ভ্রমণগদ্য
Published : 05 Feb 2026, 01:19 AM
ল্যাভেন্ডার সঙ্গে যখন রাতের বেইজিংয়ের মায়াবী রাজপথে হাঁটছি, তখন বুকের গহিনে বারবার হানা দিচ্ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী সৃষ্টি ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটির স্মৃতি। বিখ্যাত সেই আখ্যানে ফরাসি এক তরুণীর কথা আছে, নাম ছিল তার মার্গারিট। সাতাশ বছর বয়সি সেই মোহিনী তরুণীর সঙ্গে কবির প্রথম দেখা হয়েছিল আমেরিকায়, কিন্তু সম্পর্কের রসায়ন পূর্ণতা পেয়েছিল প্যারিসের অলিগলিতে।
মার্গারিট সুনীলকে নয়নাভিরাম প্যারিস ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল দিনের পর দিন, পথ চিনে নিয়ে গিয়েছিল লুভর মিউজিয়ামের রহস্যময়তায়। কৈশোরে পড়া সেই রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনির কাল্পনিক মার্গারিট কি এত বছর পর ল্যাভেন্ডা হয়ে ফিরে এলো মহাপ্রাচীরের এই দেশে? নাকি মানুষ শুধু শুধু কল্পনা করে? অনর্থক বিভ্রম তৈরি করে মনের গহিনে এক অলীক সুখের মরীচিকা বোনে? হবে হয়তো।
ল্যাভেন্ডার হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার চপলতা আর চীনা সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা আমাকে সেই প্যারিসের মার্গারিটের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার। বেইজিংয়ের রাতের আকাশ তখন এক অদ্ভুত নীল আভা ছড়িয়ে আছে, যা কোনো শিল্পীর ক্যানভাসকেও হার মানায়।
লাইব্রেরির বিশাল স্থাপত্য থেকে বের হয়ে ল্যাভেন্ডা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো, “তোমরা বই পড়তে ভালোবাসো?" আমি ওর অকস্মাৎ প্রশ্নে খানিকটা থমকে গেলাম। বেইজিংয়ের এই আধুনিক যান্ত্রিকতায় দাঁড়িয়ে এমন এক গভীর রুচিশীল প্রশ্ন আশা করিনি। বললাম, “হ্যাঁ, খুব বাসি। আমাদের দেশে বই পড়াটা জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
ল্যাভেন্ডা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, “আমিও খুব ভালোবাসি। তাই তো আমার ইচ্ছে একদিন লাতিন আমেরিকায় ভ্রমণে যাব। শুনেছি, ওখানকার মানুষ নাকি অসম্ভব বই পড়ে। বই, ফুটবল আর প্রাণখোলা আড্ডা নিয়ে মজে থাকে। জাদুকরী বাস্তবতার দেশগুলোর মানুষ বোধহয় এমন হয়। দারুণ না?”

আমি ল্যাভেন্ডার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ওর চোখের মণিতে ঝিলিক দিচ্ছিল আধুনিক চীনা প্রজন্মের বিশ্বকেন্দ্রিক স্বপ্ন। আজকের চীন আর সেই প্রাচীরঘেরা বদ্ধ দেশ নয়; এরা এখন স্বপ্ন দেখে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মাকোন্দোর, এরা স্বপ্ন দেখে বিশ্বের প্রতিটি কোণকে আপন করে নেওয়ার। অনুধাবন করলাম, আধুনিক চীনা প্রজন্ম কতটা সচেতন আর জ্ঞানপিপাসু।
ঘড়ির কাঁটা তখন বেইজিংয়ের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে। রাত গভীর হচ্ছে, কিন্তু বেইজিং যেন সবে জেগে উঠছে এক ভিন্ন রূপে। কিউনমেন স্ট্রিটের সেই আদিম পাথুরে রাস্তাগুলো থিতিয়ে এসেছে। আমরা হাঁটছিলাম কিউনমেনের প্রাচীন ট্রাম লাইন ধরে। এই রাস্তাটির ইতিহাস প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো, যা মিং রাজবংশের আমল থেকে বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক হৃৎস্পন্দন বহন করে চলেছে।
হঠাৎ ল্যাভেন্ডা তার মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে বলে উঠল, “হেই! চলো তোমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাই, যা সচরাচর পর্যটকদের নজরে আসে না।” ল্যাভেন্ডার প্রস্তাবে আমি খানিকটা দ্বিধায় পড়লাম। প্রশ্ন করলাম, “কোথায় যাবে এই মধ্যরাতে?” ও শুধু রহস্যময় হাসল। বলল, “চলোই না। গেলেই বুঝতে পারবে কেন বেইজিংকে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় শহর বলা হয়।” কীভাবে যাব? উত্তরে ও একটু চিন্তা করে বলল, “এখন রাত এগারোটা বাজে। এখনো বেইজিং মেট্রো চালু আছে। চলো, পাতাল রেলের সেই বিশাল জালের ভেতর দিয়ে এক অন্য বেইজিংকে খুঁজি।”
বেইজিংয়ে আজ আমার ও আমার দলের সবার শেষ রাত। কাল সকালেই ডানা মেলে উড়াল দিতে হবে আকাশে, ফিরে যেতে হবে সুদূর উরুমচিতে। কিন্তু ল্যাভেন্ডার সঙ্গে পরিচয়ের পর যেন সবকিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। দমকা বাতাসে উড়ে গেছে বেইজিংয়ের অপরিচিতের সেই যবনিকা। অচিন বেইজিং হয়ে উঠেছে বড্ড চেনা, বড্ড আপন। অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছি শহরটার সঙ্গে। তাই ল্যাভেন্ডার প্রস্তাবে দ্বিতীয়বার না করার জো ছিল না। পা বাড়ালাম মেট্রোর দিকে।

ল্যাভেন্ডা মেট্রোয় চড়িয়ে আমাকে যেখানে নিয়ে এলো, সেটি এক বিশাল অ্যাভিনিউ সড়ক। রাতের নিস্তব্ধতায় শহরটা যেন ধ্যানমগ্ন ঋষি। মানুষজন প্রায় নেই বললেই চলে। রাজকীয় প্রশস্ত রাস্তাগুলো এখন ট্রাফিকমুক্ত। দু-একটা গাড়ি মাঝেমধ্যে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে। হাঁটছি নিসঙ্কোচে। ভরসা কেবল সেই অচেনা দেশের এক তরুণী। নিজের কাছেই এক অলীক বিভ্রম লাগছিল। আমি কি সত্যি বেইজিংয়ে? সেই বিখ্যাত বেইজিং, যা ১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর তিয়েনআনমেন স্কয়ারে মাও সে তুং-এর হাত ধরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক নতুন সূর্যোদয় দেখেছিল। যে বেইজিং আজ বিশ্বের ভবিষ্যৎ সুপার পাওয়ারের সূতিকাগার! এটা কি বাস্তব নাকি স্বপ্নের কোনো দৃশ্যপট? বেইজিংয়ের ইতিহাস আর আধুনিকতা এখানে মিলেমিশে একাকার।
পরপর দুটি মোড় পেরিয়ে সোজা রাস্তায় খানিকটা এগোতেই হঠাৎ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অপার্থিব দৃশ্য। একটি চার্চ। রাতের অন্ধকার চিরে আকাশমুখী দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বিশাল খোলা চত্বর। পেছনে ধূসর ইটের প্রাচীন দেয়াল। পাশাপাশি তিনটি সুউচ্চ ঘণ্টা টাওয়ার। ১৮টি বিশাল বিশাল বৃত্তাকার স্তম্ভ। রোমানেস্ক পাথুরে স্থাপত্যের সঙ্গে চীনা ঐতিহ্যবাহী কারুকার্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এটি হলো সেন্ট জোসেফ চার্চ, যাকে স্থানীয়রা দংতাং বা পূর্ব চার্চ নামে চেনে।
১৬৫৫ সালে জেসুইট মিশনারিদের হাত ধরে এই চার্চের গোড়াপত্তন হলেও বক্সার বিদ্রোহের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে বর্তমান রূপে সংস্কার করা হয়। ঝলমলে আলোকসজ্জায় চার্চটি যেন এক রাজকীয় রূপ ধারণ করেছে। আমার দৃষ্টি সেখানে স্থির হয়ে গেলে ল্যাভেন্ডা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলো। ওর চোখে গর্বের আভা। ও বলল, “দারুণ না? এটি বেইজিংয়ের অন্যতম প্রাচীন সাক্ষী। চলো, এই চত্বরের শান্তিতে কিছুক্ষণ বসি।”
দংতাং চার্চের সামনে বসে ভাবলাম, বেইজিংয়ে সবাই সম্পূর্ণ নির্ভয়। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে পুলিশের সাইরেন নেই, তবুও এক অদৃশ্য নিরাপত্তার চাদর আমাদের আগলে রাখছে। ল্যাভেন্ডাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতেই ও মুচকি হেসে আধুনিক চীনের মূল রহস্যটা ফাঁস করল। বলল, “বেইজিং শহরের প্রতিটি ইঞ্চি ইন্টেলিজেন্ট এআই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। হাজার হাজার হাই-ডেফিনিশন সার্ভিল্যান্স ক্যামেরা আর ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম এখানে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালায়। এখানে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না, নিমেষের মধ্যে অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।” আহ! মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমাদের ঢাকা শহরটা যদি এমন হতো- নিরাপদ, নিসঙ্কোচ আর নির্ভার। যেখানে রাত দুটোয় কোনো তরুণী নির্ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে।

মহাকাব্যিক সেই রাত শেষ হতে না হতেই পরের দিন আমরা উরুমচিতে ফিরে আসি। সেই চিরচেনা ন্যাশনাল কাস্টম অ্যাকাডেমির হোটেলে। আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে গিয়েছিল। বেইজিং থেকে উরুমচি পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘণ্টার এক দীর্ঘ বিমানযাত্রা। চীনের বিশালত্বের এক অদ্ভুত প্রমাণ পেলাম এই যাত্রায়। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি, তুষারশুভ্র তিয়ানশান পর্বতমালা। নিচে বিস্তীর্ণ মরুভূমির বুক চিরে শত শত উইন্ডমিল বাতাসের শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছে, সবুজ শক্তির এক বিপ্লব দেখছে চীন।
আকাশে মেঘের সঙ্গে বিমানের মিতালি আর পুতুলের মতো সুন্দরী বিমানবালাদের উষ্ণ আপ্যায়ন আমাদের ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল। চীন ভ্রমণে এটি ছিল আমাদের চতুর্থ বিমানযাত্রা। আকাশে ওড়ার এক অদ্ভুত নেশা এই ক’দিনে আমাদের রক্তে মিশে গিয়েছিল।
হোটেলের রুমটা এবার বদলে গেছে। আগে ছিলাম ১১ তলায়, এবার পেলাম ৪ তলায়। আগের রুমের জানালার পর্দা টানতেই নয়নাভিরাম উরুমচি শহরটা তার পুরো রূপ নিয়ে ধরা দিত। দূর আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়ানশান পর্বত মুচকি হাসত। এবার জানালার নিচে অ্যাভিনিউ সড়কের ব্যস্ততা, গাড়ির চাকার ঘর্ষণ। মন্দ না, দুটো অভিজ্ঞতাই হলো। আর তো মাত্র দুটো দিন! এরপরই তো বাংলাদেশের পথে উড়ান দিতে হবে।
রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিচের ডাইনিংয়ে রাতের খাবার সেরে বের হতেই কানে এলো পরিচিত এক সুর। সেই চেনা বাজনা! স্যাটেলাইট স্কয়ারে সন্ধ্যার নাচ শুরু হয়েছে। নিজ মনেই হেসে দিলাম। উরুমচি শহরটা গত কয়েক দিনে বড্ড চেনা হয়ে গেছে। পা চালিয়ে স্কয়ারে পৌঁছাতেই দেখি সালামও আছে আজকের নাচের দলে। সালাম এক অদ্ভুত বন্ধুবৎসল ছেলে। আমাকে দেখেই ও নাচের দল থেকে বেরিয়ে এলো। হাসিমুখে জড়িয়ে ধরে বলল, “বেইজিং কেমন কাটল বন্ধু? কোনো বিশেষ মানুষের দেখা পেলে নাকি?”
ল্যাভেন্ডার নামটা ঠোঁটের আগায় চলেও এলো, কিন্তু পরক্ষণেই গোপন করে ফেললাম। মুচকি হেসে বললাম, “সিক্রেট!” সালাম হা হা করে হাসল। উরুমচির এই খোলা আকাশের নিচে আমাদের বন্ধুত্ব যেন আরও গাঢ় হচ্ছিল।

পরদিন সকালে উরুমচি সিটিতে এক বিশেষ ঘোষণা এলো। পুরো শহরে পেস্টিসাইড স্প্রে করা হবে বলে আমাদের হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করা হলো। বিকেলে শুরু হলো পরের দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত মহড়া। চীনারা যে কতটা নিয়মানুবর্তী আর নিখুঁত জাতি, তা তাদের মহড়া না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি শব্দ যেন মেপে মেপে বসানো। আমার মনে হচ্ছিল যেন চীনের কোনো মহাগুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক আসছেন আমাদের সনদ তুলে দিতে। ওদের এই একাগ্রতাই বোধহয় দেশটাকে আজ পৃথিবীর শীর্ষে নিয়ে গেছে।
পরদিন সমাপনী অনুষ্ঠানের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হলেন জু কাই, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যাবসা অ্যাকাডেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঝাং ইউজং, জিনজিয়াং বাণিজ্য বিভাগের উপ-প্রধান। তারা বন্ধুত্বের নতুন বারতা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিলেন। আমাদের হাতে তুলে দিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত লাল সার্টিফিকেট।
তবে জু কাইয়ের বক্তব্য আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। আত্মবিশ্বাসে দীপ্ত চোখে তিনি বললেন, “আমরা একটি সমৃদ্ধ শেয়ার্ড ফিউচার বা অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়তে চাই।” বক্তৃতায় তিনি আমাদের বারবার ‘ফ্রেন্ড’ বলে সম্বোধন করলেন। তার স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণ আর আন্তরিকতা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। মনে হলো, এই স্বপ্নাতুর আহ্বানই চীনকে ভবিষ্যতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুপার পাওয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে। চীনের দর্শন এখন আর শুধু নিজের উন্নয়ন নয়, বরং পুরো বিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে চলার।
সেমিনার শেষে রাজকীয় লাঞ্চের আয়োজন। ঘটনাক্রমে এমি আমার টেবিলসঙ্গী হলো। বিশেষ বিশেষ চীনা খাবারের পসরা সাজানো, আর তার সঙ্গে এমির সেই নিষ্পাপ হাসির আভা। আমি ওকে বাংলাদেশ ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালাম। ও বলল, “অবশ্যই আসব। সুন্দরবন আর কক্সবাজারের গল্প আমি অনেকের কাছে শুনেছি।”
বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেল। এবার লাগেজ গুছানোর পালা। কাল সকালেই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। তার আগে আর একবার মোহিনী উরুমচিকে দুচোখ ভরে দেখার জন্য বিকেলে বের হলাম। সঙ্গে কাদেয়া নয়ারদ্রোন আর নাদিরা আবদুকেরেম। বাইরে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, বিদায় বেলায় যেন আকাশের চোখও ছলছল করছে। শীতের আমেজটা একটু জাঁকিয়ে বসছে। ট্যাক্সি করে ওরা আমাদের নিয়ে গেল উরুমচির সবচেয়ে অভিজাত শপিং মল ‘সিসি শিপিং মলে’।

জৌলুস আর আভিজাত্যে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কাদেয়া আমাদের বাদাম আর কেকের দারুণ এক আইটেম খাওয়াল। চীনা খাবারের সেই স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। সিসি মল থেকে বের হয়ে পাতাল পথে রাস্তা ক্রস করতেই চোখে পড়ল এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। সারি সারি আকাশচুম্বী ভবনের কাচের দেয়ালে জিনজিয়াং অটোনোমাস রিজিয়নের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চোখ ধাঁধানো লাইট ডিসপ্লে। লাল, সবুজ ও নীল আলোর খেলা আর সঙ্গে মায়াবী মিউজিক। মনে হলো যেন পুরো উরুমচি শহরটা সেজেছে আমাদের বিদায় জানাতে।
ট্যাক্সিতে করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে মনে একগুচ্ছ প্রশ্ন জাগছিল। ‘দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (ইআইইউ) প্রতিবছর বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকা করে। সেই তালিকায় ভিয়েনা বা কোপেনহেগেন থাকে, কিন্তু বেইজিং বা উরুমচি থাকে না কেন? অথচ এই শহরগুলোর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সামাজিক সাম্য আর নিরাপত্তার মানদণ্ড আমাদের বিস্মিত করেছে। যেখানে গভীর রাতেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ নিরাপদ। নাকি এই তালিকা তৈরির পেছনেও বিশ্ব রাজনীতির কোনো সূক্ষ্ম খেলা কাজ করে? কোনো শহর শুধু পশ্চিমের মাপকাঠিতে বিচার করলেই কি তা বাসযোগ্য হয়ে যায়? প্রশ্নগুলো মনের কোণে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
পরদিন ভোরে যখন আমরা গুয়াংজুগামী ফ্লাইট ধরার জন্য বিমানবন্দরের দিকে ছুটছিলাম, তখন আধুনিক চীনের রূপকার শি জিনপিং পা রাখছিলেন উরুমচির মাটিতে। বর্ণিল সাজে সেজে অধীর অপেক্ষায় পুরো উরুমচি। বিদায় বেলায় উরুমচির আকাশ বিষাদে আচ্ছন্ন, অথচ শহরের মানুষ আনন্দিত তাদের নেতার আগমনে। বিদায় বেলার এই বৈপরীত্য আমাকে ভাবিয়ে তুলল। এমি, সালাম, কাদেয়া, নাদিরা- সবাই বিমানবন্দরে এসেছিল আমাদের তুলে দিতে। মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়, কিন্তু মনে হচ্ছিল ওদের সঙ্গে আমাদের জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক।
বোর্ডিং শেষে বিমানের টিকেট হাতে নিয়ে যখন সিকিউরিটি পাসের দিকে এগুচ্ছিলাম, তখন পেছন ফিরে দেখি কাদেয়া আর নাদিরা বাচ্চা মেয়েদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সহকর্মী রাকিবুল ইসলাম আর কামরুল হাসান পরম স্নেহে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি আর পেছন ফিরে তাকাতে পারছিলাম না। আমার চোখেও তখন অঝোর ধারা। কিছু একটা গোপন করে সন্তর্পণে সিকিউরিটি পাস অতিক্রম করে ওয়েটিং লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলাম। পেছনে পড়ে রইল তুষারময় তিয়ানশান, মরুকন্যা উরুমচি আর এক বুক ভালোবাসা মাখা কিছু মানুষ।
নতুন চীনের সেই অচিন পথ আজ আমার কাছে বড্ড চেনা, বড্ড আপন। বিদায় চীন, দেখা হবে কোনো এক নতুন পথের বাঁকে।