০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

মঞ্চের রবি

মঞ্চের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল শৈশবেই। কিশোর বয়সে এবং তারুণ্যে মঞ্চে অভিনয় করেছেন অনেক বার। এই অভিনয়ের সূত্রে নতুন বৌঠান কাদম্বরীর সঙ্গে বন্ধুত্বেও যোগ হয় ভিন্ন ব্যঞ্জনা - কথা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তার মঞ্চপ্রীতি নিয়ে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

শান্তা মারিয়া

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 May 2015, 01:02 PM

Updated : 25 Apr 2022, 01:20 PM

‘ভগ্ন হৃদয়’ কবিতার বইয়ের উৎসর্গ পাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘শ্রীমতি হে-কে’। নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীকে বিরলে হেমাঙ্গিনী এবং হেকেটি নামে ডাকতেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও নির্দেশিত ‘অলীকবাবু’ নাটকে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্র-কাদম্বরী। কাদম্বরী অভিনীত চরিত্রের নাম ছিল হেমাঙ্গিনী আর রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করেছিলেন অলীকবাবুর চরিত্রে।

ঠাকুরবাড়িতে পারিবারিকভাবে নাটক মঞ্চায়ন হতো। তাতে পরিবারের সদস্যরা অভিনয় করতেন এবং আত্মীয়, স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা ছিলেন সেই নাটকের দর্শক। এইসব নাটকে নিয়মিত অভিনেতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অগ্রজদের লেখা নাটকে অভিনয় করতে করতেই নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের অভিনয় প্রতিভা ছিল অসাধারণ। ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব নাটকের প্রায় সবগুলোতেই তিনি অভিনয় করেছেন। নিজের লেখা ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’, ‘বিসর্জন’, ‘রাজা-রানী’, ‘চিরকুমার সভা’য়  যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনি অভিনয় করেছেন স্বর্ণকুমারী দেবী ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা নাটকেও। সে সময় চলচ্চিত্র থাকলে হয়ত চলচ্চিত্রেও অভিনয় করতেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম গীতিকাব্য ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ মঞ্চস্থ হয় ১৮৮১ সালে। রামায়ণের মূলপ্রণেতা আদিকবি বাল্মিকীর জীবনের অংশ নিয়ে এই গীতিনাট্য। এতে বাল্মিকীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি।

অন্ধমুনির কিশোর ছেলে নদীতে গেছে জল আনতে। কলসীতে জলভরার শব্দ শুনে অরণ্যে শিকাররত রাজা দশরথ ভাবলেন বুঝি বুনো জন্তু জলপান করছে। শব্দ শুনে লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা ছিল রাজা দশরথের। তিনি তীর ছুড়লেন। কিশোর ছেলেটির বুকে বিদ্ধ হলো মরণবাণ। এদিকে দৃষ্টিহীন মুনি অপেক্ষা করছেন পাতার কুটিরে কখন তার একমাত্র সন্তান জল নিয়ে আসবে। রামায়ণের এই করুণ উপাখ্যান নিয়ে ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ লেখেন নাটক ‘কালমৃগয়া’। এই নাটকে অন্ধ বৃদ্ধ মুনির চরিত্রে অভিনয় করেন যুবক রবীন্দ্রনাথ।

ত্রিপুরার রাজবংশের প্রাচীন ইতিহাস অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘বিসর্জন’| নাটকটি ঠাকুরবাড়ির মঞ্চে অভিনীত হয়। ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য ১৮৯০ সালে যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে আসেন তখন তাঁর সম্মানে এই নাটক আবার মঞ্চস্থ হয়। বৃদ্ধ পুরোহিত রঘুপতির ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেন যুবক রবীন্দ্রনাথ। এর অনেক পরে ১৯২৩ সালে বৃদ্ধবয়সে এই নাটকে যুবক জয়চন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করে সবাইকে বিস্মিত করেন তিনি।

১৮৮৯ সালে ‘রাজা-রাণী’ নাটকে বিক্রমদেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।রবীন্দ্রনাথের লেখা অনেক নাটক কলকাতার সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়েছে। ক্ল্যাসিক থিয়েটারে ‘রাজারাণী’, ‘বিসর্জন’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। মিনার্ভা ও স্টারেও তার নাটক অভিনীত হয়।

রবীন্দ্রনাথ তার লেখা নাটকের মহড়ায় অনেক সময় উপস্থিত থাকতেন,কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজে নির্দেশনাও দিতেন। পারিবারিক মঞ্চে অনেক সময়ই নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। নিজের লেখা নাটকে সাধারণত তিনি নিজেই নির্দেশকের ভূমিকায় থাকতেন, পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন। ১৮৯৭ সালে হাস্যরসাত্বক নাটক ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’তে কেদার চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেন তিনি।

শান্তিনিতেন প্রতিষ্ঠার পর রবীন্দ্রনাথ অনেক নাটক লেখেন। এই সময়ে তার লেখা উল্লেখযোগ্য নাটক হলো ‘শারদোৎসব’ (১৯০৮), ‘রাজা ’(১৯১০), ‘ডাকঘর’ (১৯১২), ‘অচলায়তন’ (১৯১২), ‘ফাল্গুনী’ (১৯১৬), ‘মুক্তধারা’ (১৯২২), ‘রক্তকরবী’ (১৯২৬), ‘তাসের দেশ ’(১৯৩৩), ‘কালের যাত্রা’ (১৯৩২) ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ প্রধানত শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের অভিনয় শেখাতেন এবং তাদের দিয়েই অভিনয় করাতেন। তার নির্দেশনায় কলকাতাতেও শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীরা নাটকে অভিনয় করে।।  নিজের লেখা নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে সেসময় অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১১ সালে শারদোৎসব নাটকে সন্ন্যাসী এবং ‘রাজা’ নাটকে রাজা ও ঠাকুরদাদার যুগ্ম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। ১৯১৪ সালে ‘অচলায়তন’ নাটকে অদীনপুণ্যের ভূমিকায়, ১৯১৫ সালে ‘ফাল্গুনী ’নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায়, ১৯১৭ সালে ‘ডাকঘর’ নাটকে ঠাকুরদা, প্রহরী ও বাউলের ভূমিকায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

বাংলাদেশ ও ভারতে রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলো অসংখ্যবার মঞ্চায়িত হয়েছে। ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘বিসর্জন’, ‘শ্যামা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘মায়ার খেলা’, ‘বাল্মিকীপ্রতিভা’,  ‘মুক্তধারা’, ‘অচলায়তন’সহ বিভিন্ন নাটক বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চায়ন করেছে। ‘গান্ধারীর আবেদন’, ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ এবং ‘বিদায় অভিশাপ’- এই তিনটি গীতিনাট্যকে একসঙ্গে অথবা পৃথকভাবে মঞ্চে আনা হয়েছে। ঢাকার মঞ্চে পঞ্চাশের দশকে ড্রামা সার্কেল প্রথম 'রক্তকরবী' নাটক মঞ্চায়ন করে। স্বাধীনতার পর  বিটিভিতে প্রথম ‘রক্তকরবী’ নাটকে নন্দিনী চরিত্র রূপায়িত করেছিলেন দিলশাদ খানম এবং রাজা চরিত্রে ছিলেন গোলাম মুস্তাফা। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। পরবর্তীতে মঞ্চে অপি করিমসহ বিভিন্ন অভিনেত্রী ‘রক্তকরবী’তে নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো নাটক ঢাকার মঞ্চে এনেছে। এর মধ্যে ‘অচলায়তন’, ‘মুক্তধারা’ ও ‘রক্তকরবী’ উল্লেখযোগ্য। ‘দুইবোন’ ও ‘ঘরেবাইরে’ উপন্যাস দুটি নাট্যরূপ দিয়ে ফেরদৌসী মজুমদারের নির্দেশনায় মঞ্চে আনে থিয়েটার। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘শাস্তি’ মঞ্চে আনে নান্দনিক। ঢাকা লিটল থিয়েটার রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ গল্পকে শিশু কিশোরদের উপযোগী করে মঞ্চে আনে আশির দশকে। শিশু কিশোরদের জন্য নাট্যরূপ দিয়েছিলেন প্রয়াত সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ নাজমা জেসমিন চৌধুরী।

রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলো বাংলার নাট্যধারায় এক ভিন্ন যুগের সূচনা করেছিল। ঘটনার ঘনঘটা নয়, তার নাটকের মূল বিষয় মানব মনের জটিল ঘূর্ণাবর্ত, অন্তর্দন্দ্ব এবং চরিত্রগুলোর ভিতর দিয়ে আত্ম-জিজ্ঞাসা। তার নাটকগুলো দার্শনিক ভাবাধারার। রূপক নাটকের ধারারও তিনি পথিকৃৎ।

বলতে গেলে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য ধারার মতো নাটকও বিশ্বমানে উন্নীত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার স্পর্শেই।