Published : 20 Apr 2026, 12:00 AM
জীবনের ৬০ বছর পেরিয়ে অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদের উপলব্ধি হলো, “জীবন আসলে সময় পার করার খেলা। আর সেই খেলা অর্থবহ করে তোলে সৃষ্টিশীলতা।"
অভিনেতার এই জীবনদর্শন সামনে রেখে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে হয়ে গেল ‘ছয় দশক পেরিয়ে তৌকির আহমেদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠান।
রোববার সকাল থেকে গান, নাচ, সেমিনার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মঞ্চ নাটকসহ নানা আয়োজনে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে মিলনমেলা ঘটে ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পীদের। আর এই আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন তৌকীর।
'চলতি সময় থমকে দাঁড়ায়' গান ও নৃত্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর হয় ‘আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক সেমিনার।
এতে সময়ের মূল্য, সৃজনশীলতার স্বাধীনতা ও শিল্পচর্চার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন তৌকীর আহমেদ।
তিনি বলেন, "জীবন আসলে সময় পার করার এক ধরনের খেলা। আর সেই খেলা অর্থবহ করে তোলে সৃষ্টিশীলতা। মানুষ নানা উপায়ে সময় কাটায়—খেলা দেখে, গান শুনে, চলচ্চিত্র দেখে কিংবা অলসতায়। তবে সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে সময় পার করার এই খেলাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কারণ সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করে এবং অর্জন করে এক বিশেষ মর্যাদা।"
তিনি বলেন, "মানুষের ভালোবাসা পাওয়াটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের। সেখানে আমার মনে হয় অপরকে সম্মান করার একটি বিষয় দরকার। আজকের অস্থির সমাজে আমরা সবাই যেন কাউকে সম্মান করছি না, আমরা যেন ‘টক্সিক’ হয়ে উঠছি। সেই জায়গাটি থেকে আমাদের শিল্পীদের প্রতিবাদ করা উচিত, আমাদের বলা উচিত। কারণ মানুষের সুকুমার বৃত্তিই তাকে এই কঠিন পৃথিবী থেকে রক্ষা করতে পারে। নয়তো পৃথিবী তো খুব কঠিন জায়গা।"

বর্তমান সমাজের অস্থিরতা ও মানসিক চাপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, "মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য শিল্প-সংস্কৃতি অপরিহার্য। নাটক, গান, চিত্রশিল্প কিংবা যেকোনো সৃজনশীল চর্চা মানুষকে কঠিন বাস্তবতা থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়।"
তিনি সবাইকে কোনো না কোনো শখ বা সৃজনশীল চর্চা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
সেমিনারে মামুনুর রশিদ, আবুল হায়াত, মাহফুজ আহমেদ, আফজাল হোসেন, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, গাজী রাকায়েত, আজীজুল হাকিম, কচি খন্দকার, মাসুম রেজা, আজাদ আবুল কালাম, অমিতাভ রেজা চৌধুরীসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে ‘ভিউ বাণিজ্য’ নিয়ে কথা বলেন অভিনেতা মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, "ভিউ বাণিজ্য আমাদের সর্বনাশ করেছে। সেই সর্বনাশের ফাঁদেই আমরা বসে আছি। একদিকে আমাদের শিল্পের সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংকটও চলছে। আমরা ভালো কিছু নির্মাণ করতেই পারছি না। প্রেরণাহীন একটা সময় আমরা কাটাচ্ছি।”
মামুনুর রশীদ বলেন, "এর আগেও আমাদের বারবার এই আমাদের শিল্পের সংকোচন হয়েছে, আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়েছি এবং একটা দেশে গণতান্ত্রিক বিকাশ হলে যেটা হয়, আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষ বা আমরা আরও যদি উন্নত বিশ্বের কথা ভাবি, সেখানে শিল্পীরা নিজেদের প্রকাশ করার অসংখ্য সুযোগ পায়। কিন্তু সেই সুযোগটা আমাদের জীবনে আসেনি। এর মধ্য দিয়েই আমাদের পথ চলা। এর মধ্য দিয়ে একজন তৌকীর হয়ে ওঠা, আরও অনেক অসংখ্য শিল্পীর বেড়ে ওঠা। আমি শুধু তৌকীরের কথা বলবো না, তৌকীরের সঙ্গে যারা বেড়ে উঠেছে, তাদের কথাও বলবো। তারাও কঠোর পরিশ্রম করে কিন্তু এই জায়গায় চলে এসেছে।"

অভিনেতা আফজাল হোসেন বলেন, "আজ তৌকিরকে নিয়ে অনুষ্ঠান যখন শুরু হলো, তখন আমার এক অন্যরকম অনুভূতি হয়েছে। এই যে আয়োজনটা, এটা বর্তমান সময়ের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য আয়োজন বলে আমি বিবেচনা করি। আমরা যারা অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত বা এই শিল্প সৃজন করার সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে আসলে মানসিকভাবে কি রকম করে দেখা হয় সেটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। প্রতিটি শিল্পে সৃজনশীল মানুষের নানারকম রঙ থাকে, কিন্তু যে রঙটা আকর্ষণীয়, যে রঙটা মানুষের কাছে বিক্রি হয় বেশি, সেই রঙটা উপস্থাপন করা হয়; প্রকৃত মানুষটা সবসময় রয়ে যায় বাইরে। এই যে আয়োজনটা হলো, এই আয়োজন যদি নিয়মিত চলতে থাকে, তবে শিল্পীদের যে ভূমিকা, একজন মানুষের যে গৌরবময় ভূমিকা, সেগুলো আসলে সর্বসমক্ষে আসতে পারে।"
তৌকীরকে নিয়ে আফজাল হোসেন বলেন,"আমি বয়সে বড়, অভিনেতা হিসেবে আগে অভিনয় করতে এসেছি বলে আমি অগ্রজ। তৌকির আমার অনুজপ্রতিম। কিন্তু আমি মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তৌকিরকে দেখি। আমি তাকে ঈর্ষা করি। ঈর্ষা এই কারণে করি যে, তার বিশেষ যোগ্যতা আছে, যা আমার নেই। আমি অত্যন্ত এলোমেলো একটা মানুষ, খেয়ালি মানুষ; আমার ইচ্ছে হলে এটা করি, ইচ্ছে না হলে করি না। আর তৌকির হলো সেই মানুষ, যার জীবন একটাই এবং সেই জীবনের প্রতিটি দিন অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং এলোমেলো জীবন নয়, একটা গোছানো জীবন দরকার, যাতে করে প্রত্যেকটি দিনের মূল্য আমি বোঝাতে পারি, ব্যবহার করতে পারি। সেই কারণে লক্ষ্য করি তৌকির এই বয়সে যে কাজগুলো করেছে, তা বিচিত্র এবং প্রতিটি অত্যন্ত ঈর্ষণীয়— ভাবনায়, চিন্তায়, দর্শনে।"
তৌকীরকে নিয়ে অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ বললেন, "তৌকীর ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটা জার্নি আছে। তখন আমি ছোট ছিলাম। তার সেটা মনে আছি কি না জানি না, আমার সারাজীবন মনে থাকবে। তৌকীর ভাই আমাদের অনেক তরুণদের ঠিকানা ঠিক করে দিয়েছেন। আমার বোধ তৈরি করেছেন তার কাজ দিয়ে। তৌকীর আহমেদ এত সহজে পড়া যায় না। ‘জয়যাত্রা’ যখন করলাম, তখন দেখেছি কীভাবে পরিশ্রম করতে হয়। আপনার প্রতিটা কাজ আমি দেখেছি। আমরা আপনাকে শিক্ষক হিসেবে দেখি।”
সেমিনার শেষে বিকালে জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শন করা হয় তৌকীর আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র 'অজ্ঞাতনামা'। প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে মুক্ত আলোচনা। কেউ বললেন, তার গল্প বলার ভঙ্গি নিয়ে, কেউ কথা বলেন বাস্তবতার নির্মোহ উপস্থাপনা নিয়ে। নির্মাণ নিয়েও প্রশংসায় ভরিয়েছে তৌকীরকে।
সন্ধ্যায় মঞ্চে দেখানো হয় তার নির্দেশিত ও অভিনীত নাটক 'তীর্থযাত্রী'।
দর্শকসারিতে তখন নীরবতা, মাঝে মাঝে করতালির ঢেউ, যেন এক শিল্পীর জীবনদর্শন মঞ্চে প্রতিফলিত হতে থাকে।