শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান থাকার সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধকে ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে’ বিজয় মাস শুরু করা হয় বলে জামিল আহমেদের ভাষ্য।
Published : 15 Dec 2024, 10:29 PM
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরজুড়ে নানা আয়োজন সাজিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি; সেই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিসেম্বরের উৎসব’, যা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
গত বছরও ডিসেম্বর মাসজুড়ে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনের শিরোনাম ছিল ‘বিজয়ের উৎসব’। তাহলে এবারের আয়োজন কেন ‘ডিসেম্বরের উৎসব’ নাম পেল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তাদের কেউ কেউ বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে’ শিল্পকলার উৎসবের এবার এমন নামকরণ।
কেউ কেউ আবার একে দেখছেন ‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান থেকে বাদ পড়া, ৭ মার্চ জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে বাদ পড়ার ‘ধারাবাহিকতা’ হিসেবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন ফেইসবুকে লিখেছেন- “বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি! ডিসেম্বর উৎসব কি জিনিস রে ভাই? ডিসেম্বরের বিজয় উৎসব কোথায় গেল? কার কাছে জানতে চাইব? কে দেবে উত্তর?”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ সম্পর্কে আমার যে ধারণা, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোনো কিছু করবেন বলে মনে করি না। তবে শিল্পকলার মাসব্যাপী এই আয়োজনের শিরোনামে কেন ‘বিজয়’ শব্দটা নাই, তা আমারও প্রশ্ন।”
শিল্পকলার মাসব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় যে বৈচিত্র্য তুলে ধরা হচ্ছে, তার প্রশংসাও করেন আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেন, “মাসব্যাপী যে অনুষ্ঠানমালা, তাতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির নানা ধারার বিষয়টি এসেছে, এটি ভালো। এমন অনেক বিষয় এসেছে, যা আগে তেমন গুরুত্ব পায়নি। ঢাকার বাইরে উৎসবের নানা কর্মসূচি সাজানো হয়েছে, এটাও খুব ভালো।
“তবে এই উৎসবের যে নামকরণ করা হয়েছে, তা প্রশ্ন তৈরি করে। এটা কি ডিসেম্বর মাসের উৎসব? নাকি এর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও আছে। এটা স্পষ্ট হয় না। শিল্পকলার উচিত, এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা।”
কী বলছেন শিল্পকলার মহাপরিচালক
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি বিগত শেখ হাসিনা সরকারের প্রসঙ্গ টানেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের আয়োজনে কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানও আছে, ১৪ ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানও আছে।
“এছাড়া মাসব্যাপী নানা অনুষ্ঠান আছে, যার প্রায় সব আয়োজনই হচ্ছে ঢাকার বাইরে। খুলনা ও বরগুনায় আমরা যাত্রা উৎসবের আয়োজন করছি। ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী না বলে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করছি। আদিবাসীদের আমাদের এই উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করছি।”
এসব নিয়ে কেউ শিল্পকলার ‘প্রশংসা করছেন না’ বলে অনুযোগ করেন মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, “কেন বিজয়ের উৎসব নামটি নেই, তা নিয়ে এত প্রশ্ন? পুরো আয়োজনে তো আমরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেই তুলে ধরছি, আদিবাসীদেরও আমাদের এই উৎসবে সম্পৃক্ত করেছি।”
যারা সমালোচনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জামিল আহমেদ বলেন, “বিজয়ের মাস কবে থেকে চালু হয়েছে? তা বলুন তো। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ও তো বিজয় উৎসব ব্যাপারটি ছিল না।”
শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান থাকার সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধকে ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে’ বিজয় মাস শুরু করা হয় বলে জামিল আহমেদের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিত করে মহানায়ক দেখানোটা এই উৎসবের উদ্দেশ্য। তারা এই উৎসবের মধ্য দিয়ে একটা ন্যারেটিভ দিতে চেয়েছে, ‘যে এক দেশ- এক নেতা’। কিন্তু আমরা বলছি বহুমতের, বহুপথের বাংলাদেশ। আমাদের পুরো আয়োজনটিতে দেখুন, ঢাকার বাইরে নানা অনুষ্ঠান করছি। সেখানে আদিবাসীদেরও যুক্ত করছি।”
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদ না থাকলে বাংলাদেশ ‘স্বাধীনই হত না’ মন্তব্য করে জামিল আহমেদ বলেন, “আওয়ামী লীগ কী তাকে মূল্যায়ন করেছে? কর্নেল তাহের অবদানের কথা আওয়ামী লীগ কখনো বলে?”
শিল্পকলার ডিসেম্বরের আয়োজনেও কী তাজউদ্দীন, কর্নেল তাহের আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে জামিল আহমেদ বলেন, “আমরা তাদের নিয়েও অনুষ্ঠান করব। দায়িত্ব নিয়েছি অল্পদিন হল, সব একসঙ্গে করতে পারছি না।
“তবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি যে নানা বৈচিত্র্যের উর্বর ভূমি, তা আমরা তুলে ধরব। তাজউদ্দীন, তাহেরকে নিয়েও আমরা আয়োজন করব। আমাদের এমন অনেক ‘নায়ক’ আছে, তাদেরকে নিয়ে আমরা আয়োজন করব। সাংস্কৃতিক নানা বৈচিত্র্য আছে, তা তুলে ধরব। একমুখি যে ন্যারেটিভ, তা থেকে বেরিয়ে বহু মত ও পথের বাংলাদেশ গড়তে হবে।”
মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভুলে যাওয়া হয়নি’ দাবি করে জামিল আহমেদ বলেন, “এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা শহীদ মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে সেমিনার করেছি।
“আসন্ন বিজয় দিবসে ‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে’ শিরোনামে পোস্টার, পেইন্টিং, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, কার্টুন প্রদর্শনী আয়োজন আছে, যা মাসব্যাপী চলবে। এছাড়া আরো নানা পরিকল্পনা আমাদের আছে।”