Published : 18 Sep 2025, 12:09 PM
লালন ফকিরের গানের শিল্পীর সংখ্যা এ দেশে নেহায়েত কম না হলেও, এই গানকে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে পৌঁছে দিয়েছিলেন কেবল ফরিদা পারভীন।
এই ধারার সংগীতে কেন আর কেউ ফরিদা পারভীনের মত আলোয় আসেননি, সে প্রশ্নের ব্যাখ্যায় পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল বলেছেন, তিনি মনে করেন মূল ধারার আর কোনো শিল্পীই ফরিদা পারভীনের মত ‘দরদ’ দিয়ে লালনের গান করেননি, তাই তিনি ছিলেন ‘অনন্য’।
তিনি গ্লিটজকে বলেন, “বাংলায় বাউলেরা ছাড়াও অনেক মধ্যবিত্ত শিল্পী লালনের গান গেয়েছেন। কিন্তু কেউই ফরিদা পারভীনের মত এমন গীতিময়তার সঙ্গে, এমন সুরেলা দরদের সঙ্গে লালনের গান পরিবেশন করতে পারেননি। সে কারণে লালনের গানের জগতে ফরিদা পারভীনের একটা আলাদা আবেদন সব সময়ই রয়ে যাবে।”
লালনের জীবন ও সংগীতের ওপর ১৯৯৬ সালে তানভীর মোকাম্মেল বানিয়েছিলেন প্রামাণ্যচিত্র ‘অচিন পাখী’। ওই প্রামাণ্যচিত্রের ফরিদা পারভীনের সাক্ষাৎকার আছে। এছাড়া তানভীর মোকাম্মেলের 'নদীর নাম মধুমতী' ও 'লালন' চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ফরিদা পারভীন।
গেল ১৩ সেপ্টেম্বর ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে তানভীর মোকাম্মেলের 'অচিন পাখী' প্রামাণ্যচিত্রের ভিডিও ফেইসবুকে পোস্ট করেছেন। যে ভিডিও ঘুরছে অনেকের ফেইসবুক ওয়ালে।

প্রামাণ্যচিত্র ঘিরে ফরিদা পারভীনকে নিয়ে গ্লিটজের কথা হয় তানভীর মোকাম্মেলের সঙ্গে।
এই নির্মাতা মনে করেন, লালনের গান পরিবেশনায় ফরিদা পারভীন তার ধারায় কোনো ‘উত্তরসূরী তৈরি করে যেতে পারেননি।
“পারাটাও কঠিন। কারণ প্রত্যেক শিল্পীই তার কণ্ঠে, প্রশিক্ষণে ও ব্যক্তিত্বে আলাদা মানুষ। তবে লালনের গানের ব্যাপারে ফরিদা পারভীন একটা ভালো কাজের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তা হচ্ছে লালনের গানগুলোর স্বরলিপি তৈরি করা। এ কাজটা ঠিকমত হলে লালনের গানের উত্তরসূরীদের জন্যে খুবই উপকার হতে পারত। আমি শুনেছি কাজটা উনি শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি।"
৭১ বছর বয়সী ফরিদা পারভীন বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
গত ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ফরিদা পারভীনকে। পরে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়; সেখান থেকে আর তাকে ফেরানো যায়নি।
লালন ফকির ও ফরিদা পারভীনকে অনেকে সমার্থক বলে মনে করলেও তা মানতে নারাজ তানভীর মোকাম্মেল।
তার কথায়, “বিষয়টি আবেগের জায়গা থেকে এলেও বাস্তবে দুইজন ভিন্ন শতকের, ভিন্ন ঘরানার মানুষ।
“এটা ঠিক তিনি লালন ফকিরের গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। সে কারণে আবেগবশত কেউ ‘লালন ও ফরিদা পারভীন সমার্থক’ এ রকম কথা বলতে পারেন, তবে মনে রাখতে হবে উনারা দুই মাপের দুইজন ভিন্ন মানুষ।”
লালনকে বাউল-দার্শনিক ও গীতিকার হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “বাংলায় বাউল গানের ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের। অসংখ্য পদকর্তা বাউল গান লিখেছেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে লালন ফকির ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান, সবচেয়ে দর্শনমনস্ক ও সবচেয়ে সৃজনশীল শিল্পী। অন্য দিকে ফরিদা পারভীন একজন কণ্ঠশিল্পী যিনি রেডিও, টেলিভিশন ও অনুষ্ঠানে লালন গীতি গাইতেন।”
ফরিদা পারভীনের সঙ্গে কাজের স্মৃতি রোমন্থন করে তানভীর মোকাম্মেল বলেন, “ফরিদা পারভীন আমার তিনটে চলচ্চিত্রের জন্য গান গেয়েছেন। লালন ফকিরকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র 'অচিন পাখি', তার আগে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাহিনীচিত্র 'নদীর নাম মধুমতী' ও লালন ফকিরের জীবন ও দর্শন নিয়ে তৈরি 'লালন' চলচ্চিত্রে। ফলে উনার সঙ্গে আমার বেশ কিছু স্মৃতি রয়েছে।
“ফরিদা পারভীন সেসময় কুষ্টিয়ার বাড়িতে থাকতেন। আমরা উনার বাড়িতে গেছি সাক্ষাৎকার ও গান শুট করতে। উনার জীবনযাত্রা ছিল একান্তই বাঙালি মধ্যবিত্ত গৃহিণীসুলভ। মনে আছে আমাদের শুটিংয়ের চেয়ে ওই দিন উনি গৃহিণী হিসেবে বেশি ব্যস্ত ছিলেন আমাদের কী খাওয়াবেন, কী দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করবেন, এসব নিয়ে।

“বারবার ছুটে রান্নাঘরে যাচ্ছিলেন। শেষে আমাদের ইউনিটের বয়োজ্যেষ্ঠ ক্যামেরাম্যান আনোয়ার হোসেন ভাই প্রায় ধমকেই বলে উঠলেন; ‘আপা, ওসব রান্না-বান্না বাদ দেন তো। শুটিংয়ে মনোযোগী হন।’ তারপর উনি বসে সাক্ষাৎকার দিলেন, গানও গাইলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, মনটা তখনও অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত।”
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে লালনচর্চা ব্যাহত হবে কি না– এমন প্রশ্নে তানভীর মোকাম্মেল বলেছেন তার শূন্যস্থান পূরণ করা সহজ নয়।
“ফরিদা পারভীন ছাড়াও আরো অসংখ্য শিল্পী লালনের গান করেন। দুই বাংলার শত শত বাউল-ফকিরেরা নিয়মিত লালনের গান গেয়ে থাকেন। লালনের গান প্রায় দুই শত বছর বেঁচে আছে। এবং আমার ধারণা তা আরো শত শত বছর বেঁচে রইবে। তবে লালনের গানের অত্যন্ত সফল গায়িকা হিসেবে আরেকজন ফরিদা পারভীন সহজে সৃষ্টি হবে না।
“লালনের গান নানাভাবেই গাওয়া হয়। মধ্যবিত্ত শিল্পীরা একভাবে গান, বাউল-ফকিরেরা আরেকভাবে গান। আসলে বাংলার বাউল গানের কিন্তু একটাই সুর নেই। বাংলার যে অঞ্চলে গানটা গাওয়া হচ্ছে লালনের গানে সে অঞ্চলের সুরটা প্রাধান্য পায়। গায়ক-গায়িকারা নিজেদের অজান্তেই হয়তো সেটা করে থাকেন।”
তিনি বলেন, "উত্তরবঙ্গে দেখি ভাওয়াইয়ার মত উঁচু নিচু সুরে লালনের গান গাওয়া হয়, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বাঁকুড়া অঞ্চলে ঝুমর সুরের প্রভাব বেশি আর আমাদের ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চলে দোহারের প্রভাবটা বেশি দেখা যায়। ফরিদা পারভীন যে সুরে লালনের গান গাইতেন সেই সুরটা অনেকটাই সৃষ্টি করেছিলেন মোকছেদ আলী সাঁই। ফরিদা পারভীন তার কাছ থেকে লালনের গানের প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন।"
'অচিন পাখি' বাঁচাতে হবে, ফরিদা পারভীনের 'শেষ নির্দেশ
শেষ সাক্ষাৎকার: লালনের গানের সঙ্গে ফরিদা পারভীনের এক জীবন
'গান গাইতে না পেরে হারাম হয়েছিল ঘুম, সেদিনই বুঝেছিলাম লালনই আমার
অচিন দেশের যাত্রী হলেন লালনশিল্পী ফরিদা পারভীন
শহীদ মিনারে ফরিদা পারভীনকে শেষ বিদায়
শেষ বিদায়ে ফরিদা পারভীনকে শ্রদ্ধা
'খাঁচা ভেঙে অচিন পাখি হয়ে উড়ে গেলি': ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে শিল্পীদের শোক
ভক্তরা কাঁদলেন, 'কাঁদল' আকাশ, বিদায় নিলেন ফরিদা পারভীন
'সত্য বল সুপথে চল' থেকে ফরিদা পারভীনের শুরু, এরপর কেবল অপার হয়ে বসে থাকা
বাবা-মায়ের কবরে শায়িত হলেন ফরিদা পারভীন