ভ্রমণগদ্য
Published : 03 Jan 2026, 12:51 PM
ভাবুন তো, আপনি এমন একটি শহরে যাচ্ছেন যেখানে আজ থেকে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার বছর আগেও মানুষ বসবাস করত। আর সেখানে সেই আদি মানুষদের ফসিল পাওয়া গিয়েছে। তাদের নাম ছিল ‘পিকিং’। ভাবুন তো, আপনি এমন একটি শহরে যাচ্ছেন যাকে রক্ষা করার জন্য এক সময় পাহাড়ের পর পাহাড় ঘিরে মহা এক প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল, যা আজও পৃথিবীর এক মহাবিস্ময়। যাকে এক নজর দেখার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে সেই শহরে।
একটিবার ভাবুন তো, আপনি এমন এক শহরে যাচ্ছেন যেখানে এক সময় বিশাল এক রাজনগর গড়ে তোলা হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ প্রজাদের সেখানে প্রবেশ ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি রাজপরিবারের সব সদস্যেরও না। যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফরবিডেন সিটি’। সত্যি করে বলুন তো, এমন একটি ঐতিহাসিক শহরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আপনার অনুভূতিটা কেমন হবে? নিশ্চয়ই রোমাঞ্চকর, লোমহর্ষক এবং প্রচণ্ড উত্তেজনাময়।
আমাদেরও ঠিক তাই হচ্ছিল। বাঁধভাঙা উত্তেজনা নিয়ে চীন ভ্রমণের দশম দিনে আমরা উড়াল দিলাম উরুমচি থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের এক শহরে। দুপুর ঠিক ১২টায় বোয়িং ৭৩৭ বিমান আমাদের নিয়ে উরুমচির দিয়োপো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ল। তার আগে বিমানবন্দরে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন আরও দুই চীনা নারী, ওয়েন জি ও চাও জিয়ানজি। তারা পরবর্তীতে বেইজিং ভ্রমণে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

চীনের এই একটি বিষয় আমাদের বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সেই চীন আগমনের প্রথম দিন থেকেই বিষয়টি আমাদের চোখে পড়েছে। এমনকি আজও পর্যন্ত আমাদের ৩৪ জনের বাংলাদেশি দলটিকে গাইড করে চলেছে নারীপ্রধান ৫ সদস্যের একটি চীনা দল, যার মধ্যে ৪ জনই নারী। তাদের প্রধানের নাম চুই এন্না এমি।
এমি দারুণ পেশাদার এক নারী, ভীষণ আন্তরিক ও যত্নশীল। বয়স ৩৫-৩৬ হবে। এক সন্তানের জননী, মেয়ের নাম চেরি। তার স্বামী একজন সেনা কর্মকর্তা, থাকেন হাজার মাইল দূরে এক মিলিটারি ক্যাম্পে। চীনা সেনাদের সেনানিবাসে পরিবার নিয়ে বসবাসের অনুমতি নেই, তাই ছুটিছাটায় বা সপ্তাহান্তে এমির স্বামী উরুমচিতে আসেন। একদিন আলাপচারিতায় এমিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা এমি, চীনে একজন কর্মজীবী নারীর জীবন কেমন?” উত্তরে এমি বলেছিল, “ইন্টারেস্টিং। এই আমাকে যদি ধরো, আমি একজন মা, কারুর স্ত্রী এবং একজন কর্মজীবী নারী।”
এমি বলতে থাকলো, “গত তিন বছর যাবৎ আমি এই উরুমচিতে আছি নিজের শহর হুবেই ছেড়ে। হুবেই চীনের বিখ্যাত ইয়োলো নদীর তীরে অবস্থিত সুন্দর একটি শহর। অথচ কাজের সূত্রে আমি অবস্থান করছি এই জিনজিয়াংয়ে। জিনজিয়াং ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছি। বর্তমানে এক্সিন টিমের সঙ্গে সরকারের হয়ে কাজ করছি, দেশের জন্য কন্ট্রিবিউশন রাখছি। এইরকম চীনের ভেতরেই কর্মসূত্রে চীনা নারীদের গ্লোবালাইজেশন ঘটেছে, তারা দারুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।”

আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “চীন রাষ্ট্র হিসেবে নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছে?” এমি আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলল, “পুরুষের সমান মজুরি, সম্পত্তিতে সমান উত্তরাধিকার আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু শুরুতে চীনের নারীদের অবস্থা এরকম প্রাগ্রসর ছিল না। বরং বিপ্লবোত্তর সরকারের নীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় চীনে নারীদের আজকের এই সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আমার ভাই এখন যেমন সরকারের জন্য কাজ করে, তেমনি আমিও করি। আমার শাশুড়ি সেক্ষেত্রে আমার বাচ্চাকে দেখাশোনা করেন।”
এমির কথা শুনে তৎক্ষণাৎ মনে হলো, এই একটি বিষয় যেন আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে চীনের হুবহু মিলে গেল; দাদি-নানিদের নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করা।
নিচে চীনের বিস্তীর্ণ মরুভূমি, তিয়ানশান পর্বতমালা, সবুজ পাহাড়, সর্পিল নদী আর পাহাড়ি জনপদ। আর উপরে খোলা আকাশ। আমরা বসে আছি এক উড়ন্ত পঙ্খীরাজের পেটে। পঙ্খীরাজটা যেন ডানা ঝাপটে আমাদের নিয়ে চলেছে অচিন কোনো দেশে, মেঘশূন্য নীল আকাশ পথে। বিমানের জানালায় চোখ দিতেই দেখি দূরে বিপরীতমুখী আর একটি বিমান, যেন আয়নায় নিজেরই প্রতিচ্ছবি। নিঃশব্দে সে দ্রুত ভেসে গেল পেছনে। কৌণিক উপরে আরও একটি বৃহৎ বিমান, প্রচণ্ড ধোঁয়ার কুণ্ডলী পিছনে ফেলে ছুটছে যেন আকাশ ফুটো করে পরীদের দেশে।
কী এক রোমাঞ্চ! আনন্দে শরীর শিউরে ওঠে, অদ্ভুত এক ঘোর জাগে মনে। সেই ঘোরের সুরঙ্গ পথে আবার ফিরে আসে এমি। সে যেন ফিসফিস করে বলে, সেই ৫০-এর দশকের কথা। চীনে তখন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটে গেছে। বিপ্লবোত্তর সরকার সর্বক্ষেত্রে দেশ গঠনে হাত দিয়েছে। পরিকল্পনা করেছে পুরনো সব ধ্যান-ধারণায় আঘাত হানতে হবে, ভেঙে ফেলতে হবে পুরনো অচল বিশ্বাস, এগিয়ে আনতে হবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে।

নারীরা ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৬৮ সালে চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে তুং বলেছিলেন, “নারীরা অর্ধেক আকাশ ধরে রেখেছে।” এই একটি বার্তায় নারীরা সমান মর্যাদা এবং সুযোগের একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি পেয়ে যায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ভেঙে নারীরা নেমে পড়ে কর্মক্ষেত্রে, যার সুফল আজ চীন পাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির চরম শিখরে, যেখানে দারিদ্র্য নেমে এসেছে ১% এর নিচে।
প্রায় তিন ঘণ্টা ওড়ার পর বিমান এক সময় বেইজিংয়ের উপর ছায়া ফেলে। কে একজন যেন চাপা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, “এই তো নিচে বেইজিং!” সংবিৎ ভেঙে দুর্নিবার কৌতূহলে জানালায় চোখ দিতেই দেখি পাহাড়ের আড়াল থেকে ক্রমশ প্রস্ফুটিত হওয়া এক মহানগর। উত্তল পৃথিবীর বুকে যেন শিল্পীর হাতে গড়া সুউচ্চ ভবন, সবুজ বনায়ন আর নদী-খালের এক লোকালয়। আর আমরা যেন বাঁকা শিংয়ের এক পঙ্খীরাজের সওয়ারি। দুর্দান্ত গতিতে যা মাটি কাঁপিয়ে নামল বেইজিং ডেক্সিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
বেইজিং বিমানবন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন চ্যাঙ্গ হুই। চীনা ট্যুর গাইড। তার বিশেষত্ব হলো তিনি সব কথাতেই হাসেন। সদা হাসোজ্জ্বল ফর্সা ওই ভদ্রমহিলা বিমানবন্দর থেকে আমাদের রিসিভ করে নিয়ে চললেন বেইজিং অভিমুখে। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সাঁই সাঁই করে বাস ছুটছে, আর অপার কৌতূহলে আমরা চেয়ে আছি বাইরে। দুপাশে সবুজ বনানী, ফসলের মাঠ। হঠাৎ হঠাৎ দুই-একটা কারখানা। একটু পরে আকাশচুম্বী বিশ-পঁচিশ তলা দালানের সমারোহ।

চীনের বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসনের চাপ সামলাতেই বোধ হয় এতো এতো সুউচ্চ ভবনের জন্ম, যা উরুমচিতেও লক্ষ্য করেছি- ঠিক যেন যমজ ভাইবোন, একই নকশার। নির্দিষ্ট দূরত্বে রাস্তাগুলো বেশ ছিমছাম। পথে স্বল্পসংখ্যক অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত, তবে আমাদের দেশের মতো নয়, ভিন্ন ডিজাইনের, আরও আধুনিক ও নিরাপদ। মানুষজনও বেশ সুশৃঙ্খল। এটি বেইজিং শহরতলি, একটি নিরেট আবাসিক এলাকা। এর পরেই জনবহুল একটি মার্কেট। সেখানে এসে আমাদের বাস থেমে গেল। এমি তখন বলল, “এখানে আমরা ডিনার করে নেব, আমাদের হোটেলের কাছে কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। মহাশয়গণ, সবাই অনুগ্রহ করে নামুন।”
হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম তখন বিকেল পাঁচটা। বাংলাদেশ সময় তখন মাত্র দুপুর তিনটা। মনে মনে ভাবলাম, বলে কী! এই সময়ে রাতের খাবার? কিন্তু করার কিছু নেই, চীন ভ্রমণে এসেছি তাই চীনা রীতি আমাদের মানতেই হবে। অগত্যা বাস থেকে নেমে দ্রুত মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় উঠে ডিনার গ্রহণে নিবিষ্ট হলাম। জায়গাটি ছিল বেইজিংয়ের নংঝান নানলি কমিউনিটি এলাকা, সিটি সেন্টার থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে। পার্শ্ববর্তী চাওয়াং ডিস্ট্রিক্টের মাইজডিয়ান সাব ডিস্ট্রিক্টের অনেক অধিবাসী এসে ভিড় করেছে এই রুইচেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ও তার আশপাশে।
সেখানে বসেছে হরেক রকম স্ট্রিট ফুডের পসরা। পাশেই একটি মার্কেট, আর মার্কেটের পাশের ফাঁকা জায়গায় একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। লাল স্টেজ সাজানো হয়েছে, পুতুলের মতো চীনা শিশুরা নেচে নেচে অনুশীলন করছে। জানতে পারলাম ‘ওয়ার্ল্ড ফান’ নামে একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে একটু পরেই। কিন্তু আমাদের হাতে সময় নেই, ডাক পড়ল বাসে চড়ার। তাই দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে আমরা ঝটপট ফের বাসের পেটে ঢুকে পড়লাম।

হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা লেগে গিয়েছিল। কিন্তু বাইরে কোনো অন্ধকার নেই, হোটেলের আলো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। পাঁচতলা সুদৃশ্য হোটেল ভবন, উপরে চাইনিজ ও রোমান লাল হরফে লেখা ‘ভিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল হোটেল’। ভেতরে প্রবেশ করতেই একগুচ্ছ পুতুল যেন, পুতুলের মতো চীনা মেয়েরা কাউন্টারে স্মিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে বিশাল দেয়ালচিত্র, অষ্টাদশ শতাব্দীর অভিজাত ললনাদের উচ্ছল আড্ডার দৃশ্য। পাশ্চাত্য ললনা, বিখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী জুয়ান পাবলো স্যালিনাস যেমন আঁকতেন। মন ভরে গেল হোটেলের নান্দনিকতা দেখে। মনে মনে আশ্বস্ত হলাম, বেইজিং ভ্রমণটা ভালোই হবে। তারপর কাউন্টার থেকে চাবি বুঝে নিয়ে পা বাড়ালাম রুমের দিকে।
পরদিন সকালে বাস আমাদের নিয়ে ছুটল বেইজিং সিটি সেন্টারের অভিমুখে। সন্তর্পণে চাকা গড়িয়ে যাচ্ছে আর জানালার কাচে সকালের কাঁচা রোদ। বাইরে নির্মল সকাল, নরম আলো, গাছের পাতায় ধিকিধিকি কম্পন আর ফুরফুরে বাতাস। বাস মুখ ঘুরিয়ে ডানে চলল বহু লেন রাস্তার মধ্যপথ ধরে। আমাদের সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ বাইরে। তখন হঠাৎ মনে পড়ল গতরাতের রোবটের কথা। হোটেল লবি থেকে চাবি নিয়ে রুমে ব্যাগ ফেলে আমরা ফের বেরিয়ে পড়েছিলাম রাতের বেইজিং দেখতে।
কিন্তু বিধি বাম; অচেনা শহর, বিরাট মেট্রোপলিটন, কে দেবে পথের দিশা? কে ধরবে হাত? কে নিয়ে যাবে বেইজিংয়ের রাতের মায়াবী জগতে? তখনই দেখা সেই রোবটের সঙ্গে। লিফটে লাফিয়ে উঠলাম আমাদের সঙ্গে এক রোবট বেটাকে দেখে। কী আশ্চর্য! ও চুপচাপ আমাদের সঙ্গে লিফটে নিচে নামছে। দেখতে অনেকটা পানির ফিল্টারের মতো বর্তুলাকার, কোমর অবধি উচ্চতা। হাত-পা নেই, চাকায় চলে। সামনের দিকটা কালো, মাথার দিকটা সাদা। সাদা মাথায় ইলেকট্রনিক্স ডিসপ্লে, ডিসপ্লের নিচে চীনা হরফে কী যেন লেখা। বাংলা করে দেখলাম ব্যবহার পদ্ধতি: “৮+৪ সংখ্যার রুম নাম্বার লিখুন এবং ডেলিভারিতে ক্লিক করুন, রুমে সার্ভিস পৌঁছে যাবে।”
বিস্ময়াভিভূত হলাম চীনাদের প্রযুক্তি ব্যবহার দেখে! পশ্চিমা সায়েন্স ফিকশন মুভির বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছে চীনারা নিজ দেশে। মনে মনে তৃপ্ত হলাম, কত কিছুই না দেখছি চীনে এসে! সাঁই সাঁই করে বাস ছুটছে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে। বেইজিংয়ের দৃশ্যান্তরে বুঁদ হয়ে আছি আমরা। বাতাসের সুরে কারা যেন গাইছে বেইজিং অলিম্পিক ২০০৮ এর থিম সং, “তুমি আর আমি/ এক পৃথিবী হতে/ হাজার মাইল ভ্রমণ শেষে/ দেখা হবে বেইজিংয়ে এসে”।
চলবে...