১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আলবেয়ার কাম্যু: রোদে পোড়া এক দার্শনিকের জীবনগাথা

বিশ্বসাহিত্যে আলবেয়ার কাম্যু এখনো প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে।

আলবেয়ার কাম্যু: রোদে পোড়া এক দার্শনিকের জীবনগাথা
ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কাম্যু (১৯১৩ – ১৯৬০)

বিডিনিউজ২৪

অনার্দ্র শাহীনূর

Published : 31 Dec 2025, 12:10 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:27 PM

লেখাটি লিখেছেন ইংরেজ প্রবন্ধকার উইলিয়াম ফিয়ার, প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাস ও চিন্তাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘এঙ্গেলসবার্গ আইডিয়াস’-এ। এখানে ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কাম্যুর (১৯১৩ ১৯৬০) নোটবুককে অবলম্বন করে তার জীবনদর্শন ও মানসিক গঠনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ পাঠ হাজির করা হয়েছে। আলবেয়ার কাম্যুর নোটবুকগুলো এমন এক মনের পরিচয় দেয়, যেখানে মন কোনো ভ্রম বা আশ্রয়হীন সান্ত্বনা ছাড়াই পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াতে জানে, এবং কোনো সর্বগ্রাসী উদ্দেশ্য বা মতাদর্শের অনুপস্থিতিতেও পৃথিবীর অদ্ভুত রূপ ও সৌন্দর্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। আলোচিত বইটি হলো ‘দ্য কমপ্লিট নোটবুকস অব আলবেয়ার কাম্যু’, অনুবাদ করেছেন রায়ান ব্লুম, প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস।

মার্সেই থেকে গ্রামটি প্রায় এক ঘণ্টার পথ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার জন্য আছে কেবল একটি বাস ছিল, গন্তব্যস্থল থেকে বেশ দেরিতে ছাড়ে। ভোরবেলা আমি সেই বাসে উঠলাম।

পথে কিছুটা সময় ঘুমিয়ে নিলাম। এক্স-অঁ-প্রোভঁসে এসে বাস বদলাতে হলো। বাসটি যখন আমাকে লুরমারাঁর প্রান্তে নামিয়ে দিল, আমি তাকিয়ে রইলাম যতক্ষণ না ধুলো উড়িয়ে সেটি রাস্তা ধরে দূরে মিলিয়ে যায়। তারপর চারদিকে শুধু শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর প্রখর গরমে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে আসা টিকটিক শব্দ।

যেখানে আলবেয়ার কাম্যু শায়িত আছেন, সেই জায়গাটা দেখতে অনেকটা প্রাচীন কোনো ধ্বংসাবশেষের মতো। কবরস্থানটিকে ঘিরে রেখেছে পুরনো পাথর আর সারি সারি সাইপ্রেস গাছ। তার চারপাশে প্রোভঁসের সবুজ পাহাড়ি ঢাল। জায়গাটা খুঁজে পেতে আমার খুব একটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।

কবরটি তেমন জাঁকজমকপূর্ণ নয়; বরং অন্যান্য কবরের মতোই সাদামাটা। এর ওপরে ফুটে আছে গোলাপি ও সবুজ রঙের ওলিয়ান্ডার গাছ। তার পাশেই শুয়ে আছেন স্ত্রী ফ্রঁসিন।

যেকোনো কবর পরিদর্শন করা বোধহয় অনর্থক কাজ। মানুষ ভাবে, এ বুঝি বিশেষ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হবে কিংবা এমন কিছু সত্য দেখতে পাবে যা যুগ যুগ ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। আদতে সেখানে একটি সমাধি ছাড়া কিছুই থাকে না। কাম্যুর কবরও সেরকমই একটি, ভিন্ন কিছু নয়।

তবুও চতুর্দিকের প্রাচীন সৌন্দর্য আর রোদের উষ্ণতা আমাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিলো, এমনটা সচরাচর ব্যালকনি থেকে সমুদ্রের দিকে কিংবা বিমানের জানালা থেকে মেঘের পানে তাকালে অনুভূত হয়।

অনেক পাঠকের মতো আমিও তরুণ বয়সে কাম্যুর লেখার সঙ্গে পরিচিত হই, যখন উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন যাচ্ছিল। আমার বিশ্বাস, কাম্যুর রচনাগুলো তরুণদের সহজে বশ করতে পারার অন্যতম কারণ হলো তার লেখা জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে হাল ছাড়ার পথ না দেখিয়ে বরং এক প্রকার স্বস্তি দেয়।

কাম্যু নিজেই বিশ্বাস করতেন যে, অস্তিত্বের মৌলিক উদ্দেশ্যহীনতার অর্থ ‘নিহিলিজম’ বা শূন্যবাদকে গ্রহণ করা নয়; বরং এটিই সত্যিকারের সুন্দর ও সুচারুভাবে জীবন পরিচালনার মাধ্যমে অবাস্তবতা বা অর্থহীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সুযোগ। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন, যেকোনো উদ্দেশ্যই মহৎ- কোনো আদর্শ, ঈশ্বর কিংবা দেবতার অনুপস্থিতিতেও, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য ও রহস্যকে গ্রহণ করা হয়।

রায়ান ব্লুম অনূদিত ‘দ্য কমপ্লিট নোটবুকস অফ আলবেয়ার কাম্যু’ বইয়ে আমরা যা দেখতে পাই, সেটাকে দার্শনিক জোনাথন রি ‘রোদ্দুরের দর্শন’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কাম্যুর নোটবইগুলোতে সূর্যের উপস্থিতি বারবার দেখা যায়। অনেক নোট শুরুই হয়েছে সূর্য, আলো-ছায়া আর প্রকৃতির জগৎ নিয়ে উচ্ছ্বসিত বর্ণনা দিয়ে।

কাম্যুর কাছে সূর্য একটি প্রতীকী ধ্রুবক। এটি একদিকে মানব অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বের উদাসীনতাকে প্রকাশ করে, আবার একই সঙ্গে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য, আনন্দ ও অভিজ্ঞতা দেওয়ার সক্ষমতাকেও তুলে ধরে। এই প্যারাডক্স বা আপাতবিরোধের ভেতরে যে বৈপরীত্য আছে তা ইচ্ছাকৃত। কাম্যু অস্তিত্বের অবাস্তবতাকে হতাশার উৎস হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি একে জীবনের বাস্তব সত্য বলে মনে করতেন, যা একবার মেনে নেওয়া গেলে জীবনের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে আরও তীব্র করে তোলে।

শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও কাম্যু আমাদের কোনো বিস্তৃত দর্শনের কথা বলে যাননি। এটাই কাম্যুর জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় দিক। তিনি সম্ভবত বুঝেছিলেন, মানুষ স্বভাবতই জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ায়। অনেক সময় সেই উদ্দেশ্য হাতড়ে বেড়ানো আসলে সময়ের অপচয় কিংবা নিজের কাছে মিথ্যে বলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

যতই সদিচ্ছা থাকুক না কেন, এভাবে নিজেকে ধোঁকা দেওয়া একসময় রাজনৈতিকভাবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ১৯৪৫ সালে তিনি লিখেছিলেন, “সমস্ত ধর্মান্ধতার মূলে রয়েছে মেসিয়ানিজমের ধারণা। মানুষের বিনিময়ে মেসিয়ানিজম। গ্রিক চিন্তাভাবনা ঐতিহাসিক নয়। মূল্যবোধগুলো পূর্ব থেকেই বিদ্যমান, যা আধুনিক অস্তিত্ববাদের বিরুদ্ধে।”

কাম্যুর ইউটোপিয়ানিজম ধারণার প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল, যার ফলে দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের ফাটল ধরে। প্রথমে সবাই মনে করেছিল এটি স্টালিনের অন্যায় নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ; কিন্তু আদতে তা ছিল মূলত দর্শন চিন্তার ফারাক। সার্ত্রে মনে করতেন, মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের পরিচয় নিজেই ঠিক করে নেয়- অর্থাৎ আগে অস্তিত্ব, তারপর তার সারমর্ম আসে।

কিন্তু কাম্যু একে সমর্থন করতেন না। তার মতে, মানুষ জন্ম থেকেই ন্যায়, ভালোবাসা, স্বাধীনতা ও সৌন্দর্যের মতো কিছু চিরন্তন মূল্যবোধ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। তাই যখন কেউ রাজনৈতিক কারণে সহিংসতা করে, তা সরাসরি মানুষের মর্যাদার বিরুদ্ধে আঘাত বলে তিনি মনে করতেন।

রায়ান ব্লুম কাম্যু ও সার্ত্রের সম্পর্কের অবনতির একটি ইঙ্গিত দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৫১ সালে ‘দ্য রেবেল’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর কাম্যু বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তার সঙ্গে সার্ত্রে এবং সিমোন দ্য বোভোয়ারের জন্য একটি করে কপি পাঠান। কিন্তু সার্ত্রের ম্যাগাজিন ‘দ্য রেবেল’-এর কোনো রিভিউ প্রকাশ করেনি, এমনকি তিনি কপিটি অন্য কাউকে দিয়ে দেন।

ফরাসি দর্শনে আলবেয়ার কাম্যু সুপরিচিত মুখ ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি সর্বদা সংশয় আর উদ্বেগের মধ্যে থাকতেন। ১৯৪৬ সালে আমেরিকা যাওয়ার সময় তিনি নোটবুকে লিখেছিলেন যে, ভ্রমণের সময় যে ভয় ও এনজাইটি তাকে আঁকড়ে ধরত, তা এবার কেটে গেছে। ১৯৫৭ সালে কাম্যু তার প্যানিক অ্যাটাকের কথাও উল্লেখ করেন।

পরের বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চের প্রথম অবধি কয়েক মাস তিনি নোটবুকে এক লাইনের বেশি কিছু লেখেননি। লেখক হিসেবেও তিনি নিজেকে খুব একটা আত্মবিশ্বাসী মনে করতেন না। তার উপন্যাস ‘অ্যা হ্যাপি ডেথ’ প্রকাশিত হওয়ার পর লেখক ও দার্শনিক জ্যঁ গ্রেনিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। কাম্যু তাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনার কি সত্যিই মনে হয় আমার লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্নটাই আমাকে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।”

বিখ্যাত লেখকরাও যে নিজের লেখার ক্ষমতা নিয়ে এমন সন্দেহে ভুগতেন, এই চিঠি পড়লে তা টের পাওয়া যায়, যা নতুন লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক হতে পারে। রায়ান ব্লুম কাম্যু সম্পর্কে সবচেয়ে যে চমকপ্রদ বিষয়টি আবিষ্কার করেন তা হলো, কাম্যু সম্ভবত নিজের নোটবইগুলো স্বেচ্ছায় কিছুটা পরিবর্তন করতেন। তিনি হয়তো জানতেন, একদিন এগুলো গবেষক ও সমালোচকেরা গুরুত্ব সহকারে পড়বেন।

ব্লুম জানান, কাম্যু প্রথমে নোটগুলো হাতে লিখতেন, পরে সেগুলো টাইপ করাতেন। এক জায়গায় হাতে লেখা ছিল, “আমি কমিউনিজমের দিকে আসছি।” কিন্তু টাইপ করা সংস্করণে সেটার পরিবর্তে লেখা হয়, “আমি কমিউনিজম প্রত্যাখ্যান করি।” রায়ান ব্লুমের ‘দ্য কমপ্লিট নোটবুকস’ শুধু কাম্যুর ব্যক্তিগত নোটের তালিকা নয়, বরং এটি কাম্যুর জীবন, কর্ম ও দর্শনের সামগ্রিক রূপ।

বিশ্বসাহিত্যে আলবেয়ার কাম্যু এখনো প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। তার বিখ্যাত বই ‘দ্য প্লেগ’, ‘দ্য আউটসাইডার’, ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’ আজও পাঠক সমাজে সমাদৃত।