Published : 28 Nov 2025, 12:33 PM
ফিরোজা বেগম, নিনা হামিদ, ফেরদৌসী রহমান, বশির আহমেদ থেকে শুরু করে দেশের সংগীতাঙ্গনের কিংবদন্তীদের একসঙ্গে পাওয়া গেছে একটি সাদাকালো ছবিতে।
শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের স্টুডিওতে তোলা দুর্লভ সেই ছবির অনেকেই এখন পৃথিবীতেই আর নেই, কিন্তু ছবিটি আছে। তারকাখচিত মুহূর্তটি সবার সামনে এনেছেন প্রয়াত বরেণ্য সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবীর মেয়ে ফাহমিদা নবী। এক ঝাঁক শিল্পীর মধ্যে ওই ছবিতে আছেন মাহমুদুন্নবীও।
ফেইসবুকে ছবিটি পোস্ট করে ফাহমিদা শিরোনামে লিখেছেন, “যে ছবি কথা বলে, সোনালী দিনের।”
ছবির পেছনের গল্প জানতে ফাহমিদা নবীর সঙ্গে কথা হয় গ্লিটজের।
তিনি বলেন, “ষাটের দশকে শাহবাগে বাংলাদেশ বেতারে তোলা ছবিটি। এই ছবিটা সম্ভবত কোনো অনুষ্ঠানের, যেদিন এত শিল্পী একসাথে হয়েছিলেন। সেসময় ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে শাহবাগ রেডিওতে অনুষ্ঠান যেতাম। কী সুন্দর ছিল রেডিও স্টেশনটা! লনে লাইটিং হত, বিশেষ দিনে বড় বড় পার্টি হত।”
ছবিতে আছেন বাংলা গানের বহু উজ্জ্বল মুখ। হাসিনা মনতাজ, জীনাত রেহানা, আঞ্জুমান আরা বেগম, লায়লা আর্জুমান্দ বানু, ফওজিয়া ইয়াসমিন, ফিরোজা বেগম, নিনা হামিদ, ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুর রউফ।
আরও আছেন মাহমুদুন্নবী, শওকত হায়াত খান, সৈয়দ আব্দুল হাদী, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিক, বশির আহমেদ, আনোয়ার উদ্দিন খান, এম এ হামিদ, আশফাকুর রহমান খান, ওস্তাদ ইয়াসিন খানসহ অনেকে।
ছবিটি কোন দিনে তোলা জানতে চাইলে ফাহমিদা নবী বলেন, “এই ছবিটা ঠিক কোন দিনের পুরোপুরি তা মনে করতে পারছি না। তবে ঈদ পূর্নমিলনী বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের। ছোটবেলায় দেখেছি যখন সবাই সম্মিলিত সংগীত করতেন, তখন সবাই একই রকমের পাঞ্জাবি পড়তেন। সেই কোনো একটা সময়ের হবে হয়ত ছবিটা।”

ফাহমিদা নবী জানিয়েছেন, তখন তার বয়স পাঁচ-ছয় বছর হবে। ছোট বোন সামিনা চৌধুরীর তখন মাত্র জন্ম হয়েছে। বাবার হাত ধরে সে সময় তিনি শিল্পীদের আড্ডা আর গানের অনুষ্ঠানে যেতেন।
এই ছবিটি ফাহমিদা নবী পেয়েছে শিল্পী জীনাত রেহানার কাছ থেকে।
ফাহমিদা নবী বললেন, “চাচি ছবিটা পাঠিয়ে বলেছিলেন ‘দেখ, তোর বাবাকে দেখ, আমাদের সবাইকে দেখ, আমরা কত ভালো ছিলাম।’ উনার কণ্ঠে তখন কান্না ছিল, মায়া ছিল। মনে হচ্ছিল এই ছবির দিকে তাকিয়ে অতীত যেন হাত ছুঁয়েছেন তিনি। আমাকে বারবার বলেছেন, ‘আমরা সবাই কত ভালো ছিলাম। কত খুশি ছিলাম সবাই’।”
ষাটের দশকে এই ছবিটি তুলেছিলেন লুৎফর রহমান। সংগ্রহ করে রেখেছিলেন তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু। ফাহমিদা নবীর চোখে সাদাকালো এই ছবিটি আগেকার দিনের শিল্পীদের মেলবন্ধনের প্রতিচ্ছবি।
“এতো সাধারণ, অথচ কত বিশেষ! সবাই তাকিয়ে হাসছে,কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই অহমিকা। এখনকার দিনে শিল্পীদের এমন এক ফ্রেম পাওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে গেছে।”
ফাহমিদা নবী বললেন, তার বাবার সময়ে তাদের বাসায় শিল্পীদের পদচারণা ছিল খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। শিল্পীদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে আত্মীয়তার সম্পর্কে। একই পাড়ায় থাকতেন অনেকে।

সেই স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, “আমাদের বাসা ছিল শিল্পীদের ঘর। ছোট থেকে দেখেছি, আমাদের বাসায় সব শিল্পীরা আসতেন। আম্মা রান্না করতেন, খাওয়াতেন। এটা একদম আমাদের পরিবার ছিল, জন্মদিনে সবাই আসত। অনেক শিল্পী পাশের পাড়াতেই থাকতেন। আমাদের সারাটা দিন কেটে যেত শিল্পীদের মাঝেই। মোবাইল ছিল না। যে কোনো দরকারে সরাসরি বাসায় এসে জানাতেন।”
এখনকার শিল্পীদের ‘একত্রিত করা যায় না’ মন্তব্য করে হতাশা প্রকাশ করেছেন ফাহমিদা নবী।
তিনি বলেন, “এখনকার মত এত ব্যস্ততা তখনকার শিল্পীদের ছিল না। এখন সবাই সবার মত। ডাকলেও সবাইকে একসাথে পাওয়া যায় না। আগে কোনো অনুষ্ঠানে গান ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা হত না। এখন নানান ধরনের আলাপ হয়। বলতে খারাপ লাগে কিন্তু সেই সময়ের যে চিত্র এখনকার শিল্পীদের আর নেই। ”
ফাহমিদা নবী তার ইউটিউব চ্যানেলে এখন নিয়মিত গান প্রকাশ করে যাচ্ছেন। ‘ফাহমিদা নবী’ নামের চ্যানেলটিতে গেল অগাস্টে প্রকাশ্যে এসেছে এই শিল্পীর গান ‘মেঘলা আকাশ’।
জুনে তিনি প্রকাশ করেছেন গজল আঙ্গিকের গান 'একজন তুমি খুঁজছি'। এর আগে জানুয়ারিতে এসেছিল এই শিল্পীর ‘কাছের মানুষ’ গান।
শিগগিরই নতুন আরও দুইটি গান প্রকাশ পাবে বলে জানিয়েছেন এই শিল্পী। এর মধ্যে একটি গানের কথা ও সুর করেছেন ফাহমিদা নবী নিজেই।
এই শিল্পীর অ্যালবামগুলোর মধ্যে আছে ‘এক মুঠো গান’, ‘এক মুঠো গান-২’, ‘দুপুরে একলা পাখি’, ‘তুমি কি সেই তুমি’, ‘মনে কি পড়ে না’, ‘চারটা দেয়াল হঠাৎ খেয়াল’, ‘তবু বৃষ্টি চাই’, ‘ইচ্ছে হয়’, ‘আমারে ছুঁয়েছিলে’ (নজরুলগীতি), ‘তুমি অভিমানে’ সহ আরও কিছু গান।