চিকিৎসকরা বলছেন, এবার যারা মারা গেছেন ডেঙ্গুতে, তাদের অধিকাংশই দ্বিতীয়বার আক্রান্ত।
Published : 07 Jul 2023, 01:50 AM
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ১ জুলাই মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মাদারটেকের শাহিনূর আক্তার। গত জানুয়ারিতেও একই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।
তারর স্বামী আল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্তের পর বাসায় থেকেই চিকিৎসা করিয়েছিলাম। কিন্তু এবার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে।
“আগের বার এমন বমি হয়নি। এবার যাই খায় বমি করে ফেলে। প্রস্রাব এবং পায়খানার রাস্তায় দিয়েও রক্ত যাচ্ছে। প্লাটিলেট কমে ১৬ হাজারে নেমেছে। খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছে।”
ওই ওয়ার্ডে ভর্তি নাসিমা ও সুমাইয়া নামে আরও দুই নারী আগেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তারা জানতেন না। আইজিজি পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা বিষয়টি জানতে পারেন।
সুমাইয়ার স্বামী সুলতান উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে তো জ্বর হয়েছিল। কিন্তু আমরা সে সময় বুঝতে পারিনি তার ডেঙ্গু। পরীক্ষার পর আজকে জানতে পারলাম। শরীরটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। এজন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।”
বর্ষা আসার আগেই শত শত রোগীর হাসপাতাল ভিড়, ৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ছড়াচ্ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। চিকিৎসকরা রোগীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কেউ যদি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে এবার বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে ডেন টু ও ডেন থ্রির রোগী। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রথমবার ডেন ওয়ানে আক্রান্ত হয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে সেটি ডেন টু বা থ্রি প্রতিরোধে কাজ করে না।
কাজেই দ্বিতীয়বার আক্রান্ত সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আশঙ্কার কথা হল, যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যারা মারা গেছেন, তাদের একটি বড় অংশই দ্বিতীয়বার ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। তৃতীয়বার সংক্রমিত হওয়ার ঘটনাও আছে।
যে কারণে ঝুঁকি বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন হাসপাতালে যে রোগী আসছে তাদের অনেকেই দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন ডেঙ্গুর ভাইরাসের একটি ধরন প্রথমবার শরীরে আক্রমণ করে তখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু দ্বিতীয়বার অন্য ধরন আক্রমণ করলে সেটা তা প্রতিরোধ করতে পারে না।
“ধরুন আপনি প্রথমবার ডেন-ওয়ানে আক্রান্ত হলেন, শরীরে ওই ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আছে। দ্বিতীয়বার যদি আপনি ডেন-টু আক্রান্ত হন, তাহলে সেটা নিরাপত্তা দেয় না। আবার ডেন-ওয়ানে সংবেদনশীল থাকাতে ডেন-টু দিয়ে যদি আক্রান্ত হয় তাহলে সেটা তাকে প্রতিরোধ দেবে না, কিন্তু অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া করবে। অতিমাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরি করতে গিয়ে এত প্রতিক্রিয়া হয় যে রোগীর প্লাজমা লিকেজ হয় এবং শকে চলে যায়।”
তিনি বলেন, এখন আক্রান্তদের পরীক্ষা করলে অনেকেই দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। তাদের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে।
“আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পাই অনেকেরই আইজিজি পজিটিভ। আগের মতো পাঁচ-সাতদিন পর শকে যাবে এমন হচ্ছে না। দুই-তিনদিনের মাথায় প্রেসার কমে যায়, খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি কুমিল্লার বুড়িচং উপেজলার শফিকুল ইসলাম ২০১৮ সালেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও খুব বেশি কষ্ট হয়নি। কিন্তু এবার খুব দুর্বল হয়ে পড়েছি?”
দ্বিতীয়বার শরীরে কোনো বিশেষ সমস্যা হচ্ছে কি না- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “জ্বর হওয়ার পর আগেরবার যেমন ছিল ওই রকমই লাগতেছিল। উপজেলায় গেলে তারা টেস্ট কইরা জানাইল ডেঙ্গু হইছিল।
“শরীর খুবই খারাপ, ১০ মিনিট শুয়ে থাকতে পারি না, আবার ১০ মিনিট শুয়ে থাকতে পারি না। হাত-পা, বুক ব্যথা করে। প্লাটিলেট কমে গেছিল অনেক। তবে এখন ভালো আছি।”
দ্বিতীয়বার আক্রান্ত ব্যক্তির ঝুঁকির ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল বলেন, “যদি কেউ প্রথমবার ডেন-ওয়ানে আক্রান্ত হয়, তার গায়ে ব্যথা হবে, সামান্য উপসর্গ হবে। কিন্তু যদি তিনি দ্বিতীয়বার ডেন টু বা ডেন থ্রি দিয়ে আক্রান্ত হন, তাহলে অন্য অনেক সমস্যা দেখা দেবে।
“ডেঙ্গুর আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে কেউ প্রথমবার আক্রান্ত হলে অবস্থা এত গুরুতর হয় না। দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার হলে সিভিয়ারিটি অনেক বেশি।”
এ বছর যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাদের ডেথ রিভিউয়ের কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মৃতদের তবে লক্ষণ-উপসর্গ দেখে তারা মনে করছেন মৃতদের বেশিরভাগই দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
প্রকোপ বেশি ডেন টু ও থ্রিয়ের
চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর জীবাণুর চারটি ধরন - ডেন-ওয়ান, ডেন-টু, ডেন-থ্রি এবং ডেন-ফোর এ রোগীরা আক্রান্ত হন।
অন্তত ২০০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর দেখেছেআক্রান্তদের ৬২ শতাংশ ডেন-টু এবং ৩৮ শতাংশ ডেন-থ্রিতে আক্রান্ত হয়েছে।
অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “গত ২০-২৫ বছরে বাংলাদেশে কত মানুষের ডেঙ্গু হয়ে গেছে এর সঠিক তথ্য নেই। কারণ, অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু রোগ নির্ণয় করা হয়নি। অনেকে চিকিৎসকের কাছেই যাননি। ফলে প্রকৃত সংখ্যাটা অনেক বেশি। এ কারণে এবার যত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবেন, তাদের অনেকেই দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবেন।”
এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ১১৬ জন, মৃত্যু হয়েছে ৬৪ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি ঢাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এইডিস মশার উপস্থিতি নিয়ে যে জরিপ করেছে তাতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় চলমান ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গত কয়েক বছর ধরেই রোগটিকে বড় শহরের পাশাপাশি মফস্বল শহর এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বাংলাদেশে ষাটের দশকে দেশে প্রথম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও রোগটি বেশি ছড়াচ্ছে ২০০০ সাল থেকে।
২০২২ সাল পর্যন্ত হিসাবে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৪৮ জন রোগী। এর মধ্যে শেষ পাঁচ বছরেই ভর্তি হন ২ লাখ ৩ হাজারের বেশি। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হননি তারা এই হিসাবে আসেনি।
ঢাকায় এইডিস মশার বিস্তার ৫ বছরে এবারই বেশি
এ বছর ডেঙ্গু রোগী ১১ হাজার ছাড়াল
ডেঙ্গু থাকছে সারা বছর, বাঁচতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: ড. কবিরুল বাশার