Published : 26 May 2026, 11:46 PM
ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে ছুটছে মানুষ; এই আনন্দযাত্রায় শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ আরো বেড়ে যায় কি না, সেই শঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাম আক্রান্ত কোনো শিশু বাইরে থাকলে বা রাস্তায় থাকলে আশেপাশের অনেকের মধ্যে হামের জিবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে।
“তাই বর্তমানে কারো শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ থাকলে তার ঈদযাত্রায় বের না হওয়াই ভালো। কারণ এর মাধ্যমে আরো শিশুদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে।”
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৬৬ হাজার শিশু; মৃত্যু ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচশ।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মঙ্গলবারও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৯৬৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল।
হাম মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্যুর খবরে সবাই আতঙ্কিত।
এদিকে ঈদযাত্রার এই সময়ে হামের ব্যাপারে কোনো সতর্কবার্তা না থাকায় সরকারের সমালোচনা করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হাম প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার ‘অনেক আগে থেকেই’ তারা করে আসছে। ঈদযাত্রার বিষয়ে বিশেষ কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, কারণ তাতে আতঙ্ক ছড়াতে পারে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ধারণা অনুযায়ী, ১ কোটি থেকে ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষ এবার ঈদে ঈদ উদযাপন করতে ঢাকা ছাড়বেন।
আর হামের ভাইরাস যেহেতু হাঁচি, কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংক্রমণের পার লক্ষণ দেখা দিতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় নেয়, সেহেতু ঈদযাত্রার পথে শিশুদের মধ্যে এ রোগের বিস্তার বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন।
হাম মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচির মূল অংশ গত ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
তবে টিকা না পাওয়া শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসতে এখনো টিকাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে।
ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, হামের টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে। তাই টিকা নেওয়ার পরও প্রায় এক মাস শিশুদের সতর্কভাবে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গত ২০ মে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ঈদযাত্রার ভিড় শুরু হয়েছে। ফলে হামের সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, “এসব বিবেচনা করে এবার ঈদযাত্রা কিছুটা স্বল্প পরিসরে হওয়া উচিত ছিল।”
ঈদযাত্রার আগে হাম নিয়ে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা না দেওয়াকে ‘উদাসীনতা’ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।
তিনি বলেন, “ঈদের মধ্যে হাম বাড়তে পারে। কারণ অনেকেই গ্রামে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে শিশুরা হামে আক্রান্ত হতে পারে। আর ঢাকার বাইরে সেভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভালো নেই, তাই শিশুদের মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে।”
তাছাড়া শুরুর দিকে শিশুদের মধ্যে টিকার কার্যকারিতা কম থাকে জানিয়ে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, মায়ের দুধ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর জীবনের শুরুর দিকে টিকার কার্যকারিতায় কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
“এ কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হামের টিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। যেমন শিশুর বয়স ৬ মাসে কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ, ৯ মাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ, ১২ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশ, ১৫ মাসের বেশি বয়সে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ৪–৬ বছর (প্রাক-প্রাথমিক স্কুলগামী বয়স) এ প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সাধারণত সংক্রমণের ১০-১৪ দিনের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হল উচ্চ জ্বর, সর্দি ও কাশি, চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ। ফুসকুড়ি সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মত গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে হামে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার ও জ্বর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হামের উপসর্গ ও লক্ষণ আছে এমন শিশুদের ঈদযাত্রার এই সময়ে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের মধ্যে শহরের শিশুরা গ্রামে গিয়ে হামে আক্রান্ত হতে পারে আবার হামে আক্রান্ত শিশু গ্রামে গিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারে।
“সেরকম হলে হাম সংক্রমণের যে সর্বোচ্চ পর্যায় চলছে, তা আরো প্রলম্বিত হতে পারে।”
তিনি বলেন, “হামের লক্ষণ আছে এমন শিশুদের আলাদা করে রাখতে হবে। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং হাঁচি-কাশির সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সব মিলিয়ে যত জনসমাগম এড়িয়ে চলা যায়।’’
মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ঈদের সময় হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের নিয়ে একেবারে কোথাও যাওয়া উচিত না, কারণ হাম এত বেশি সংক্রমক, যে সুস্থ শিশুদের মধ্যে তা দ্রুতই ছড়িয়ে যেতে পারে।
ঈদযাত্রার মৌসুমে হাম নিয়ে আলাদা করে নির্দেশনা না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা হাম মোকাবিলায় ঈদের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছি। আরো আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় প্রচার করেছি।
“তবে বর্তমান ঈদযাত্রার বিষয়ে সেভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কারণ এর ফলে আরো কোনো ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় কিনা তাই।”
মহাপরিচালক দাবি করেন, হামের লক্ষণ থাকলে যতটা সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলার বিষয়টি ‘দেশের প্রায় সব মানুষই’ জানেন।
“কিন্তু এসব বিষয় জানার পরও উপেক্ষা করলে পরিস্থিতি খারাপর হওয়ার সম্ভবনা থেকেই যায়।”