Published : 12 Apr 2026, 03:57 PM
বছরের পর বছর ধরে ভারতের সিনেমার গানে নারী কণ্ঠের তালিকায় সবার ওপরে থেকেছে দুটি নাম, লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে।
এত গান, এত সুর ও সুরকার, দীর্ঘ বছরে শ্রোতা পাল্টে গেছে, বদলে গেছে প্রজন্ম। কিন্তু সহদোরাএ জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। লতা বিদায় নিয়েছেন ২০২২ সালে, ৯৩ বছর বয়সে। ছোটবোন আশার প্রয়াণ হল ৯২ এ।
মারাঠি থিয়েটারের অন্যতম পুরোধা ‘ক্লাসিক্যাল’ শিল্পী দীননাথ মঙ্গেশকরের দুই কন্যা জীবনভর শ্রোতাদের কেবল দুহাতে দিয়ে গেছেন। তাদের সুরে মোহাবিষ্ট থেকেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
রোববার জাগতিক ভ্রমণ শেষ করেন আশা। তিনি চেয়েছিলেন ‘টিকে থাকতে এবং শেষ পর্যন্ত গানের সঙ্গে থাকতে’। চাওয়া খুব একটা অপূর্ণ থাকেনি। নিয়মিত রেওয়াজ করতেন বলে লিখেছে এনডিটিভি। ৯১ বছর বয়সে তার প্রয়াত স্বামী সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণকে উৎসর্গ করে 'সাইয়াঁ বিনা' নামে একটি একক গান প্রকাশ করেন। আর শেষবার প্লেব্যাক করেন ২০২২ সালে।
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে সংগীতজীবনে পা রেখেছিলেন আশা ভোঁসলে। সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল। প্রথম প্লেব্যাক করেন মারাঠি সিনেমায়। লতার মতো বোন আশার রক্তেও যেমন সংগীত ছিল, তেমনি ছিল স্রষ্টাপ্রদত্ত কণ্ঠ এবং দ্রুত যে কোনো কিছু আয়ত্তে আনার দক্ষতা।

বড় বোনকে পাশে পেয়ে চিরকৃতজ্ঞ ছিলেন আশা। তবে শুরু থেকে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
দুই বোনের সম্পর্ক নিয়ে আশা খোলামেলাভাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমাদের নিয়ে মানুষ গুজব ছড়াত এবং ঝামেলা করার চেষ্টা করত, কিন্তু রক্তের সম্পর্কই সবচেয়ে বড়। আমার মনে আছে, মাঝে মাঝে আমরা দুজনেই যখন কোনো অনুষ্ঠানে থাকতাম এবং ইন্ডাস্ট্রির কিছু মানুষ আমাকে উপেক্ষা করে কেবল দিদির সঙ্গেই কথা বলত, যেন নিজেদের আনুগত্য প্রমাণ করতে চাইছে। পরে দিদি আর আমি ব্যাপারটা নিয়ে খুব হাসতাম।”
সমানতালে প্লেব্যাক করে গেছেন দুই বোন। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প বহু পুরোনো। সে কথা এক সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করেছিলেন আশা।
ইন্ডিয়া টুডের সঙ্গে গল্পে আশা সেই সময়ের কথা বলেন, যখন সিনেমার গানের রেকর্ডে সিনেমার নাম থাকত, শিল্পীদের নাম দেওয়া হত না।
"একটা রেকর্ড শুনে একবার এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি দিদির কণ্ঠকে আমার কণ্ঠ ভেবে ভুল করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এটা আশার গান’, আমি তখনই স্পষ্ট করে বললাম, ‘না, এটা আমি নই। এটা আমার বোনের গান।’ তখন তিনি ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘আমারই ভুল’।"
এই ঘটনাটি আশার মনে দাগ কেটেছিল।
আশা বলেছিলাম, “আমি মনে মনে ভাবলাম, যদি আমি দিদির মত একই ধরনের গলায় গান গাইতে থাকি, তাহলে যতদিন দিদি এই ইন্ডাস্ট্রিতে থাকবেন, আমি কোনো কাজই পাব না। আমার নিজের কোনো নাম-পরিচয় থাকবে না। এই ঘটনার পর, আমি আমার গানের ধরণ বদলাতে শুরু করি। পাশ্চাত্য গান শেখার জন্য আমি ইংরেজি সিনেমা দেখতে শুরু করি, তারা ইংরেজিতে কীভাবে গান গায় তা পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। আমি কাওয়ালি, গজল গাইতে শিখি, বিভিন্ন ধরনের গানে কণ্ঠের যে ওঠানামা প্রয়োজন হয়, তাও শিখি। আমি এই সবকিছু শিখতে শুরু করি।"
আট দশকের বেশি সময় ধরে ২০টি ভিন্ন ভাষায় ১১ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাওয়া শিল্পী আশা। প্রথম প্লেব্যাক করেন মারাঠি সিনেমায়।
এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমায় ‘খাতু আয়া’ গানের মধ্য দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক জগতে তার যাত্রা শুরু। তিনি প্রথম এককভাবে হিন্দি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৪৯ সালে। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ, গজলসহ বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ তিনি।
এক জীবনে কত গান, কত বিচিত্র সুরেই না গেয়েছেন আশা! যে কণ্ঠে তিনি গেয়েছেন ‘ছোটাসা বালমা’, ‘মেরা মন দর্পণ’ এর মতো রাগপ্রধান গান, তেমনি সেই কণ্ঠে গেয়েছেন ‘ভোমরা বড়া নাদান’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ এর মত আসর জমানো গান।
এসব গানে এখনো কনসার্ট মাতান শিল্পীরা। সিনেমার গানের পাশাপাশি নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক গানেও পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন আশা ভোঁসলে।
গুলাম আলীর সুরে ‘মিরাজ-ইয়ে-গজল’ সংকলন, হরিহরণের সুরে গজল সংকলন ‘অবসর-ইয়ে-গজল’, জয়দেবের সুরে ‘সুরাঞ্জলি’সহ আরও বহু গান গেয়েছেন তিনি। আশার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামও দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে শ্রোতামহলে। আবার নজরুলের গানও তুলে নিয়েছেন কণ্ঠে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আশা ভোঁসলে শর্মিলা ঠাকুর, আশা পারেখ, রেখা, উর্মিলা মাতণ্ডকর, কারিশমা কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন থেকে শুরু করে শমিতা শেঠি পর্যন্ত আরও বহু অভিনেত্রীর জন্য গান গেয়েছেন।
আশা ভোঁসলের সর্বশেষ প্লেব্যাক করেন ২০২২ সালের জ্যাকি শ্রফ অভিনীত 'লাইফ'স গুড' সিনেমায়। 'রুত ভিগে তন' গানটি গেয়েছিরেন তিনি। এছাড়া ৯১ বছর বয়সে তার প্রয়াত স্বামী সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণকে উৎসর্গ করে 'সাইয়াঁ বিনা' নামে একটি একক গান প্রকাশ করেন।
আশা রেওয়াজ করতেন নিয়মিত। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে আশা বলেছিলেন, তার রেওয়াজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকাল ৭টা থেকে ৬টা, কখনো আবার ভোর ৫টা বা দুপুরবেলায়ও রেওয়াজ করেন তিনি। ঘুম না এলে মাঝরাতেও বসতেন তানপুরা নিয়ে। আমৃত্যু তিনি গানের সঙ্গে ছিলেন।