শিশুদের হ্যান্ড ফুট মাউথ কতটা শঙ্কার, কী করতে হবে

অতিরিক্ত ছোঁয়াচে এ রোগ সহজেই সেরে যায়; আরও বেশি যাতে না ছড়ায় সেদিকেই বেশি নজর দেওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের।

ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Sept 2022, 12:08 PM
Updated : 10 Sept 2022, 12:08 PM

শিশুদের বিশেষ করে তিন থেকে সাত বয়সীদের হাত, পা ও মুখে ফুসকুড়ির মতো একটি রোগ নিয়ে ঢাকায় অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন, স্কুলে স্কুলে নেওয়া হয়েছে সতকর্তা। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, অতি সংক্রামক এ ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও ভয়ের কিছু নেই।

হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথ নামের ভাইরাসজনিত এ রোগ কয়েকদিনের মধ্যেই সেরে যায় জানিয়ে তারা ছোঁয়াচে এ রোগ প্রতিরোধের উপর জোর দিয়েছেন বেশি। আক্রান্ত শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় আলাদা পরিচর্যার কথা বলেছেন, আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাসহ আরও কয়েকজন চিকিৎসক।

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের শিশুদের হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়তে দেখা গেছে। অতি সংক্রামক রোগটি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা থাকায় একটি স্কুল দুদিন বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যান্য স্কুলেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা।

শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে এ রোগ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা গত কয়েকদিনে অনেক বাড়ার তথ্য মিলেছে। তবে এটি ‘গুরুতর বা প্রাণঘাতী’ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ছে না। এজন্য রোগটি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, স্কুলের শিশুদের মধ্যে হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথ হওয়ার বিষয়টি তারা জেনেছেন আরও সপ্তাহখানেক আগে। রোগটি নিয়ে বিস্তারিত জানতে আইইডিসিআরকে বলা হয়েছে। অধিদপ্তরও কাজ করছে এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ‘কোনো উপায় বের করা যায় কি না’ সে চেষ্টা চলছে।

চিকিৎসকরা জানান, কক্সেকিভাইরাস নামের একটি ভাইরাসের আক্রমণে এ রোগ হয়। রোগ হলে শুরুতে শিশুর জ্বর কিংবা অস্বস্তির ভাব হয়। দুই-তিন দিনের মধ্যে হাত, পা, হাঁটু ও মুখে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শরীরে ব্যাথা হয়। অনেক শিশুর মুখের ভেতর তালুতে ঘা হয়। এতে শিশুরা খেতে পারে না। অনেকের জ্বর হয় না। ফুসকুড়ি সাধারণত এক সপ্তাহ থাকে, এরপর সেরে যায়।

এক থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এ রোগ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি হয় তিন থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের বলে জানান চিকিৎসকরা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমণ্ডিতে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সহিদুল্লা এর ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে দেখা গেছে, হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথ রোগে আক্রান্ত কয়েকজন শিশুকে নিয়ে এসেছেন অভিভাবকরা।

তাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর হাতে, মুখে ফুসকুড়ি হয়েছে। তার বাবা বলেন, ওই স্কুলের দুজন শিশুর রোগটি হয়েছে জানার পর গত রোববার থেকে ছেলেকে স্কুলে পাঠাননি। তবে বুধবার রাতে জ্বর আসে। পরদিন সকাল থেকেই শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।

“তার লক্ষণ খুব বেশি না। কিন্তু র‌্যাশ পড়েছে হাতে, মুখে। সতর্কতা হিসেবে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসলাম।”

রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকা থেকে দুই বছরের এক শিশুকে নিয়ে এসেছেন তার মা-বাবা।

তার মা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার ছয় বছর বয়সী বড় মেয়ে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ে। তার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন কি না বুঝতে পারছি না।

“মেয়েটিরও জ্বর হয়েছে। এছাড়া শরীরের হাঁটুতে, কনুইয়ে এবং পেছনে ফুসকুড়ি হয়েছে। আমাদের পরিচিত কয়েকজনের বাচ্চার এই অসুখ হয়েছে বলে শুনেছি।”

লালমাটিয়ার একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে এসেছেন তার বাবা-মা। ওই শিক্ষার্থীর উদ্বিগ্ন মা জানান, যেসব বাচ্চাদের এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে তাতের স্কুলে না পাঠাতে বলা হয়েছে।

তবে অসুস্থ্ হলেও তা গোপন করে অনেক বাচ্চা স্কুলে আসছে বলে জানিয়েছেন এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। নামপ্রকাশ না করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, গত বুধবার স্কুল কর্তৃপক্ষ কয়েকজন শিশুকে পরীক্ষা করেছে, তার মধ্যে দুজনের শরীরে রোগটি ছিল।

রাজধানীর এ জি চার্চ স্কুলের সেক্রেটারি শিলা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ওই স্কুলের ছয়জন শিক্ষার্থীর এই রোগটি হয়েছিল। ফলে ইংরেজি মাধ্যমে দুদিন ছুটি দেওয়া হয়। এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে স্কুলে আসতে বারণ করা হয়।

তিনি বলনে, “যে বাচ্চাদের রোগটি হয়েছে তারা ভুলক্রমে স্কুলে চলে এসেছিল। ফলে স্কুল ছুটি দিয়েছিলাম। আমরা পুরো স্কুল ক্লিন করেছি। আর চিকিৎসকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলেছি। ওই ছয় জনের পর নতুন করে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি আমাদের স্কুলে। চিকিৎসকরা বলেছেন, সুস্থ্ হয়ে গেলে ১০ দিন পর স্কুলে আসতে পারবে, কিওর হয়ে গেলে ওই বাচ্চারাও স্কুলে আসতে পারবে।”

অধ্যাপক সহিদুল্লা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে ডটকমকে জানান, তার চেম্বারে প্রতিদিনই আট থেকে ১০ জন শিশু আসছে এই রোগ নিয়ে।

তিনি বলেন, ভাইরাস আক্রান্তের দুই থেকে তিনদিন পর হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। জ্বর হয়, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়, অসুস্থ্ বোধ করে এবং হাতে, পায়ে, শরীরের পেছন দিকে ও মুখের মধ্যে ফুসকুড়ি হয়। এজন্যই এই রোগের এই নাম। যেখানে ফুসকুড়ি হয় ওই জায়গাটি ব্যথা করে। মুখে হলে শিশুরা খেতে পারে না সহজে।

রোগটি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “চার পাঁচদিন পর বাচ্চাদের শরীরে আর ওই রোগ থাকে না, ভালো হয়ে যায়। আর যে ফুসকুড়ি হয় তার কোনো দাগও শরীরে থাকে না। এই রোগের কোনো টিকা নেই। আক্রান্ত হলে এরজন্য আলাদা কোনো চিকিৎসা নেই। ফলে জ্বরসহ অন্যান্য উপসর্গ দেখে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। প্যারাসিটামল দিই, চুলকানির জন্য এলার্জির ওষুধ দিই।”

রোগটি খুব দ্রুত একজনের কাছ থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায়। কোনো বাচ্চার হলে অনেক সময় দুয়েকদিন অভিভাবকরা বুঝতে পারেন না বলে জানান তিনি।

“না বোঝার ফলে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠান। তখন তার কাছ থেকে অন্য বাচ্চাদের হয়। তাদের মাধ্যমে আরও অনেক বাচ্চার শরীরে হয়। এই রোগের বিস্তার সহজে ঠেকানো যাবে না। ফলে এটার বিষয়ে কোনো অ্যাকশনে যাওয়ার মতো না। প্রথম শর্ত হলো সতর্ক থাকা,” যোগ করেন তিনি।

ঢাকা শিশু হাসপাতালেও প্রতিদিন হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথের লক্ষণ নিয়ে শিশুরা আসছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, এ ধরনের শিশুদের হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

“যে লক্ষণ উপসর্গ তাতে হাসপাতালে ভর্তির কোনো প্রয়োজন পড়ছে না। তবে এটি হলে শিশুরা যেহেতু অস্বস্তি বোধ করে এজন্য সতর্ক থাকা দরকার। কারও এই অসুখ হলে স্কুলে পাঠানো যাবে না।”

যেভাবে ছড়ায়, প্রতিকার কী

এই রোগের জন্য কক্সেকিভাইরাস দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রে কক্সেকিভাইরাস এ১৬ এই রোগটি ছড়ানোর জন্য দায়ী। এছাড়া কক্সেকিভাইরাস এ৬ ও রোগটি ছড়াতে পারে, এই ধরনে আক্রান্ত হলে লক্ষণগুলো আরও গুরুতর হয়। পুর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় কক্সেকিভাইরাইরাসের সঙ্গে এন্টারোভাইরাস৭১ (ইভি-এ৭১) যুক্ত হয়ে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বলছে, হ্যান্ড, ফুট, অ্যান্ড মাউথ রোগটি খুব দ্রুত অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে। আক্রান্ত শিশুর নাক, মুখ ও গলা থেকে নিঃসৃত লালা ও শ্লেষ্মা, আক্রান্তের শরীরের ফোস্কা এবং মল থেকেও এই রোগের ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

আক্রান্ত শিশুর হাঁচি বা কাশির সঙ্গে আসা জলীয় ফোঁটা সরাসরি এসে পড়লে, আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শ যেমন চুমু দেওয়া, জড়িয়ে ধরা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ানো হয় এমন জিনিসপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে, শিশুর মুখ স্পর্শ করলে যেমন ডায়াপার পরিবর্তন করে ওই হাত দিয়ে নাক, চোখ বা মুখ স্পর্শ করলে। হ্যান্ড, ফুট, অ্যান্ড মাউথ ভাইরাস রয়েছে এমন বস্তু যেমন দরকার হাতল বা খেলনা ধরে সেই হাতে নাক, মুখ ও চোখে স্পর্শের মাধ্যমে এ্ই ভাইরাস ছড়ায়।

এই রোগ থেকে বাঁচতে হাঁচি-কাশি দেওয়ার পর, শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করার পর এবং টয়লেট থেকে ফিরে এবং আক্রান্ত কারো যত্ন নেওয়ার আগে ও পরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। সাবান না থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের হাত ধোয়ার সময় সহযোগিতা করতে হবে। হাত দিয়ে নাক, মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

হ্যান্ড-ফুট, অ্যান্ড মাউথ রোগে আক্রান্ত শিশুকে বাড়িতে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখতে হবে কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেহেতু আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে ছড়ায় তাই আলাদা রাখতে পারলে ভালো। কিন্তু শিশুদের জন্য এটা খুব কঠিন, সেক্ষেত্রে তার মাধ্যমে যেন অন্য কেউ আক্রান্ত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক