ভ্রমণগদ্য
Published : 05 Apr 2026, 11:52 AM
নতুন বছর, নতুন করে সব শুরু। তবে বছরের শুরুতেই যে বি-শা-ল এক ঈদের ছুটি পাবো, তা কখনোই ভাবিনি। আরো ভাবতে পারিনি যে এবার আমার পা পড়তে চলেছে বাংলাদেশের এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে।
ঢাকা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয় ১৮ মার্চ সকালবেলা। একটি গাড়ি নিয়ে রওনা দিই খুলনার উদ্দেশ্যে। প্রায় ৫ ঘণ্টার যাত্রা শেষে পৌঁছাই খুলনায়।
খুলনা বাংলাদেশের একটি বিভাগীয় শহর। বেশ বড়। চারদিকে প্রশস্ত রাস্তা। রাস্তার আশপাশে বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ, হোটেলের আলোকসজ্জা রাতের আঁধারকে পারলে বিদায় জানিয়ে দেয়। সবকিছু দেখে ঢাকার কথাই মনে হয়।
তবে ঢাকার থেকে পরিচ্ছন্ন এবং কিছুটা হলেও ভিড় কম। খুলনায় গিয়ে যদি নিউমার্কেটের চা না খাওয়া হয়, তবে বড় একটা অভাব থেকে যায়। মাটির কাপে করে গরম মালাই চা। তার উপর একটু পাউডার দুধ, কোকো পাউডারের ছড়াছড়ি। ভেতরে এক টুকরো এলাচ যেন পুরো স্বাদকে অমৃতের মতো করে তোলে।
একরাত খুলনায় কাটিয়ে পরদিন শুরু হয় আমাদের সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। খুলনা শহর থেকে একটি গাড়িতে করে চলতে শুরু করি মোংলা বন্দরের পথে। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টার যাত্রা। তবে চারদিকের গাছপালা যেন সে যাত্রাকে আরো আনন্দময় করে তোলে।
মোংলা বন্দরের কাছাকাছি এসে দূরে চোখে পড়বে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থাপনা। বেশ কিছুদূর সামনে এগোলে সেখানে যাওয়ার রাস্তাও দেখা যাবে। আরো সামনে মোংলা পোর্টের বড় গেট পড়বে। তবে এই দুটি জায়গায় প্রবেশ করতে অনুমতি প্রয়োজন। যেহেতু আমাদের সেই সুযোগ ছিল না, তাই সামনে থেকে দেখে মনের মধ্যে কিছুটা আফসোস নিয়েই চলে যেতে হয়।
তবে একবার সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে নদীপথে যাত্রা শুরু করলেই সেই আফসোস কেটে যায়। পশুর নদীতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ইরাবতী রিসোর্ট অর্থাৎ আমরা যেখানে থাকবো তার ট্রলার। পশুর নদী বেয়ে চলতে চলতে চারদিকের সব বড় বড় জাহাজ অবাক দৃষ্টিতে দেখছিলাম। ঠান্ডা বাতাস এসে মাঝেমাঝে চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিলো।
আকাশে রোদ মোটামুটি ছিল। যত বন্দর থেকে দূরে যেতে লাগলাম, ততই বাড়তে থাকলো গাছ-পালার সমাহার। এক সময় ট্রলার ডানে বাঁক নিয়ে ঢুকলো ঢ্যাংমারি নদীতে। আস্তে আস্ত সুন্দরবনের আসল রূপ ফুটে উঠতে থাকলো। বামপাশে গভীর বন এবং ডানপাশে লোকালয়। সঙ্গে গোলপাতার সমাহার। তবে সুন্দরী গাছ খুব একটা চোখে পড়েনি।

নদীপথেও আমাদের সময় লেগেছে ঠিক পৌনে দুই ঘণ্টা। রিসোর্টটি বেশ সুন্দর। গোলপাতার ঘন বনের মাঝে পুরোটাই কাঠের তৈরি। আলাদা আলাদা রুম রয়েছে। অনেকটা কটেজের মতো। আমাদের রুমের সামনে বড় একটি বারান্দা ছিল। সেখানে ছিল দুটি দোলনা। বারান্দায় বসলেই সামনে দেখা যায় সামনে বয়ে চলা ঢ্যাংমারি নদী। নদীর ওপাড়ের গভীর যে বন দেখা যায়, সেটিই সুন্দরবন। সেই বারান্দা থেকে নদীর জোয়ার-ভাটাও পর্যবেক্ষণ করা যায়।
জোয়ার-ভাটা যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়। কিছুক্ষণ আগে পানি ছিল কত নিচে আর এখন কত উপরে তা দেখলেই অবাক লাগে। জোয়ারের সময় নদীর স্রোত যায় একদিকে। ভাটার সময় তা আবার বিপরীতমুখী হয়। প্রায় ৬ ঘণ্টা পরপর জোয়ার-ভাটা হয়ে থাকে। জোয়ারের সময় নদীর জল আমাদের বারান্দার নিচ পর্যন্ত চলে এসেছিল।
ভাটার সময় জল নিচে নেমে গেলে আস্তে আস্তে জেগে ওঠে বালুময় ভূমি। সেখানে তখন বের হয় অজস্র ছোট ছোট লাল কাঁকড়া। সুন্দরবনের রাত ছিল অন্যরকম। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারদিকে। মাঝেমাঝে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে নিশাচর পাখির ডাক, নাম না-জানা কত প্রাণী ও বিচিত্র পোকামাকড়ের আওয়াজ ভেসে আসে! সঙ্গে চলে নিরন্তর ঝিঁঝিঁর ডাক।
পরদিন শুরু হয় নতুন করে সুন্দরবনকে জানা। সকালের নাস্তা শেষে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল একটু নৌকাভ্রমণের। তবে তা কিছুটা বিলম্বিত হয়ে দুপুরে চলে যায়। যদিও রোদ ছিল বেশ, তবুও চারদিকের গাছপালা পরিবেশটা যেন শীতল করে রাখে।
এই ভ্রমণে বেরিয়েই বুঝতে পারি সুন্দরবনের আসল রূপ। শুধু গাছ আর গাছ। কেওড়া, পশুর, সুন্দরী, আরো কত কী! কিছু গাছে ধরে আছে নানারকম ফুল-ফল। সাদা সাদা বড় কিছু ফুলগুলোকে বলে ‘বলার ফুল’। পাখিদের কলরব আর বৈঠা বাওয়ার শব্দ যেন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক সুরেলা মিষ্টি আওয়াজ। বনভূমি অনেক দূর পর্যন্ত জোয়ারের জলে ঢেকে গেছে। পথিমধ্যে কিছু গাছ চোখে পড়ল অনেক লম্বা নিচু ডাল। নৌকা তার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময়ে মাথা নিচু করতে হয়। প্রায় ১ ঘণ্টার এই নৌকাভ্রমণটি আমাকে দেখিয়েছে প্রকৃতি কত বিচিত্র হতে পারে।
দুপুরের খাওয়া শেষে আমরা পাশের গ্রাম ঘোরার জন্য যেই কিছুদূর এগিয়েছি, তখনই আকাশ মেঘলা হয়ে শুরু হল ঝোড়ো বাতাস। বুঝলাম বৃষ্টি হবে। তাই দ্রুত একটা ছোট কালীমন্দির দেখে, দৌড়ে ফিরে এসে বাকি সময়টা রুমে বসে, কখনো বারান্দার ধারে, কখনো বিছানার আশেপাশে কাটিয়েছি। সুন্দরবনে বৃষ্টি কেমন হয় তা দেখার ইচ্ছা ছিল আমাদের সবার। বৃষ্টি হলে গাছপালা, নদী সবকিছু কীভাবে বদলায়, তা ইচ্ছা ছিল দেখার। তবে বৃষ্টি যা হলো তা নিতান্তই সামান্য একপশলা। তা দেখে কোন মজা নেই।
বৃষ্টি থামলে বিকেলে একটু বের হলাম চা খেতে। তারপর পাশের আরেকটি রিসোর্টও ঘুরলাম। প্রায় আমাদের রিসোর্টের মতোই। শুধু সেটি ছিল কিছুটা নতুন। পরিদর্শন শেষে কিছু সময় কাটলো রাস্তায় আনমনে ঘোরাঘুরি করে। দেখা পেলাম একটি জোনাকির। জোনাকি দূর থেকে দেখলেও এবার অনেক কাছ থেকে দেখেছি। অন্ধকারে জোনাকি দেখলেই মনে হয় কেউ যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আঁধারের মাঝে নানা রঙের আলোর খেলা দেখাচ্ছে।

পরদিন ছিল আমাদের সুন্দরবন থেকে ফিরে যাওয়ার দিন। তবে ফেরার আগে একবার করমজল ঘুরে তারপর যাওয়া। করমজল বাংলাদেশের একটি বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। মূলত এটি কুমির প্রজনন কেন্দ্র। তবে এখানে রয়েছে অনেক হরিণ ও অসংখ্য বানর। চারদিকে গাছপালা। তার মাঝে ব্রিজের মতো করে হাঁটার জায়গা। ব্রিজের মতো করে উঁচু করে দেওয়া হয়েছে যেন জোয়ারের জল ভেতরে চলে আসলে হাঁটতে অসুবিধা না হয়।
তবে বনের নির্জনতাকে সেভাবে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষজন তারস্বরে চেঁচামেচি থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত করা, ঢিল ছোড়া, ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। মনে রাখতে হবে বনটা আমাদের দেশেরই সম্পদ। প্রাণীগুলোও আমাদের সম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এগুলো সহায়ক। তাই এগুলো রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। সবার সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারবে এসব বনজ সম্পদ রক্ষা করতে।
এবারের সুন্দরবন ভ্রমণ আমাকে দেখিয়েছে প্রকৃতি কত রূপ ধারণ করতে পারে। প্রকৃতি তার জোয়ার-ভাটার মধ্য দিয়ে আমাকে শিখিয়েছে সব কাজের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম, নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি আমাকে শিখিয়েছে জীবনে চলার পথে সবসময় সব কাজ আমার মন মতো হবে না।
ভ্রমণটি যেমন ছিল শিক্ষণীয় তেমনই মজার। বাংলাদেশের আসল রূপ আমি কিছুটা অনুধাবন করতে পেরেছি ভ্রমণটি করে।