হ্যাকম্যানের পেসমেকার সর্বশেষ কাজ রেকর্ড করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি।
Published : 02 Mar 2025, 01:25 PM
যুক্তরাষ্ট্রের অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যান এবং তার স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ারের মৃত্যুর দিনক্ষণ ধারণা করতে পেরেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বিবিসি লিখেছে, হ্যাকম্যান ও তার স্ত্রী মারা গেছেন তাদের মরদেহ উদ্ধারের ১০ দিন আগে, অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারিতে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারিতে হ্যাকম্যান এবং আরাকাওয়ার লাশ উদ্ধার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফের বাসা থেকে। হ্যাকম্যানের বয়স ছিল ৯৫ বছর; তার স্ত্রী আরাকাওয়ার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। তাদের কুকুরটিকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
ছয় দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে দুটি অস্কার, দুটি বাফটা, চারটি গোল্ডেন গ্লোব এবং একটি স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন হ্যাকম্যান।
‘দ্য ফ্রেঞ্চ কানেকশন’, ‘সুপারম্যান’, ‘দ্য রয়্যাল টেনেনবাউমস’ এবং ‘আনফরগিভেন’ সিনেমার জন্য ভক্তরা তাকে অনেক দিন মনে রাখবে।
মৃত্যর ঘটনা সামনে এল যেভাবে
এই ঘটনা সামনে আসে অভিনেতার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত এক কর্মী জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করার পর।
৯১১ কলের ওই রেকর্ডিং পরে বিবিসির হাতে আসে। তাতে শোনা যায়, ওই ব্যক্তি কীভাবে দুইজনের মরদেহ দেখতে পান।
হ্যাকম্যানে বাড়িটি হাইড পার্কের ওল্ড সানসেট ট্রেইল এলাকায়। হ্যাকম্যানকে পড়ে থাকতে দেখা যায় বাড়ির রান্নাঘরের পাশে একটি ঘরে। আর তার স্ত্রী আরাকাওয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বাড়ির একটি বাথরুম থেকে। বাড়িটি হাইড পার্কের ওল্ড সানসেট ট্রেইল এলাকায় অবস্থিত।
শেরিফ আদান মেনডোজা বলেন, “এই দম্পতির অনেক দিন আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।“
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য, আরাকাওয়ার মরদেহে পচন ধরেছিল। এছাড়া তার হাত ও পায়ে মমির মত হয়ে গিয়েছিল অনেকটা।
হ্যাকম্যান ও তার স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
আরাকাওয়ার মরদেহের কাছাকাছি একটি বাথরুমের আলমারিতে তাদের পোষা জার্মান শেফার্ড জাতের কুকুরটিকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে যা জানা গেছে
পুলিশ তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হ্যাকম্যান ও তার স্ত্রীর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি।
কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই মরদেহে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। তবে মৃত্যুকে ‘পর্যাপ্ত সন্দেহজনক’ বিবেচনায় নিয়ে কর্মকর্তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই তদন্তে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
সান্তা ফে শেরিফের অফিস জানিয়েছে, কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার পরীক্ষা দুজনের ক্ষেত্রেই নেগেটিভ এসেছে।
হ্যাকম্যান ও আরাকাওয়ার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে ময়নাতদন্ত ও টক্সিকোলজি পরীক্ষার অনুরোধ করা হয়েছে। যদিও সেই পরীক্ষার পর ফলাফল পেতে কয়েক মাস লাগতে পারে।
অনুসন্ধান নথিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় গ্যাস কোম্পানি ওই এলাকায় কোনো গ্যাস লিকেজের প্রমাণ পায়নি। ফায়ার ডিপার্টমেন্টও কার্বন মনোক্সাইড নিঃসরণ বা বিষক্রিয়ারও কোনো ইঙ্গিত পায়নি।
আরাকাওয়ার মাথার কাছে একটি ছোট পোর্টেবল হিটার পেয়েছেন কর্মকর্তারা। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, তিনি হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেলে সেটি উল্টে যেতে পারে।
এছাড়া আরাকাওয়ার মরদেহের বাথরুমের কাউন্টারের ওপর একটি ওষুধের বোতল ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি ওষুধ পাওয়া গেছে। সেগুলো সাধারণত থাইরয়েড ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী খেয়ে থাকেন বলে পরীক্ষায় জানা গেছে।
হ্যাকম্যানের পরনে ছিল ধূসর ট্র্যাকস্যুটের প্যান্ট, নীল ফুলহাতা টি শার্ট ও বাদামি স্লিপার। তার মরদেহের পাশে সানগ্লাস ও একটি লাঠিও পাওয়া গেছে।
হ্যাকম্যান হঠাৎ পড়ে গিয়ে আহত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এই মৃত্যুকে সন্দেহজনক মনে করা হচ্ছে কেন?
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান নথিতে বলা হয়েছে, হ্যাকম্যান ও আরাকাওয়ার মৃত্যুর পরিস্থিতি এতটাই সন্দেহজনক মনে করা হচ্ছে যে, এই ঘটনার সম্পূর্ণ তদন্তের প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছে।
জরুরি সেবা নম্বরে ফোর করা রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী বাড়ির সামনের দরজা খোলা অবস্থায় পেয়েছিলেন, এই ঘটনায় যা সন্দেহের অন্যতম কারণ।
তবে অভিনেতার বাড়িতে জোরপূর্বক কোরো প্রবেশের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি তদন্তে, এমনকি ওই বাড়ির ভেতরেও কোনো কিছু এলোমেলো ছিল না।
শেরিফ আদান মেনডোজা বলেন, "সংঘর্ষের কোনো ইঙ্গিত মেলেনি, বাড়ি থেকে কিছু চুরি হয়েছে বা কোনো কিছু অস্বাভাবিকভাবে নষ্ট হয়েছে সেই লক্ষণও নেই। অর্থাৎ বাড়িতে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটার চিহ্ন নেই যা থেকে বোঝা যাবে সেখানে কোনো অপরাধ হয়েছে।“
শেরিফ মেনডোজা জানিয়েছেন, বাড়ির ভেতরে একং বাইরে দুইটি কুকুরকে সুস্থ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর সময় সম্পর্কে কী জানা গেছে?
গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্যাকম্যানের পেসমেকার সর্বশেষ কার্যকলাপ রেকর্ড করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সেটিই তার জীবনের শেষ দিন।
তবে হ্যাকমান নাকি তার স্ত্রী আরাকাওয়া আগে মারা গেছেন সেটি নিশ্চিত করা যায়নি।
দুইজন রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী দম্পতির মরদেহ খুঁজে পান, তাদের একজন জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেন।
তারা জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের দুই সপ্তাহ আগে শেষবারের মতো এই দম্পতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছিল।
এই দুই কর্মী কেবল রক্ষণাবেক্ষণ নয় মাঝেমধ্যে বাড়ির রুটিন কাজ করতেন। তবে হ্যাকম্যান ও আরাকাওয়াকে খুব কমই সামনে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, অধিকাংশ সময় ফোন বা মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ হত কর্মীদের সাথে। আর সেই যোগাযোগ সাধারণত আরাকাওয়ার সঙ্গে বেশি হত তাদের।
দম্পতির স্বাস্থ্য কেমন ছিল?
হ্যাকম্যানের মেয়ে লেসলি অ্যান হ্যাকম্যান মেইল অনলাইনকে জানিয়েছেন, বয়স হলেও তার বাবার শারীরিক অবস্থা ‘খুব ভালো’ ছিল। এছাড়া এর মধ্যে অভিনেতার শরীরে বড় ধরনের কোনো অস্ত্রোপচার হয়নি।
অ্যান হ্যাকম্যান বলেন, "বাবা নিয়মিত যোগব্যায়াম করতেন, সত্যিই তার স্বাস্থ্য ভালো ছিল।"
অ্যান হ্যাকম্যান জানিয়েছেন ১৯৯১ সালে হ্যাকমান ও আরাকাওয়া বিয়ে করেন। তাদের দাম্পত্য জীবনবে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেছেন অ্যান হ্যাকম্যান।
বাবার সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার পুরো কৃতিত্ব অ্যান দিয়েছে আরাকাওয়াকে। তার ভাষ্য, “আরাকাওয়া বাবাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বাবার যত্ন নিতেন, খেয়াল রাখতেন।“
আরও পড়ুন