“আমরা কেবল আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিনি। হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধদের নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়েও দিয়েছি।”
Published : 04 Apr 2025, 09:06 AM
বয়সের ভারে ক্লান্ত পা চলাচলে অক্ষম। অসাড় হাত দিয়ে ঠিকমতো খেতে পারেন না। রক্তের সম্পর্কের কোনো স্বজনরা খোঁজ নেয় না। পথে পড়ে থাকা মানসিক প্রতিবন্ধী এমন কয়েকজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের ঠাঁই হয়েছে ‘আদর্শ নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রমে।
তাদের দায়িত্ব নিতে কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র মিলে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের তালতলী বাজার সংলগ্ন একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করছেন।
মূলত ২৭ জন মাদ্রাসা ছাত্র ও বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তির সহায়তায় বৃদ্ধাশ্রমটি চলে। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ সহায়তা করেন।
সম্প্রতি ‘আদর্শ নিবাস’ ঘুরে দেখা গেছে, আজাদ তালুকদারের ভাড়া বাসায় তিন রুমের ওই বৃদ্ধাশ্রমে মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ-বৃদ্ধরা থাকেন। ঘরের ভেতর পেতে রাখা ছোট ছোট চৌকিতে কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বসে রয়েছেন। তাদের কেউই ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না।
বৃদ্ধাশ্রমে কথা হয় সেবিকা ফাতেমা জান্নাতের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০২১ সালে করোনার সময় মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র খাবার বিতরণ করতে গিয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী ওইসব মানুষদের রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য প্রথমে নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বৃদ্ধাশ্রমটির যাত্রা শুরু হয়।
“পরে সেটি সরিয়ে নগরীর ভাটিখানা এলাকায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে এখন চরবাড়িয়া ইউনিয়নের তালতলী বাজার এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে এ বৃদ্ধশ্রমে ১১ জন মানসিক প্রতিবন্ধী প্রবীণ রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন বৃদ্ধ ও নয়জন বৃদ্ধা। এখানে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের কেউ নেই। সবাই অজ্ঞাত পরিচয় ও মানসিক প্রতিবন্ধী। তাদের রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই।
“তবে এখানে টাকার বিনিময়ে কাউকে রাখা হয় না। অসহায় লোকজনদের এখানে আশ্রয় দেওয়ার জন্য প্রচুর অনুরোধ আসে। কিন্তু ভাড়া বাসায় আরও রাখার সামর্থ্য নেই।”
মাদ্রাসা ছাত্র ও বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তির সহায়তায় বৃদ্ধাশ্রমটি চলে। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজও সহায়তা করেন বলে ফাতেমা জানান।
তিনি বলেন, “বর্তমানে সাড়ে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বাসায় বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করা হয়েছে। নিচে আরও একটি ইউনিট ভাড়া নেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এখানের বাসিন্দাদের সকালে নাস্তা, দুপুরে ও রাতে মাংস, মাছ ও সবজি দিয়ে ভাত দেওয়া হয়।
“তবে ভাড়া বাসায় এটা পরিচালনা করা অনেক সমস্যার। কারণ, এখানের সবাই মানসিক প্রতিবন্ধী। তাদের কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যাও রয়েছে। অনেক সময় তারা চিৎকার-চেঁচামেচিও করেন। আশপাশের মানুষ এটা সহ্য করতে চায় না। একটা স্থায়ী নিবাস হলে আশ্রমটি পরিচালনা করলে ভালো হত।”
আশ্রমটির অন্যতম উদ্যোক্তা হলেন নগরীর বেলতলা এলাকার জামেয়া ইসলামিয়া মহাদুদিয়া মাদ্রাসার ছাত্র হাফেজ তাজুল ইসলাম। অসহায় মানুষদের আশ্রয় দিতেই মূলত তাদের এই উদ্যোগ বলে জানালেন।
তিনি বলেন, ২০২১ সালের করোনাকালীন সময়ে রাস্তার অসহায় মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণের সময় তারা অনেক বয়োবৃদ্ধ মানুষ দেখতে পান; যারা মানসিক ভারসাম্যহীন, ঠিকানাহীন ও একেবারেই নিঃস্ব। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন। তাদের কপালে খাবারটাও জুটতো না। এ করুণ দৃশ্য দেখে এই অসহায় বৃদ্ধদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তোলার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘আদর্শ নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রা শুরু হয়।
তাজুল বলছিলেন, “আমাদের বৃদ্ধশ্রমটি প্রথমে চারজন নিয়ে শুরু হয়েছিল। এ উদ্যোগে শুধু মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই নয়। কলেজ এবং বিভিন্ন পেশার মানবিক মানুষ মিলিয়ে ২৭ জন সদস্য হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। নিজেদের সীমিত উপার্জন থেকে সঞ্চয় করে তারা বৃদ্ধদের জন্য খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। আমরা কেবল আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিনি। হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধদের নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়েও দিয়েছি।”
যেসব অজ্ঞাত পরিচয় মানুষরা আশ্রমে কিংবা আশ্রমের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে মারা যান, তাদের সম্মানজনকভাবে সরকারিভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান তিনি।
আরেক উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের হাটাজারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হুজাইফা তামিমি বলেন, “আমরা বিভিন্ন সময় ভবঘুরে, অসহায় মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করি। করোনার সময় রাস্তার পাশে অভিভাবকবিহীন ও অশীতিপর বৃদ্ধা-বৃদ্ধাদের দেখতে পাই। যারা কিছুই করতে পারে না। তাদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এদের রাখার জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে গিয়েছি। কেউ স্থান সঙ্কটের কথা বলেছে, কেউ অভিভাবকবিহীন এসব মানুষদের রাখতে অসম্মতি জানিয়েছে।
“এদের তো রাস্তায় ফেলে রাখতে পারি না। আবার নিজেদের বাসায়ও নিতে পারি না। তখন আদর্শ নিবাস বৃদ্ধাশ্রম করা হয়েছে। এটা আসলে গতানুগতিক বৃদ্ধাশ্রম বলা যাবে না। এখানে যাদের রাখ হয়; তাদের কেউ নেই। তাদের শেষ ঠিকানায় যাওয়া পর্যন্ত একটু পাশে থেকে সেবা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে।”
বরিশাল সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, “কয়েকজন শিক্ষার্থী যে কাজটি করেছে, এটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমি আমার সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করি। তবে বৃদ্ধাশ্রমটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন পায়নি। নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।”