Published : 16 May 2026, 01:31 AM
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। যখন পৃথিবীর আকাশ ছিল কুসংস্কারের মেঘে ঢাকা, নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল অকল্পনীয়, আর বিজ্ঞানকে দেখা হতো জাদুবিদ্যার চোখে; ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে উদয় হয়েছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের।
তিনি হাইপেশিয়া। ইতিহাসে যাকে গণ্য করা হয় বিশ্বের ‘প্রথম নারী গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী’ হিসেবে। তার জীবন যেমন ছিল অনুপ্রেরণায় ঠাসা, মৃত্যু ছিল তেমনি করুণ।
হাইপেশিয়ার জন্ম সম্ভবত ৩৫০ থেকে ৩৭০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। তার পিতা থিওন ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া মিউজিয়ামের (যা তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল) শেষ প্রখ্যাত সদস্য ও বিখ্যাত গণিতবিদ। থিওন কেবল একজন পিতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাইপেশিয়ার শিক্ষক।
কথিত আছে, থিওন চেয়েছিলেন তার মেয়েকে একজন ‘নিখুঁত মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই শৈশব থেকেই হাইপেশিয়াকে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনের কঠিন সব পাঠ নিতে হতো। কেবল পড়াশোনা নয়, শরীরচর্চা, সাঁতার এবং অশ্বারোহণেও তিনি ছিলেন পারদর্শী।
পিতার সঙ্গে মিলে তিনি সম্পাদনা করেছেন জ্যামিতির দিকপাল ইউক্লিডের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এলিমেন্টস’। ধারণা করা হয়, টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘আলমাজেস্ট’-এর যে জটিল ব্যাখ্যা আমরা আজও পাই, তার বড় অংশই আসলে হাইপেশিয়ার অবদান।
যৌবনে হাইপেশিয়া শিক্ষা গ্রহণের জন্য এথেন্স ও ইতালিতে পাড়ি জমান। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় নিজের একটি দর্শন স্কুল খোলেন। তৎকালীন পৃথিবীর মেধাবীরা তার কাছে শিক্ষা নিতে আসতেন। তিনি কেবল গণিত শেখাতেন না, তিনি মানুষকে শেখাতেন কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হয়।
তিনি ছিলেন নিও-প্লাটোনিক দর্শনের অনুসারী। বলতেন, “তোমার চিন্তা করার অধিকারকে রক্ষা করো, কারণ ভুল চিন্তা করাও একেবারে চিন্তা না করার চেয়ে অনেক ভালো।” তার ক্লাসে সমবেত হতো খ্রিস্টান, ইহুদি এবং প্যাগান (প্রাচীন মতবাদে বিশ্বাসী) ছাত্ররা।
ধর্মের বিভেদ ভুলে সবাই সেখানে কেবল জ্ঞানের চর্চা করত। এমনকি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহৃত ‘অ্যাস্ট্রোলেব’ (নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়কারী যন্ত্র) এবং তরলের ঘনত্ব মাপার ‘হাইড্রোমিটার’ তৈরিতেও তার অবদান ছিল।
সে সময়ের ঐতিহাসিকদের মতে, হাইপেশিয়া ছিলেন অসামান্য সুন্দরী। কিন্তু জাগতিক সৌন্দর্যের চেয়ে তিনি তার জ্ঞানের চর্চাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিয়ে করেননি এবং আজীবন কুমারী থেকে নিজেকে দর্শনের কাছে উৎসর্গ করেছিলেন।
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছে প্লেটো বা অ্যারিস্টটলের কঠিন দর্শন সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন তিনি। তার ব্যক্তিত্ব ছিল এমন যে, আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদেরা তার পরামর্শ নিতেন।
তৎকালীন আলেকজান্দ্রিয়া ছিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অস্থিরতার এক উত্তপ্ত কেন্দ্র। একদিকে রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু শক্তি, অন্যদিকে খ্রিস্টধর্মের দ্রুত বিস্তার। শহরের গভর্নর ওরেস্টেস ছিলেন হাইপেশিয়ার গুণমুগ্ধ বন্ধু। অন্যদিকে আলেকজান্দ্রিয়ার চার্চের প্রধান ছিলেন আর্চবিশপ সিরিল। সিরিল ও ওরেস্টেসের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে তার বলির পাঁঠা বানানো হয় হাইপেশিয়াকে।
সিরিলের অনুসারীরা প্রচার করতে শুরু করে যে, হাইপেশিয়া একজন ‘ডাইনি’ এবং তিনি তার ‘জাদুবিদ্যা’ দিয়ে গভর্নরকে চার্চের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছেন। হাইপেশিয়া ছিলেন প্যাগান, অর্থাৎ তিনি চার্চের অনুশাসন মানতেন না। একজন নারী হয়েও তিনি কেন পুরুষদের সভায় বক্তৃতা দেবেন, কেন রাজনীতিতে নাক গলাবেন, এসব বিষয়কে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
খ্রিস্টীয় ৪১৫ সালের মার্চ মাস। একদিন হাইপেশিয়া যখন তার রথে চড়ে শহর দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ‘পিটার দ্য লেক্টর’-এর নেতৃত্বে একদল উন্মত্ত ধর্মান্ধ জনতা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তাকে রথ থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে নিয়ে যায় ‘সিজারিয়াম’ নামের একটি চার্চে।
সেখানে তার গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। ধারালো ঝিনুক এবং ভাঙা টালির টুকরো দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার শরীরের চামড়া ও মাংস তুলে নেওয়া হয়।
মৃত্যুর পরও এই নৃশংসতা থামেনি। তার নিথর দেহটিকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হয় এবং শহরের বাইরে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আলেকজান্দ্রিয়ার মুক্তচিন্তার যে প্রদীপ জ্বলছিল, তা চিরতরে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
হাইপেশিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রাচীন গ্রিক-রোমান সভ্যতার স্বর্ণযুগ প্রায় শেষ হয়ে যায়। আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি ও বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু হাইপেশিয়া হারিয়ে যাননি। আজ তিনি নারী জাগরণ ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এক অমর প্রতীক।
আধুনিক গণিতবিদরা স্বীকার করেন যে, বীজগণিত বা ডায়োফ্যান্টাইন ইকুয়েশন নিয়ে হাইপেশিয়ার কাজ না থাকলে বর্তমানের উচ্চতর গণিত অনেক পিছিয়ে থাকত। তার জীবন অবলম্বনে ২০১০ সালে ‘আগোরা’ নামক একটি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে তার মহিমা তুলে ধরেছে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।