১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শীতল গাঁওয়ে মালো বিয়ে

কনেকে উঠোনে মায়ের কোলে গিয়ে বসতে হয় এবং নিজেই মাটি খুঁড়ে গর্ত তৈরি করে সঙ্গে আনা জিনিসগুলো মাটিচাপা দিয়ে তবেই উপোস ভাঙতে হয়।

শীতল গাঁওয়ে মালো বিয়ে
মালোদের বিয়ে মূলত পাঁচটি পর্বে সম্পন্ন হয়: সাজনা সাজা, লগন, কৈইলনী, মারোয়া ও বিহা।

সালেক খোকন সালেক খোকন

Published : 23 Aug 2026, 12:33 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

দিনাজপুরের শীতল গাঁওয়ে কথা হচ্ছিল মালোদের সঙ্গে। একমনে শুনছিলাম বাসন্তী, ভরত ও তার সহধর্মিণীর কথা। হঠাৎ মাদল ও ঢোলের টুংটাং শব্দ ভেসে আসে পাশের একটি বাড়ি থেকে। সেদিকে খেয়াল দিতেই বাসন্তী মালো মুচকি হাসেন। তিনি জানান, পাশের বাড়ির মেয়ের বিয়ে চূড়ান্ত হয়েছে, তাই বিয়ের আগ পর্যন্ত নানা আচার চলবে ঢোল-মাদলের ছন্দে। 

ছন্দ ধরে সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে চলি, আর আমাদের পথ দেখিয়ে নেন বাসন্তী। ছনে ছাওয়া তিনটি ঘর নিয়ে গঠিত বাড়িটির উঠোনের এককোণে উঁচু ও ছোট্ট একটু জায়গায় একটি তুলসি গাছ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তুলসির গোড়াটি মাটিতে লেপা এবং গাছের পাশেই রয়েছে একটি প্রদীপ। 

গৃহকর্ত্রী গঙ্গা মালো জানান, এটি মালোদের ‘তুলসি গড়া’, যেখানে ভগবানের সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা সকাল-সন্ধ্যা ভক্তি বা প্রার্থনা করেন এবং মালো ভাষায় একে ‘গরলাগি’ বলা হয়। বড় একটি ঘরের বারান্দার এককোণে বসে মাদলের ছন্দ তুলছিলেন নির্মল মালো, আর তার সঙ্গে মালোদের বিয়ে নিয়ে আলাপ জমানোর পাশাপাশি গঙ্গা মালোও আগ্রহ নিয়ে বলতে থাকেন বিয়ের আদ্যোপান্ত। 

মালোদের বিয়ের পাকা কথা হয় কনের বাড়িতে, যেখানে কনেপক্ষকে ভালো ভালো খাবারের সঙ্গে খেতে দিতে হয় তাদের প্রিয় পানীয় ‘হাড়িয়া’। একসময়ে তাদের সমাজে পণপ্রথা চালু থাকলেও বর্তমানে সামর্থ্য অনুযায়ী ছেলেকে যৌতুক দিতে হয়, যদিও যৌতুক প্রথাকে মালোরা তেমন একটা ভালো চোখে দেখেন না এবং গঙ্গা মালোর ভাষায় ‘ডিমেন না নেওয়াই ভালো’।

মালোদের বিয়ে মূলত পাঁচটি পর্বে সম্পন্ন হয়: সাজনা সাজা, লগন, কৈইলনী, মারোয়া ও বিহা। ‘সাজনা সাজো’ পর্বে বরপক্ষ কনেকে সাজানোর জন্য হলুদের শাড়িসহ চিঁড়া, গুড়, তেল, হলুদ, আয়না, চিরুনি, দুটি মাটির পুতুল, চুরি, কানফুলি, নাকফুল, মালা, ফিতা, পান-সুপারি, জবা ও গাঁদা ফুল, কুশ (একপ্রকার বুনো ফুল), শামুকের নুপুর ও পুতুলের খাট পাঠায়। এছাড়া তারা কনের জন্য সাদা রঙের কাপড় হলুদে ডুবিয়ে বিশেষ ধরনের শাড়ি তৈরি করেন, যাকে মালো ভাষায় বলা হয় ‘হরদি লেংগন লুগা’। 

গঙ্গার কথার রেশ ধরে নির্মল জানান ‘লগন’ পর্বের কথা, যেখানে কনের মা-বাবাকে প্রথমে আদিরীতি মেনে প্রার্থনা করতে হয় এবং পরে ঘরের ভেতর কনেকে রেখে তার চাচা-চাচি, মামা-মামি ও নিকটাত্মীয়রা গায়ে হলুদ দেন। এসময় সবাই মিলে বাড়ির উঠানে নানা রঙের আলপনা আঁকেন এবং একটি বিশেষ গান গেয়ে ওঠেন—“মিন্দে কর মাতল পিয়া সিতলিয়া আনানে/ নিদো নাহি এ পিয়া/ আয় আধার রাতিয়া করে কর বাজু আখে/ গর এ খর বাজু আখে/ কে যে কলি লে লাই পিয়া/ আয় আধার রাতিয়া/ নিদো নাহি পিয়া/ আয় আধার রাতিয়া/ ডারাকর পিছু আখে/ পিছু আখে ডার আখর/ ছো আখে কে যে খলিলে/ লাই পিয়া আয় আধার রাতিয়া/ নিদ নাহিরে পিয়া/ আয় আধার রাতিয়া।” 

এর ভাবার্থ হলো—“অনেক রাত করে ঘুমিয়েছি বিয়ে বাড়িতে, আর কে যে পায়ের নূপুরটাকে নিয়ে নিল তা জানি না, চোখেও ঘুম নেই, কে যে কোমরের বিছাটা খুলে নিয়ে নিল তাও জানি না…।” এরপর কনেকে উঠোনে এনে পূর্বমুখো করে বসানো হয় এবং নিয়ম মেনে কনের একপাশে বরের ভাই ও অন্যপাশে কনের ভাই বসে সবার উপস্থিতিতে একে অপরের বুকে পানপাতা ছোঁয়ায়ে ‘বিয়াই’ বলে সম্বোধন ও কোলাকুলি করেন, আর চারপাশ মুখরিত হয় মাদল-ঢোলের বাদ্যে, যেখান কনে দাঁড়িয়ে সবাইকে প্রণাম করেন।

‘কৈইলনী’ পর্বের কথা জানতে চাইলে গঙ্গা মুচকি হেসে ছোট্ট একটি বাঁশের ঝুড়িতে কিছু মুড়ি এগিয়ে দিয়ে বলতে থাকেন যে, গায়ে হলুদের তিন দিন পর এই কৈইলনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কনেকে দিনে ও রাতে শুধু দুধ ও রুটি খেয়ে উপোস থাকতে হয়। ওই দিন খুব ভোরে উঠে জিগা গজ, বাঁশপাতা, ধান, সুপারি, এক টাকা, অর্পণ, সিঁদুর, ছোট ছোট সাদা কাপড় ও সুতা সঙ্গে নিয়ে কনেকে উঠোনে মায়ের কোলে গিয়ে বসতে হয় এবং নিজেই মাটি খুঁড়ে গর্ত তৈরি করে সঙ্গে আনা জিনিসগুলো মাটিচাপা দিয়ে তবেই উপোস ভাঙতে হয়।

শীতল গাঁওয়ের এক মালো নারী, ছবি: লেখক।

শীতল গাঁওয়ের এক মালো নারী,

‘মারোয়া’ পর্বের কথা উঠতেই বাসন্তী গান ধরেন—‘চারকোনা চারখোট মাঝে মারোয়া…’—এবং বাড়ির উঠোনে মারোয়া সাজানোর সময় মালো আদিবাসীরা লুচকি নাচ নেচে ওঠেন। মারোয়া সাজাতে কি লাগে—এমন প্রশ্নের জবাবে গঙ্গা জানান যে, চারটি কলাগাছ, মাঝখানে একটি বাঁশ এবং ফুল দিয়ে চারপাশ ঘিরে সাজাতে হয়, আর একটি মাটির কলস রাখার জন্য মারোয়ায় তিন চাক মাটি বসাতে হয়, যা বাড়ির দুলাভাই ও দিদিরা দলবেঁধে নেচে-গেয়ে মাঠ থেকে কেটে আনেন। 

তারপর ঘরের ভেতর রাখা মাটির কলসটি নিয়ে উপোস অবস্থায় দুলাভাই ও দিদিরা পুকুর বা নদী থেকে পানি নিয়ে আসেন, যাকে ‘পানিকাটা’ পর্ব বলা হয়। বাসন্তী জানান যে এরপরে ‘যোগপানি উঘাইতে’ যেতে হয়, যেখানে দুলাভাই কনেকে কোলে তুলে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যান এবং সেই বাড়ির মেয়েদের চুল ও কনের চুল একত্র করে পানি ঢেলে সে পানির কিছু অংশ কলসে সংগ্রহ করেন। 

তারপর সেই কলসটি গোপন একটি ঘরে রাখা হয়, যেখানে বাবা-মা ও দুলাভাই ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ, কারণ মালোদের বিশ্বাস এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে কনের অমঙ্গল হতে পারে। বিয়ের দিন সবাই উলুধ্বনি দিয়ে প্রথমে কলসটি নিয়ে মারোয়ার চারপাশে পাঁচ পাক ঘোরেন এবং পরে তা মাটির চাকের বিশেষ জায়গায় স্থাপন করেন।

মালোদের বিয়ের মূল পর্বটিকে ‘বিহা’ বলা হয়। ওই দিন বাড়িতে নাপিত ডেকে প্রথমে কনেকে শুদ্ধি করানো হয়, যেখানে কনের কানি আঙুল সামান্য কেটে আমপাতায় রক্ত নিয়ে তা কনেরই হাতে বেঁধে দেওয়া হয়। বরপক্ষ এলে কনের মা ও কাকিরা কুলাতে গোবর গুলি, গুড়ের গুলি, দূর্বাঘাস, আতপ চাল, মিষ্টি, পানি, পানপাতা ও প্রদীপ নিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে বরকে বরণ করে নেন। 

তারপর কনের ভাই বরকে গামছায় টেনে মারোয়ার চারপাশে পাঁচ পাক ঘোরান এবং বর-কনেকে মারোয়ায় বসিয়ে শুরু হয় দানপর্ব, যেখানে আত্মীয়-স্বজনরা তাদের নানা উপহারে আশীর্বাদ করেন। দান শেষে বর-কনে মারোয়ার চারপাশে পাঁচ পাক ঘুরে পূর্ব দিকে মুখ করে দাঁড়ালে একটি শাড়ি বা চাদরে দুজনকে ঢেকে দেওয়া হয় এবং চাদরের আড়াল থেকে বর কনেকে সিঁদুর পরান—যা গঙ্গার ভাষায় ‘কনিকাকে সিঁন্দুর পরাবে দুলা বাবু’। 

তারপর বর-কনে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ফিরে সবাইকে প্রণাম জানান এবং বিয়ে শেষে রাতভর নাচ-গান ও হাড়িয়া খাওয়ার আসর বসে। মালোদের বিয়েতে কনে শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ ও বিভিন্ন অলংকার পরেন এবং ছেলেরা ধুতি, পাঞ্জাবি ও মাথায় মুকুট পরে থাকেন। 

পূর্বে মালো সমাজে যৌথ পরিবারের সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে একক পরিবারের সংখ্যাই বেশি। এই আদিবাসী সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত পুরুষের হাতে। পারিবারিক সম্পত্তির ওপর নারীর কোনো অধিকার না থাকায় পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ছেলেসন্তানরাই পান। মা সাধারণত বড় বা ছোট ছেলের কাছে থাকেন, যদিও বর্তমানে মালো পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। 

মালো সমাজে বিয়েবিচ্ছেদ নেই বললেই চলে; তবে কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হলে উভয়পক্ষের আত্মীয়স্বজন ও গ্রামপরিষদ তা মীমাংসার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হলে সবার উপস্থিতিতে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। স্বামী স্ত্রীকে ‘অত্যাচার’ করলেও পরিবার ও সমাজ সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে এবং এসব বিষয় অত্যন্ত গোপনে রাখা হয়। এছাড়া, মালো সমাজে বহুবিয়ে একেবারেই অনুপস্থিত।