Published : 26 Jan 2026, 10:04 PM
শিশু সাংবাদিক হিসেবে জীবনের শেষ লেখাটি লিখতে বসেছি। লেখা শুরু করতেই মনে পড়ে যাচ্ছে শুরুর দিনগুলোর কথা। পাঁচ বছর আগে, বিশেষ কিছু না ভেবেই হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শিশু সাংবাদিক হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলাম।
শুরুর দিকে লেখালেখি কম করতাম। তখন লেখার হাত ছিল একদমই কাঁচা। ভুলই হত বেশি।
আমার প্রথম প্রতিবেদন ছিল কোডিংয়ে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে। এরপর শশীলজ নিয়ে একটি ফিচার লিখেছিলাম। সেই লেখায় অফিস থেকে বারবার সংশোধনী আসছিল। আমি কিছুতেই ঠিকভাবে প্রতিবেদনটি লিখে উঠতে পারছিলাম না।
তখন শিশু সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই কম ছিল। কোনো কর্মশালায়ও অংশ নিইনি। তবু আমি হাল ছাড়িনি। আজ এই শেষ সময়ে এসে হিসাব করে দেখলাম, আমার প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি আমি অনেক ভিডিও প্রতিবেদন করেছি। আমার তোলা ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
লেখালেখির বাইরেও হ্যালো আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আত্মবিশ্বাস। করোনাভাইরাস মহামারির প্রকোপ কিছুটা কমে এলে ২০২১ সালে একটি গোল টেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করতে প্রথম হ্যালোর অফিসে যাই। সেখানে কাউকেই চিনতাম না। সংকোচ কাজ করছিল। অতিথিদের সামনে কথা বলতে পারব কিনা, তা নিয়েও ভেতরে ভেতরে ভয় ছিল।
সেই যে শুরু, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত যে কোনো অনুষ্ঠান আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সঞ্চালনা করতে পারি।
আমি হ্যালোর হয়ে কন্যা শিশু দিবসের একটি অনুষ্ঠানে সারাদেশের শিশুদের পক্ষ থেকে ‘কল ফর অ্যাকশন’ তুলে দিয়েছি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর হাতে। আমাদের দেশের মেয়েদের নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও নীতিনির্ধারকদের সামনে বক্তব্যও দিয়েছি।
হ্যালোতে যুক্ত হওয়ার পর নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আমার ভেতরে আরও গভীর হয়েছে। তাই আমার লেখালেখির একটি বড় অংশজুড়ে ছিল নারী ও শিশুর অধিকার, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা।
ইউনিসেফের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আমি নানা মতামত তুলে ধরেছি। তাদের অ্যাডভোকেসি কর্মশালাতেও অংশ নিয়েছি এবং সেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
হ্যালোতে আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো তৈরি হয়েছে খবর সংগ্রহের দিনগুলোতে। প্রথম ভিডিও প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম হাতিরঝিল নিয়ে। এছাড়াও একবার কড়াইল বস্তিতে গিয়েছিলাম খবর সংগ্রহ করতে। নৌকায় করে, বৃষ্টিতে ভিজে ভিডিও করেছি।
যেখানেই যেতাম, সেখানেই খুঁজে খুঁজে প্রতিবেদন তৈরির চেষ্টা করতাম। মাথার ভেতর সারাক্ষণ নতুন প্রতিবেদনের ভাবনা ঘুরে বেড়াত। এজন্যই আমি বলি, হ্যালো আমাকে দিয়েছে সাংবাদিকের চোখ।
কোনো বিষয়ে লেখার আগে আমি সেই বিষয় নিয়ে ইন্টারনেটে যত লেখা পাওয়া যায়, সব পড়ে ফেলি। বাসায় সে বিষয়ে বই থাকলে সেগুলোও পড়ি। তারপর লিখতে বসি।
তাই বলাই যায়, ফ্যাক্ট চেকিংয়ের মাধ্যমে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাও শিখেছি হ্যালো থেকেই। কোন সূত্র বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি নয়, সেটাও বুঝতে শিখেছি।
হ্যালোতে যুক্ত হয়ে আমার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তারাও আমার মতই শিশু। যদিও তাদের সঙ্গে দলগত প্রতিবেদন খুব একটা করা হয়নি আমার। হয়ত নিজের মত করে কাজ করতে বেশি পছন্দ করি বলেই।
হ্যালোতে যুক্ত হয়ে আমার অনেক প্রাপ্তি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যদি বলতে হয়, তা হল মানুষের ভালোবাসা। হ্যালোর সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমিও তাদেরকে ভীষণ ভালোবাসি।
এই ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। খুব অল্প সময়ের মধ্যে যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়েছে, হ্যালো অনেকবারই সে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি প্রতিবারই কাজটি সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে করার।
আমার একটি খুবই খারাপ অভ্যাস ছিল শেষ সময়ে কাজ করা। তবে হ্যালোতে যুক্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ জমা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমার ব্যক্তিগত জীবনেও।
অনেক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন করতে গিয়েছি। হ্যালো আমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছে। সব অনুষ্ঠানে বাবাও আমার সঙ্গে গিয়েছেন।
২০২৫ সালে শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য আমি মনোনীত হই। সেই কৃতিত্বের দাবিদারও আমার হ্যালো। এখান থেকেই ছোট্ট মোমবাতি কেকা আজ সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আলো ছড়াতে চায়।
বিদায়ের এই সময়ে সব স্মৃতি তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধু মনে হচ্ছে, আমি আর শিশু সাংবাদিক নই। আমার লেখা আর প্রকাশ করবে না হ্যালো।
ভালো থেক প্রিয় হ্যালো। বিদায়।
প্রতিবেদনটি তৈরির সময় প্রতিবেদকের বয়স: ১৭। জেলা: ঢাকা।