তার ভূমিকা ছিল। কিন্তু বারবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার পরও পর্তুগালের রাজা প্রথম ম্যানুয়েলের কাছে তিনি ছিলেন উপেক্ষিত। মরক্কোর এক যুদ্ধে আহত হয়ে তার একটি পা স্থায়ীভাবে খোঁড়া হয়ে যায়, কিন্তু রাজদরবার থেকে কোনো সহানুভূতি বা পুরস্কার জোটেনি। হতাশ ও ক্ষুব্ধ ম্যাজেলান এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। ১৫১৭ সালে তিনি পর্তুগাল ত্যাগ করে চলে যান চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের রাজদরবারে।
স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লসের সামনে তিনি এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি জানান, পর্তুগিজদের পূর্বদিকের পথ এড়িয়ে, পশ্চিম দিক দিয়ে অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরেও মসলা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো সম্ভব। তার বিশ্বাস ছিল, এই দ্বীপগুলো আসলে টোর্দেসিলাস চুক্তির স্প্যানিশ অংশেই পড়েছে। স্পেনের রাজা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। ম্যাজেলান স্পেনের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন, যা পর্তুগালের চোখে ছিল সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাসবিদ হেলেন নাদারের মতে, “তিনি পর্তুগালে ফিরলে তার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত ছিল।”
ঝড়, বিদ্রোহ আর হাঙরের মুখোমুখি
১৫১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। পাঁচটি জাহাজ (ত্রিনিদাদ, সান আন্তোনিও, কনসেপসিয়ন, ভিক্টোরিয়া ও সান্তিয়াগো) এবং প্রায় ২৮০ জন নাবিক নিয়ে ম্যাজেলানের নৌবহর যাত্রা শুরু করে। তবে শুরু থেকেই সমস্যা ছিল প্রকট। একজন পর্তুগিজ অধিনায়কের অধীনে কাজ করতে স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন ও নাবিকরা রাজি ছিল না। অভিযানের ইতিহাসলিপিকার আন্তোনিও পিগাফেত্তার ভাষায়, “অন্য জাহাজের ক্যাপ্টেনরা তাকে ভালোবাসত না। কারণ সম্ভবত তিনি ছিলেন পর্তুগিজ, আর তারা স্প্যানিশ।”
সমুদ্রের মাঝেই ম্যাজেলান জানতে পারেন, কয়েকজন স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে মূল ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেপ্তার করেন। কিন্তু বিপদ তাতে কাটেনি। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে শীত কাটাতে গিয়ে রসদ কমিয়ে দিলে নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র হয় এবং ১৫২০ সালের ইস্টারের দিন তিনটি জাহাজের ক্যাপ্টেনরা একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
ম্যাজেলান বুঝতে পারেন, মাত্র দুটি জাহাজ তার অনুগত। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। আলোচনার ছলে ‘ভিক্টোরিয়া’ জাহাজে দূত পাঠিয়ে তিনি বিদ্রোহীদের নেতাকে হত্যা করেন। এই আকস্মিকতায় বাকিরা ভয় পেয়ে আত্মসমর্পণ করে। ম্যাজেলান ৪০ জন বিদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে লোকবলের অভাবে সবাইকে ক্ষমা করে দেন, কেবল মূল হোতাদের জনমানবহীন দ্বীপে ফেলে আসা হয়, যা ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর শামিল।
এক নতুন মহাসাগরের আবিষ্কার
বিদ্রোহ দমন করে ম্যাজেলান এগিয়ে চলেন। ১৫২০ সালের ২১ অক্টোবর। ৩৩ দিন আর ৩৪৪ মাইল দীর্ঘ এক সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক জলপথ পাড়ি দিয়ে তারা অন্য এক মহাসাগরে প্রবেশ করেন। এই জলপথটিই আজ ‘স্ট্রেইট অব ম্যাজেলান’ নামে পরিচিত। এর শান্ত রূপ দেখে ম্যাজেলান এর নাম দেন ‘মারে প্যাসিফিকো’ বা ‘শান্ত সমুদ্র’। তিনি ধারণাও করতে পারেননি, এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম এবং ভয়ঙ্করতম মহাসাগর।
ম্যাজেলান ভেবেছিলেন এশিয়া কাছেই, কিন্তু তার ভাবনা ভুল ছিল। প্রায় তিন মাস ধরে তারা কোনো দ্বীপ বা ভূখণ্ডের দেখা পাননি। খাবার ফুরিয়ে যায়, পানীয় জল দূষিত হয়ে পড়ে।
সেই জাহাজে ছিলেন ইতালীয় নাবিক, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসলিপিকার অ্যন্তোনিও পিগাফেত্তা। তিনি তার জার্নালে লিখেছেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা: “আমরা গুঁড়ো হয়ে যাওয়া পুরনো বিস্কুট খেতাম, যা ইঁদুরে ছেঁচে খেয়ে ফেলেছিল। তাতে প্রস্রাবের গন্ধ, কিলবিল করত পোকায়। পানি ছিল হলুদ আর দূষিত। আমরা শুকনো গরুর চামড়া খেতাম। সাগরে কয়েকদিন ভিজিয়ে, পরে অল্প আগুনে পুড়িয়ে। ইঁদুরের দাম ছিল আধা একু; অনেকে সে দামেও পেত না।” শুধু স্কার্ভিতেই প্রায় ৩০ জন নাবিক মারা যায়। অনাহারে-অর্ধাহারে মৃতপ্রায় অবস্থায় অবশেষে ১৫২১ সালের মার্চে তারা ফিলিপাইনে পৌঁছায়।
শেষ অঙ্ক ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার
ফিলিপাইনে পৌঁছে ম্যাজেলান যেন তার মূল উদ্দেশ্য ভুলে যান। মসলা দ্বীপপুঞ্জের বদলে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেখানকার এক শাসককে ধর্মান্তরিত করে তিনি তার পক্ষ নিয়ে পাশের মাকতান দ্বীপ আক্রমণ করতে যান। তার আত্মবিশ্বাস এতটাই বেশি ছিল যে, তিনি মাত্র ৬০ জন প্রায় অপ্রস্তুত নাবিক নিয়ে হাজারো যোদ্ধার মুখোমুখি হন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। মাকতানের যোদ্ধাদের হাতে বীরের মতো লড়তে গিয়েও তিনি প্রাণ হারান।
ম্যাজেলানের মৃত্যুর পর তার ছিন্নভিন্ন নৌবহরের থাকে মাত্র একটি জাহাজ ‘ভিক্টোরিয়া’। ১৮ জন জীবিত নাবিককে নিয়ে স্পেনে ফিরতে তারা সক্ষম হয়, ১৫২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এইভাবেই শেষ হয় ইতিহাসের প্রথম বিশ্ব প্রদক্ষিণ।
জীবিত স্প্যানিশ নাবিকেরা ম্যাজেলানের কঠোর নেতৃত্বের সমালোচনা করে তার সম্মানহানি করে। যদিও তিনি পূর্ব ও পশ্চিম দুইদিক দিয়েই ভ্রমণ করে একপ্রকার বিশ্ব প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করেন, তবু কোনো পক্ষেরই পূর্ণ মর্যাদা তিনি পাননি। পর্তুগালের কাছে তিনি ছিলেন ‘বিশ্বাসঘাতক’, আর স্পেনের কাছে একজন ‘জেদি ও কর্তৃত্বপরায়ণ বিদেশি’।
তার সুনাম আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করেন ইতিহাসলিপিকার পিগাফেত্তা, যার লেখা ভ্রমণকাহিনি ইউরোপজুড়ে আলোড়ন ফেলে। আজ ফার্দিনান্দ ম্যাজেলানকে বিশ্বের ‘প্রথম পর্যটক’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তার এই অভিযান প্রমাণ করেছিল যে পৃথিবী গোলাকার এবং মহাসাগরগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। তার উত্তরাধিকার পর্তুগাল বা স্পেন কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি সেই প্রজন্মের প্রতীক, যারা অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ডটকম, বিবিসি ও ডেইলি জে-স্টোর ডট ওআরজি