‘এখানে থেমো না’, ক্যান্সার লড়াকুদের 'গল্প শোনাতে হবে মানুষকে'

“নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করলে তা অত্যন্ত কার্যকর হয় বলে বিভিন্ন সার্ভাইভার গ্রুপ গড়ে তোলা জরুরি,” বলছিলেন ডা. শুভাগত চৌধুরী।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Feb 2024, 04:32 PM
Updated : 3 Feb 2024, 04:32 PM

“পরীক্ষার হলেই বুঝলাম যে লিখতে গিয়েও ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, যা কখনই আগে হয়নি। পরীক্ষার পরই এক রাতে বাসায় খাবারের পর যখন বমি হয়ে রক্ত পড়ল, তখন পরিবারের সবার টনক নড়ল। তার আগে সারা রাত কাশলেও বাসায় কেউ লক্ষ্য করেনি। সবাই জানত আমার ‘লোহার শরীর’।”

শরীরে রোগ বাসা বাঁধার বিষয়টি টের পাওয়ার কথা এভাবেই বলছিলেন এক ক্যান্সার লড়াকু।

যদিও এ ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকে তিনি টের পাচ্ছিলেন শরীর খারাপ হচ্ছে, কাশিতে সেরকম ইঙ্গিতও মিলছিল। তবে সেগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেননি তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা।

সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ ক্যান্সার জয়ী বলেন, “এছাড়া আমি নিতান্ত সমস্যা না হলে কখনও কাউকে কিছু বলি না বা বলতামও না- মাকেও না! তা' কাশির সাথে রক্ত পড়ার পর সবার টনক নড়ল।”

শনিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তনে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে ৪২ জন ক্যান্সার লড়াকুর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত ‘এখানে থেমো না: ক্যান্সার লড়াকুদের বয়ান’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা সভায় এভাবেই নিজের গল্প বলছিলেন লেখক অদিতি ফাল্গুনী।

আগামী রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠাদের স্বেচ্ছাসেবামূলক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী ৩ জুন ক্যান্সার লড়াকু অন্যদের নিয়ে আরেকটি বই প্রকাশ করা হবে।

এমন একটি রোগ ধরা পড়ার আগে অসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে এদিনের আলোচনায় অদিতি ফাল্গুনী বলেন, “১৯৯২ সালের জুনে ঢাকা ভার্সিটিতে আইন সম্মান প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার কয়েক মাস আগে থেকেই আমার বেশ কাশি, কখনও কখনও রাত জেগে কাশি, অল্প পড়াশোনা করলেই ঘাম ও ক্লান্তি, দুর্বলতা এসব দেখা যাচ্ছিল। বাসায় দু/একবার বললেও যেহেতু অতীতে আমার কখনও বছরে একবারও জ্বর হত না, কাজেই কেউ তেমন গা করেনি।

“মাত্রই এরশাদের পতনের পর ঢাকা ইউনিভার্সিটি তার অতীতের সেশনজট কাটিয়ে উঠছিল এবং তার ভেতর আমাদের আইন বিভাগ ছিল সবার আগে। অন্য ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা যখন ১২ মাসেও ফাইনাল পরীক্ষা দেয় না, আমাদের এখানে ভর্তির ছ'মাসের ভেতরেই ফাইনাল পরীক্ষার তোড়জোড়। তাতে শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে পড়ছিল।”

রোগ ধরা পড়ার শুরুর দিনগুলোর কথা এবং দীর্ঘসময় চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাওয়ার দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই কথা সাহিত্যিক। তিনি রোগ শণাক্তে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সার নিয়ে পরিবার ও সমাজের সবাইকে আরও বেশি সচেতন হওয়ার তাগিদ দেন।

ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সিসিসিএফ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ক্যান্সার লড়াকুদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের পটভূমি তুলে ধরে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “এই বইয়ে ৪২ জনের গল্প আছে। আমরা যখন সংকলনটি করা শুরু করি তখন অনেক লেখা এসেছে। সেজন্য আমরা প্রথমে ৪২ জন লড়াকুর বয়ান নিয়ে এই বইটা শুরু করলাম। আগামী ৩ জুন ক্যান্সার সার্ভাইভারর্স ডেতে বাকি গল্পগুলো নিয়ে আরেকটা বই করব।”

তিনি বলেন, “এই বইটা করার আমাদের দুটি উদ্দেশ্য। প্রথমটি হল-যদি লড়াকুদের গল্প মানুষকে বলা যায়, তাহলে সেখান থেকে মানুষ কিছু জিনিস শেখে, দেখে চলতে পারবে।

“দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল-আমরা মনে করি এই বই দিয়ে সরকার এবং প্রাইভেট অনেক উদ্যোক্তা আছে, তাদের সহায়তায় যদি ক্যান্সার ফান্ড করতে পারি, আমরা অনেক মানুষকে সাহায্য করতে পারবে।”

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সহসভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. খালেদা শাহ্ বলেন, “দেশে সবার জন্য সুলভে আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমাজের সবার অংশগ্রহণে একটি ‘জাতীয় ক্যান্সার তহবিল’ গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।”

সবাইকে ক্যান্সার প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে চিকিৎসক ও লেখক অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী বলেন, “ক্যান্সার লড়াকুদের নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করলে তা অত্যন্ত কার্যকর হয় বলে বিভিন্ন সার্ভাইভার গ্রুপ গড়ে তোলা জরুরি।”

তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ বয়স নির্বিশেষে সবার জন্য উন্নতমানের ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা ও ল্যাব গড়ে তোলার গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ক্যান্সার লড়াকু ডা. সারওয়ার আলী নিজের মুখগহ্বরের ক্যান্সার মোকাবিলার দিনগুলোর কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “দেশে সব ধরনের ক্যান্সারের মানসম্মত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা গড়ে তোলা এবং পুরো সমাজকে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।”

চিকিৎসকদের রোগীদের কথা শোনা ও রোগীদের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে রোগীর সন্তুষ্টির দিকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান তার।

ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, “ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ছে না। যারা সুস্থ, তাদের জীবনেও ক্যান্সার আঘাত করতে পারে। সুতরাং সবারই ক্যান্সার প্রতিরোধের সংগ্রামে সামিল হতে হবে।”

আলোচনায় রোকেয়া পদকজয়ী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হালিদা হানুম বলেন, “দেশে নারীদের ক্যান্সার প্রতিরোধে পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও ভূমিকা রয়েছে। নারী অঙ্গের ক্যান্সার নিয়ে কেবল নারীদেরই নয় পুরুষদেরও ধারণা থাকা, সচতেন করা প্রয়োজন। কারণ এখনও আমাদের দেশের নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ ক্ষমতায়িত হয়নি।”

সিসিসিএফ এর সাধারণ সম্পাদক জাহান ই গুলশান এর সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন ক্যান্সার লড়াকু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এস এম শহীদুল্লাহ।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আকমল হোসেন, কবি হাসান ফকরি, মসিহউদ্দিন শাকের উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ৭ দফা প্রস্তাব নিয়ে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এগুলো হল-

>> জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বয়স নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য সুলভে মানসম্পন্ন সর্বাধুনিক এবং পর্যাপ্ত ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা গড়ে তোলা। যেখানে রোগী এবং তার স্বজনদের সন্তুষ্টি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।

>> দেশে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমাজের সবার অংশগ্রহণে একটি 'জাতীয় ক্যান্সার তহবিল' গঠন করা।

>> প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার প্রতিরোধের লক্ষ্যে কমিনিউটি পর্যায়ে বিস্তৃত পরিসরে ক্যান্সার স্ক্রিনিং এর সুব্যবস্থা গড়ে তোলা।

>> দেশের প্রতিটি হাসপাতালে ক্যান্সার কাউন্সিলিংয়ের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পেশাদার ক্যান্সার কাউন্সিলর নিয়োগ দেওয়া।

>> ক্যান্সারাক্রান্তদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার খরচ সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা।

>> ক্যান্সার চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সমাজের সকলে সহযোগী হওয়া। সেরে ওঠাদের পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

>> সব ধরনের প্রচার মাধ্যমে ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাবার, পণ্য সামগ্রীর প্রচার বন্ধ করা। একইসঙ্গে ক্যান্সার সম্পর্কে সচেনতা বাড়াতে সংবাদমাধ্যমের আরও ভূমিকা রাখা।