Published : 17 Jan 2026, 09:31 AM
হোরেসিও কিরোগার লেখা ‘লা গুয়েরা দে লস ইয়াকারেস’, এ গল্পটি লাতিন আমেরিকার এক অরণ্যগাথার স্বাদ বয়ে আনে। উরুগুয়েতে জন্মগ্রহণকারী দক্ষিণ আমেরিকার কথাশিল্পী হোরেসিও কিরোগাকে (১৮৭৮–১৯৩৭) বলা হয় ‘লাতিন আমেরিকার এডগার অ্যালান পো’।
কিরোগার জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে আর্জেন্টিনার মিসিওনেস প্রদেশের দুর্গম অরণ্যে, এটি তার লেখায় এক অনন্য রুক্ষ ও রোমাঞ্চকর মাত্রা যোগ করেছে। এই গল্পটি তার শিশুতোষ সংকলন ‘কুয়েন্তোস দে লা সেলভা’ (অরণ্যের গল্প)-এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত এই বইটির প্রতিটি গল্পে বন্যপ্রাণিদের জীবন ও সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে।
‘কুমিরের লড়াই’ গল্পটি কেবল কুমির আর মানুষের লড়াই নয়, বরং এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক রূপক আখ্যান। প্রযুক্তির অগ্রাসনের মুখে বন্যপ্রাণিদের অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াই আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এখানে প্রকৃতি নিজেই যোদ্ধা হয়ে ওঠে, পাঠকদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকৃতির সংহতির কাছে হার মানতে বাধ্য।
বিশাল এক নদী। এমন এক নির্জন দেশ যেখানে মানুষের পায়ের ছাপ কখনও পড়েনি। সেই নদীতে বাস করত শত শত, হয়তো বা হাজার হাজার কুমির।
তাদের প্রধান খাবার ছিল মাছ, আর মাঝেমধ্যে নদীর তীরে জল খেতে আসা বুনো জন্তু। চাঁদের আলোয় ঝিকমিক করা রাতে তারা নদীর জলে খেলা করত, আর দিনের বেলায় তপ্ত বালুচরে শুয়ে অলস ঘুমে সময় কাটাত। তাদের জীবন ছিল বড়ই শান্ত আর তৃপ্তিতে ভরা।
কিন্তু একদিন এক দুপুরে, যখন কুমিরগুলো তীরের বালিতে আয়েশ করে ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ এক কুমির জেগে উঠল। তার মনে হলো সে দূরে কোথাও একটা শব্দ শুনেছে। কান খাড়া করতেই সে শুনতে পেল- বহু দূরে, নদীর ওপার থেকে এক গভীর, গম্ভীর গর্জন ভেসে আসছে।
সে তার পাশের কুমিরটিকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে দিল। “জেগে ওঠো!” সে ফিসফিস করে বলল, “বিপদ আসছে!” পাশের কুমিরটি আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” প্রথম কুমিরটি উত্তর দিল, “জানি না, কিন্তু অদ্ভুত একটা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।”
ধীরে ধীরে সব কুমিরই সেই শব্দ শুনতে পেল। ভয়ে আর উদ্বেগে তারা লেজ উঁচিয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল। তাদের ভয় পাওয়ার কারণও ছিল যথেষ্ট। কারণ সেই গুমগুম আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছে। হঠাৎ তারা দেখতে পেল দূরে আকাশের গায়ে কালো ধোঁয়ার মেঘ জমছে এবং নদীর জল এমনভাবে কাঁপছে যেন কেউ লাঠি দিয়ে সজোরে জলে আঘাত করছে। কুমিররা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কী এমন জিনিস হতে পারে এটা?
ঠিক সেই সময় দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং জ্ঞানী কুমিরটি মুখ খুলল। তার চোয়ালের দুপাশে মাত্র দুটি সুস্থ দাঁত অবশিষ্ট ছিল। এই বুড়ো কুমিরটি একবার সমুদ্র যাত্রা করেছিল, তাই তার জ্ঞান সবার চেয়ে বেশি। সে হঠাৎ বলে উঠল, “আমি জানি ওটা কী! ওটা একটা তিমি মাছ! তিমিরা অনেক বিশাল হয় আর নাক দিয়ে শ্বেতশুভ্র জল ছিটিয়ে দেয়!”
একথা শুনে ছোট ছোট কুমিরগুলো ভয়ে চিৎকার করে উঠল। তারা জলে মাথা ডুবিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তিমি আসছে! তিমি আসছে!” কিন্তু বুড়ো কুমিরটি পাশের একটি ছোট কুমিরকে লেজ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে ধমক দিল, “ভয় পেয়ো না! আমি চিনি তিমি কী জিনিস। তারা আমাদের দেখে ভয় পায়!”
একথা শুনে কুমিরদের ভয় কিছুটা কমল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই সেই ধূসর ধোঁয়া কুচকুচে কালো রঙ ধারণ করল এবং জলের কম্পন আরও জোরালো হয়ে উঠল। কুমিররা আতঙ্কে শুধু চোখ আর নাকের ডগা বের করে নদীর জলে ডুব দিয়ে রইল। তারা দেখল- এক বিশাল এক পাহাড়ের মতো বস্তু, শরীর থেকে আগুন আর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জল পিটিয়ে এগিয়ে আসছে।
সেটি ছিল একটি স্টিমার, যা সেই নদীতে প্রথমবার যাত্রা শুরু করেছে। স্টিমারটি চলে যাওয়ার পর কুমিররা জল থেকে উঠে এলো। তারা বুড়ো কুমিরের ওপর খুব চটল, কারণ সে তাদের বলেছিল ওটা তিমি। বুড়ো কুমিরটি কানে কিছুটা কম শুনত। তার কানে চিৎকার করে তারা বলল, “ওটা তো তিমি ছিল না! তবে ওটা কী ছিল?”
বুড়ো কুমির গম্ভীরভাবে ব্যাখ্যা করল, “ওটা ছিল স্টিমার, আগুনের জাহাজ। ও যদি এভাবে নদীতে যাতায়াত করতে থাকে, তবে আমরা সবাই না খেয়ে মরব।”
সব কুমির হাহা করে হেসে উঠল। তারা ভাবল বুড়োটা নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে। কেন তারা মরবে? তারা মনের সুখে শিকারে গেল। কিন্তু একি! নদীতে একটা মাছও নেই। স্টিমারের বিকট শব্দ আর ধোঁয়ায় ভয় পেয়ে মাছগুলো সব পালিয়ে গেছে। বুড়ো কুমিরটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বলেছিলাম না? এখন আমাদের খাবার নেই। কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি, হয়তো স্টিমারটা আর ফিরবে না।”
কিন্তু পরদিন ঠিক একই সময়ে স্টিমারটি আবার এলো। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেল। তখন সব কুমির বুঝতে পারল অবস্থা বেগতিক। তারা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল- এই নদীতে বাঁধ তৈরি করতে হবে যাতে কোনো জাহাজ আর ঢুকতে না পারে। “বাঁধ! বাঁধ! চলো বাঁধ বানাই!” তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।
হাজার হাজার কুমির বনের ভেতর ঢুকে পড়ল। তারা তাদের লেজের ধারালো অংশ দিয়ে ল্যাপাচো আর কুয়েব্রাচোর মতো শক্ত কাঠ কাটতে শুরু করল। প্রায় দশ হাজার গাছ কেটে তারা নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পুঁতে দিল। প্রতিটি গুঁড়ি এক মিটার অন্তর স্থাপন করা হলো যাতে কোনো ছোট বা বড় জাহাজ গলতে না পারে। পরিশ্রমের পর তারা বালুচরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন তারা সেই জাহাজের শব্দ শুনেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। জাহাজটি বাঁধের সামনে এসে থেমে গেল। জাহাজের লোকগুলো দূরবিন দিয়ে সেই দানবীয় বাঁধ দেখে অবাক হয়ে গেল। তারা একটি নৌকা পাঠিয়ে পরীক্ষা করল। কুমিররা বাঁধের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে হাসতে লাগল।
নৌকাটি বাঁধের খুব কাছে এলে একজন লোক চেঁচিয়ে বলল, “ওহে কুমিররা!” কুমিররা মাথা তুলে উত্তর দিল, “কী হয়েছে?” “তোমরা আমাদের পথ আটকেছ!” “হ্যাঁ, আমরা জানি।” “পথ ছাড়ো!” “কখনোই না!” লোকগুলো কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলে আবার চিৎকার করে বলল, “কাল দেখে নেব তোমাদের!” কুমিররা উত্তর দিল, “যখন খুশি আসো!”
পরদিন যখন স্টিমারটি ফিরল, কুমিররা অবাক হয়ে দেখল এটি আগের জাহাজ নয়। এটি আরও বিশাল এবং ইঁদুরের মতো মেটে রঙের এক যুদ্ধজাহাজ। এর গায়ে বসানো বড় বড় কামান। সেই অভিজ্ঞ বুড়ো কুমিরটি সমুদ্র যাত্রার সময় এমন জাহাজ দেখেছিল। সে চিৎকার করে বলল, “সবাই জলের নিচে লুকাও! তাড়াতাড়ি! এটা রণতরি!”
মুহূর্তের মধ্যে কুমিররা জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় যুদ্ধজাহাজ থেকে কানফাটানো বিস্ফোরণ হলো। কামানের বিশাল গোলা এসে পড়ল বাঁধের ঠিক মাঝখানে। শক্ত কাঠের গুঁড়িগুলো দেশলাই কাঠির মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। একের পর এক গোলাবর্ষণে নিমিষেই পুরো বাঁধটি ধুলিসাৎ হয়ে গেল। যুদ্ধজাহাজটি বাঁশি বাজিয়ে সগর্বে পেরিয়ে গেল।
কুমিররা হতাশ হলেও দমে গেল না। তারা ঠিক করল আরও শক্তিশালী বাঁধ বানাবে। রাতভর কাজ করে তারা আরও বড় বড় গাছের গুঁড়ি দিয়ে দ্বিতীয় একটি বাঁধ তৈরি করল। সকালে যুদ্ধজাহাজটি ফিরে এসে আবার হুমকি দিল। কুমিররা বুক ফুলিয়ে বলল, “পারলে এবার ভেঙে দেখাও!”
কিন্তু যুদ্ধজাহাজের কাছে ছিল শক্তিশালী শ্র্যাপনেল। সেই বিশেষ কামানের গোলা যখন বাঁধের ওপর পড়ল, তখন এক একটি বিস্ফোরণে বাঁধের বিশাল অংশ ছিটকে আকাশে উড়তে লাগল। দ্বিতীয় বাঁধটিও টিকল না। জাহাজের নাবিকরা কুমিরদের বিদ্রুপ করতে করতে চলে গেল।
এবার কুমিররা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ছোট ছোট কুমিরগুলো খিদের জ্বালায় ছটফট করছিল। মাছগুলো ফিরে আসছে না। তখন বুড়ো কুমিরটি বলল, “আমাদের একটা শেষ সুযোগ আছে। আমাদের সুরুবি মাছের কাছে যেতে হবে। তার কাছে একটা অব্যবহৃত টর্পেডো আছে। সে যদিও আমাদের ওপর রাগ করে আছে, কিন্তু তার মনটা ভালো।”
বহু বছর আগে কুমিররা ভুল করে সুরুবির এক ভাইপোকে খেয়ে ফেলেছিল, তাই সে কুমিরদের সহ্য করতে পারত না। সুরুবি ছিল প্রায় দুই মিটার লম্বা এক মাছ, যে নদীর এক গুহায় সেই টর্পেডোটি আগলে রাখত। কুমিররা ভয়ে ভয়ে গুহার মুখে গিয়ে ডাক দিল। সুরুবি রেগে গিয়ে বলল, “তোমাদের সঙ্গে আমার কোনো কারবার নেই!” কিন্তু যখন সে বুড়ো কুমিরের কণ্ঠস্বর শুনল, তখন কিছুটা নরম হলো। বুড়ো কুমির সবিস্তারে সব বলল এবং সাহায্য চাইল।
সুরুবি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ঠিক আছে, আমি তোমাদের টর্পেডোটি দেব। তবে এটি চালাতে হবে আমাকেই, কারণ তোমরা জানো না এর প্রয়োগ।” তারা রওনা হলো। হাজারো কুমির একে অপরের লেজ আর ঘাড় কামড়ে ধরে এক বিশাল শিকল তৈরি করল। সুরুবি তার পিঠে সেই বিশাল টর্পেডোটি নিয়ে সেই শিকলের শেষে যুক্ত হলো। তারা দ্রুত গতিতে সাঁতরে সেই জায়গায় পৌঁছাল যেখানে তাদের পুরনো বাঁধটি ছিল। সুরুবির পরামর্শে তারা এবার আরও ঘন আর মজবুত করে তৃতীয়বারের মতো বাঁধ তৈরি করল।
বাঁধ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পরই যুদ্ধজাহাজটি আবার দেখা দিল। সেই উদ্ধত অফিসার আগের মতোই নৌকা নিয়ে এল এবং বিদ্রুপ করে বলল, “এখনও শিক্ষা হয়নি তোমাদের? এবার শুধু বাঁধ নয়, তোমাদের একজনকেও আমি জীবিত রাখব না। ওই যে বুড়ো কুমিরটা যার দাঁত নেই, ওকেও খতম করব।”
বুড়ো কুমিরটি অফিসারকে দেখে তার বিশাল মুখ গহ্বরটা একবার খুলল এবং শান্ত স্বরে বলল, “আমার হয়তো দাঁত কম, কিন্তু তুমি কি জানো কাল সকালে এই দাঁতগুলো কী খাবে?” অফিসার বিদ্রুপ করে হাসল। বুড়ো কুমির বলল, “তোমাকে খাবে!”
ঠিক সেই সময় সুরুবি জলের তলায় তার কারিশমা শুরু করল। সে টর্পেডোটি বাঁধের একটি ছোট ফাঁক দিয়ে তাক করল এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করে সুইচ টিপে দিল। মুহূর্তের মধ্যে টর্পেডোটি প্রচণ্ড গতিতে যুদ্ধজাহাজের দিকে ধেয়ে গেল। জাহাজের নাবিকরা যখন জলের আলোড়ন দেখল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ভয়াবহ এক শব্দে পুরো নদী কেঁপে উঠল। যুদ্ধজাহাজটির ঠিক মাঝখানে টর্পেডোটি আঘাত করেছে। পনেরো হাজার টুকরো হয়ে জাহাজটি বাতাসে উড়ে গেল। চিমনি, ইঞ্জিন, কামান- সবকিছু ধ্বংস হয়ে নদীতে পড়তে লাগল। কুমিররা বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার করতে লাগল।
নদীর স্রোতে জাহাজের নাবিক আর অফিসার ভেসে যাচ্ছিল। কুমিররা কাউকে আক্রমণ করল না, কিন্তু যখন সেই সোনার ফিতেওয়ালা উদ্ধত অফিসারটি ভেসে যাচ্ছিল, বুড়ো কুমিরটি ক্ষিপ্র গতিতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং দুই কামড়ে তাকে গিলে ফেলল। একটি ছোট কুমির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কে ছিল?” সুরুবি হাসিমুখে উত্তর দিল, “ওটা ছিল সেই অফিসার। আমার বন্ধু তার কথা রেখেছে।”
এরপর থেকে সেই নদীতে আর কোনো যুদ্ধজাহাজ আসেনি। মাছগুলো আবার ফিরে এলো। সুরুবি উপহার হিসেবে অফিসারের বেল্ট আর মেডেলগুলো চেয়ে নিল এবং সেগুলো পরে নদীতে ডাঁট পিটিয়ে সাঁতার কাটতে লাগল। কুমিররা আবার তাদের শান্ত জীবনে ফিরে গেল।
এখন স্টিমার বা মালবাহী জাহাজ দেখলে তারা আর ভয় পায় না, বরং তীরের বালিতে শুয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া দেখতে থাকে। তবে তারা এক জিনিস ভালোভাবেই জানে, যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে কখনও আপস নয়।