Published : 27 Mar 2026, 10:12 PM
বিশ্ব নাট্য দিবসে আনন্দ শোভাযাত্রার পর জাতীয় নাট্যশালায় প্রীতি সম্মিলন, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হল যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নাটক।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুক্রবার বিশ্ব নাট্য দিবসে এমন সব আয়োজনে সরগরম হয়ে ওঠে ঢাকার জাতীয় নাট্যশালা।
এবারের নাট্যদিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘সহিংস বিশ্বের বিপরীতে মানবিক থিয়েটার’। নাট্যদিবস সম্মাননা দেওয়া হয় নাট্যকার ও নির্দেশক শিশির দত্তকে।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে বিশ্ব নাট্য দিবস উদযাপনে শরিক হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট (বাংলাদেশ কেন্দ্র), বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন। নাট্যসংগঠন বটতলা এবং স্বপ্নদলও দিনটি উদযাপন করেছে নাট্যপ্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে।
বিকাল ৫টায় জাতীয় নাট্যশালার সামনে থেকে একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে আবার শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়। পরে নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

সম্মাননাপ্রাপ্তির অনুভূতি জানিয়ে শিশির দত্ত বলেন, “আমাদের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় সকলকে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আজকের দিনে এটাই আমার প্রত্যাশা।”
নাট্য দিবসের বক্তৃতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন তামান্না রহমান বলেন, “একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সংস্কৃরিচর্চার ভূমিকা রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশ হবে মানবিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ, এই প্রত্যাশা আমাদের।”
এ বছর বিশ্ব নাট্য দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক বাণী দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা ও পরিচালক উইলেম ড্যাফো। অনুষ্ঠানে বাণীটির বাংলায় তরজমা পাঠ করে শোনান আইরিন পারভীন লোপা।
ড্যাফো বলেন, “বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত বিষয় হলো নতুন প্রযুক্তি এবং সামাজিক নেটওয়ার্কিং, যা সংযোগের প্রতিশ্রুতি দেয় বটে, তবে আদতে মানুষকে করে তোলে বিচ্ছিন্ন ও একাকী। যদিও প্রযুক্তি প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে, কিন্তু খুব কমই মানব বিস্ময়ের সম্পূর্ণ অনুভূতি ধারণ করতে পারে, যা থিয়েটার সৃষ্টি করতে সক্ষম।
“একজন অভিনেতা এবং থিয়েটার নির্মাতা হিসেবে আমি থিয়েটারের শক্তিতে বিশ্বাসী। এমন একটি বিভক্ত, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং সহিংস বিশ্বে থিয়েটার নির্মাতাদের চ্যালেঞ্জ হল, থিয়েটারকে কেবলমাত্র একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ বা ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যম বিবেচনা না করে এর মজ্জাগত শক্তি ব্যবহার করে মানুষ, মানবগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কোথায় এগোচ্ছি, সে প্রশ্ন করা। মহান থিয়েটারের কাজ হলো আমাদের চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং কল্পনা জগতকে উস্কে দেয়া।”

জাতীয় বাণী দিয়েছেন লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মফিদুল হক। তিনি বলেন, “বাংলা নাটক দীর্ঘ পথপরিক্রমণে আকাশ ও মাটির সম্মিলন তৈরি করে চলেছে, সেই সমীকরণ আজ আরো জরুরি হয়ে উঠেছে।
“বাংলার নাট্য আপন শক্তিতে আলিঙ্গন করবে বিশ্বনাট্য ঐতিহ্য, একই সাথে বাংলানাট্য সমৃদ্ধ করবে বিশ্বনাটককে। এমন স্পর্ধিত উচ্চারণ আজ আমাদের কাম্য। বিশ্বনাটক বহুকেন্দ্রিকতা নিয়ে বিকশিত হবে, সেটা বাস্তব করে তোলার দায়িত্ব নাটকের অজস্র কেন্দ্রের, যা স্ব-স্ব সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে বৈচিত্র্যের মধ্যে মানবের মিলন ঘটাবে, সভ্যতায় সকলের অধিকার ও অবদান নিশ্চিত করবে।”
আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, নাট্যজন দেবপ্রসাদ দেবনাথ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ। সঞ্চালনা করেন তপন হাফিজ।
উপস্থিত ছিলেন মামুনুর রশীদ, আসিফ মুনীর, ঠান্ডু রায়হান, মাসুম রেজা, মোহাম্মদ বারী, বাবুল বিশ্বাস, লাকী ইনাম।

বটতলা ও স্বপ্নদলের আয়োজন
সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে অনুষ্ঠান আয়োজন করে নাট্যসংগঠন বটতলা। বেহালা বাদন দিয়ে শুরু হয় তাদের পরিবেশনা। পরে পুতুলনাট্য পরিবেশন করে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার। বটতলার শিশু বিভাগের শিল্পীদের অভিনীত দুইটি নাটক ‘ফাংসাং’ এবং ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ মঞ্চস্থ হয়।
‘ফাংসাং’ ছোটদের একটি রূপকথার গল্প। এটি রচনা করেছেন সাদিকা রুমন। এতে প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব, কল্পনা এবং জাদুর পাখির গল্প দিয়ে এক অদ্ভুত ও আনন্দদায়ক জগতের রূপরেখা তুলে ধরে।
শাম্মী আক্তারের নাট্যরূপে ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ নাটকের গল্পে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে গল্পের বই ধার নিয়েছে শিশুরা। 'গালিভারস ট্রাভেলস’ আর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ পড়ে তাদেরও অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন জাগে। সেই স্বপ্নযাত্রারই গল্প সাজিয়েছে কিশোর বাহিনী, তাদের দলে গালিভার নাম ধারণ করে তিন বন্ধু। এরপর শুরু হয় আনন্দসফর।
একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে স্বপ্নদলের ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ নাটকের বিশেষ মঞ্চায়ন হয়। বাদল সরকারের মূল রচনা অবলম্বনে ত্রিংশ শতাব্দীর নির্দেশনা দিয়েছেন জাহিদ রিপন।
যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ ত্রিংশ শতাব্দীর মূল কাহিনী। পৃথিবীর ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির আণবিক বোমা বিস্ফোরণের অপ্রত্যাশিত পরিণতির সমান্তরালে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বসনিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান-ভারত সংঘাত, ইরাকে আগ্রাসন, কুয়েত, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, তুরস্ক, মিয়ানমারে বর্বর হামলা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের নেতিবাচকতা, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অমানবিক ঘটনাবলীসহ নানা বিষয়।