টাইগার নয়, হামলাকারীদের ‘নিশানায় ছিলেন সালমান’: মুম্বাই পুলিশ
হামলাকারীরা সালমান ছাড়াও অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার এবং আমির খানসহ বেশ কয়েকজন তারকার বাড়িও রেকি করেছিল।
কদিন আগে বলিউডের অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে যে গুলি ছোড়া হয়, সেই হামলা হওয়ার কথা ছিল তারকা অভিনেতা সালমান খানের উপর। তবে ‘ভাইজান’ খ্যাত অভিনেতার 'জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থার' কারণে, পরিকল্পনা বদলে ফেলেন হামলাকারীরা।
গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নির্দেশেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে মুম্বাই পুলিশ। আর হামলার উদ্দেশ্য হল ‘আতঙ্ক’ তৈরি করা। টাইগারকে লক্ষ্য করে গুলি করার দায় আগেই স্বীকার করেছে লরেন্স বিষ্ণোই।
এনডিটিভি এবং দ্য ওয়াল বলছে, টাইগারদের হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তারদের জেরায় নতুন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তাতে তদন্ত নিয়েছে নতুন মোড়।
হামলাকারীরা শুরুতে সালমানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাড়িটি রেকি করে। তারা বাড়ির বাইরে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে পরিকল্পনাটি বাতিল করে দেয়।
বাধ্য হয়েই হামলাকারীরা কম নিরাপত্তায় থাকা অন্য কোনো তারকাকে নিশানা করার নির্দেশ পায় এবং শেষ পর্যন্ত বলিউডের অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ছেলে টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় সালমানের নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। মুম্বাই পুলিশের পাশাপাশি খানের সুরক্ষার জন্য বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে।
সালমান খানের জন্য মোতায়েন করা নিরাপত্তাকর্মীদের অত্যাধুনিক সাবমেশিনগান, বিশেষ করে জার্মান অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হেক্লার অ্যান্ড কচ-এর তৈরি এমপি৫ এসডি৬ দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
হামলাকারীরা সালমান ছাড়াও অমিতাভ বচ্চন, অক্ষয় কুমার এবং আমির খানসহ বেশ কয়েকজন তারকার বাড়িও আগে থেকেই রেকি করেছিল।
যারা তুলনামূলক কম নিরাপত্তায় থাকেন, তাদেরই সহজ নিশানা হিসেবে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। এই হামলার জন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে পরিকল্পনাকারীদের দেড় লাখ রুপি দফারফা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি পুলিশের।
গ্রেপ্তার যারা
পুলিশ বলছে, মুম্বাইয়ের জুহুতে পুষ্পা নরসি গ্রাউন্ড থেকে ফুটবল ম্যাচ শেষে বেরোনোর সময় রোববার দুজন ব্যক্তিকে টাইগারের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাতে টাইগারের গাড়ি চালক এবং গাড়ির পাশে থাকা একজন অটোচালক আহত হন।
হামলাকারীদের সহযোগী তৃতীয় একজন খানিকটা দূরে তার মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। টাইগারকে লক্ষ্য করে সাত রাউন্ড গুলি চালানোর পর, তিনজন একটি বাইকে করে পালিয়ে যায় এবং জয়পুরগামী ট্রেনে ওঠার আগে আন্ধেরি পশ্চিম রেলস্টেশনের কাছে বাইকটি ফেলে রেখে যায় ।
হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা রেহান রহিসউদ্দীন (১৮) ও ফুল সিং (১৮) এবং বিহারের বেগুসরাইয়ের বাসিন্দা হৃতিক মাহতো (২২) নামে তিনজনকে সোমবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এই তিন অভিযুক্ত 'স্বীকার করেছে' যে তারা আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মুম্বাই এসেছিল।
এর পর হরিয়ানার সোনিপত থেকে সমীর নামের আরও একজনকে পুলিশ ধরেছে।
এদিকে দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল আরও চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। এই চারজন লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সক্রিয় নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। টাইগারের গাড়িতে যারা গুলি চালিয়েছিল তাদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল এই নেটওয়ার্কটি।
এই চারজন হলেন-কুনাল, সুমিত, রাধা ও ববিতা। তাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে কুনাল ও সুমিতের বাড়ি হরিয়ানার সোনিপত জেলায় আর রাধা ও ববিতা উত্তর প্রদেশের।
রাধা ও ববিতা হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উত্তর প্রদেশ থেকে বহন করে নিয়ে মুম্বাইয়ে গিয়ে কুনালের নির্দেশে সেগুলো অভিযুক্তদের হাতে তুলে দিয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনকে মুম্বাই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রটিকে উদ্ঘাটন করতে পেরেছেন তারা।
এই নিয়ে এ ঘটনায় মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হল।
হামলার ছক যেমন ছিল
হামলাকারীরা মুম্বাইয়ে বেড়াতে আসা ব্যক্তির পরিচয়ে একটি অটোরিকশা এবং একটি বাইকে করে শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন ২০ দিন ধরে।
শহরে থাকার সময় আন্ধেরি ইস্টের চার থেকে পাঁচটি হোটেল বদলেছিল তারা। পুলিশের অনুমান, নজর এড়াতেই বারবার থাকার জায়গা বদল করা হয়েছিল।
পুলিশ জেনেছে, রেকি করে তারা বুঝতে পারে যে সালমান এতটাই কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন যে, তাদের পক্ষে অভিনেতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এরপর সোশাল মিডিয়া অনুসরণ করে তারা বুঝতে পারেন টাইগার শ্রফ কোনো নিরাপত্তা বলয়ে থাকেন না। তখন তারা নিশানা বদলে ফেলেন। তারা টাইগারের সোশাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ করে তার গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকেন।
টাইগার যে ওই স্টেডিয়ামে আছেন, হামলাকারীরা সেই তথ্য পেয়েছিলেন একজন অটো রিকাশচালকের মারফতে। এর আগ ১১ অক্টোবর তারা স্টেডিয়ামের বাইরে পৌঁছান টাইগারকে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু সেদিন অভিনেতা সেখানে যাননি।
এরপর তারা অস্ত্র হাতে পান শনিবার, আর গুলি করেন রোববার। সেদিন অস্ত্রধারীরা সাতটি গুলি ছোড়েন। আরও গুলি ছোড়ার চেষ্টা করলে একটি বন্দুকে ত্রুটি দেখা দেয়। তারা পালিয়ে যান।
হামলায় দেশি-বিদেশি দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে হামলাকারীদের বিদেশি অস্ত্রটির নির্দিষ্ট মডেল বা কারিগরি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তেমন জানতে না।
টাইগারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর মুম্বাই থেকে পালানোর সময় হামলাকারীরা একটি অজ্ঞাত স্থানে দুটি অস্ত্রই ফেলে দেয়। মুম্বাই পুলিশ এখন সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
হামলার জন্য অস্ত্রধারীদের ৫০ হাজার রুপি অগ্রিম দেওয়া হয় বলেও তদন্তে এসেছে। হামলার পর বাকি ১ লাখ রুপি পরিশোধ এবং বিদেশি চাকরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় তাদের।
‘সালমানের সঙ্গে কাজ কলেই হত্যা করা হবে’
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দিন রোববারই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অডিও বার্তা সামনে আসে, যেখানে এক ব্যক্তিকে হিন্দিতে বলতে শোনা যায়, “আমি অনিল পণ্ডিত। আমি লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছোট ভাইয়ের মত।
“পুরো চলচ্চিত্র শিল্পে যেই আমাদের সাথে তাল না মিলিয়ে কাজ করবে, কিংবা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবে, তাকেই হত্যা করা হবে। এটিই প্রথম এবং শেষ সতর্কতা।”
এই অনিল পণ্ডিতই নতুন বার্তায় বলেছেন, সালমান ক্ষমা না চাইলে তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। আর অভিনেতা ক্ষমা চাইলে তাদের আর কোনও শত্রুতা থাকবে না বলেও দাবি করেছেন তিনি। পাশাপাশি, সালমানের সঙ্গে যারা যোগাযোগ রাখেন, তাদের এবং তার পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন অনিল।
ভারতের রাজস্থানের প্রভাবশালী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সালমানের বিরোধ অনেক পুরনো। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে শুটিং করতে গিয়ে সালমান খান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করেন। বিরল প্রজাতির এই হরিণকে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করে।
এরপরই সালমানের বিরুদ্ধে মামলা করে বিষ্ণোই সম্প্রদায়। এ মামলায় ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের জেলও হয় সালমানের। পরে অবশ্য জামিনে মুক্তি পান তিনি।
কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ায় বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সদস্য সন্ত্রাসী লরেন্স বিষ্ণোই সালমআনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। এরপর একাধিকবার সালমান ও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ওপর হামলার চেষ্টা করে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং।
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার আগে সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মহারাষ্ট্রের সাবেক মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীকে গুলি করে হত্যা করে বিষ্ণোই গ্যাং।
টাইগার এবং সালমান খান একসঙ্গে কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও, তাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে বলিউড প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার ‘হিরাপান্তি’ সিনেমায় প্রথম নায়ক হিসেবে টাইগার বলিউডে তার যাত্রা শুরু করেন।
শোনা যায়, সালমানই মূলত নাদিয়াদওয়ালাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন টাইগারকে সিনেমায় নেওয়ার। টাইগার শ্রফের বাবা জ্যাকি শ্রফ একাধিক চলচ্চিত্রে সালমান খানের সঙ্গে কাজ করেছেন।
