Published : 01 Jun 2026, 02:37 PM
'বনলতা সেন' যাকে জীবনানন্দ দাশ একবার কলমে এঁকেছিলেন, আর তারপর থেকে প্রতিটি পাঠক নিজের মত করে সেই চরিত্র বহন করে চলেছে সেই কতকাল ধরে। রূপসী বাংলার কবির সেই কিংবদন্তী চরিত্র 'বনলতা সেনকে' এবারের ঈদে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে এসেছেন পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। আর বনলতা সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা।
বাংলা সাহিত্যের রহস্যময় এই নারী হওয়ার চ্যালেঞ্জটা কীভাবে নিয়েছিলেন তা জানতে গ্লিটজের কথা হয় নাবিলার সঙ্গে।
আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার অডিশনের অভিজ্ঞতা, জীবনানন্দের বনলতার সঙ্গে পর্দার বনলতার পার্থক্য এবং নতুনভাবে নিজেকে প্রমাণের এক অদম্য লড়াইয়ের কথা।
সেই সঙ্গে দর্শক কেন সিনেমাটি দেখবেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী।
গ্লিটজ: 'বনলতা সেন' সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
নাবিলা: আমার কাছে আসলে সরাসরি এই চরিত্রের (বনলতা সেন) জন্য প্রস্তাব আসেনি। অন্য একটি চরিত্রের জন্য প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু চিত্রনাট্য পড়ার পর আমি পরিচালকে বলেছিলাম 'বনলতা সেন' চরিত্রটা আমি করতে চাই, যদি আপনারা মনে করেন আমি চরিত্রটা করতে পারব, তাহলে আমি আগ্রহী। তারপর আর কিছু বলেনি। অনেক দিন পর আবার ফোন করে পরিচালক বললেন, ‘যেহেতু আপনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, একটু এসে অডিশন দিয়ে যান’। এরপর অনেকগুলো অডিশনের পর আমি চূড়ান্ত হই।
কাজটি যখন আমি পেলাম তখন অবশ্যই ভালো লেগেছিল, আমি নিজেই চেয়েছিলাম কাজটা করতে, অনেকটা চেয়েই করেছি। আর যখন অডিশন দিচ্ছিলাম, মনে হয়েছে আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে, কারণ কাজটা আমি খুব করতে চাইছিলাম। চূড়ান্ত হওয়ার পর মনে হল ঠিক আছে, চ্যালেঞ্জটা নিতে চাইছিলাম, এখন নিতে পারলাম। এরপর নিজের মধ্যে একটা দায়বদ্ধতা কাজ করছিল, চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য আমাকে একশো ভাগ দিতে হবে।

গ্লিটজ: 'আয়নাবাজি' সিনেমার পর আপনি বিরতি নিয়েছিলেন, এই সময়টাতে কি নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করার তাগিদ থেকেই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন?
নাবিলা: এই চ্যালেঞ্জটা নেওয়ার মূল বিষয়টা ছিল মানুষকে জানান দেওয়া যে, আমি কাজের জন্য এখনো ফিট আছি, কাজ করতে চাই, হারিয়ে যাইনি।
‘আয়নাবাজির’ পরে একটা বিরতি আসল সেটা কোভিড মহামারীর কারণে, তারপর আমি মা হলাম। সেসময় এই লম্বা বিরতির পর ইন্ডাস্ট্রির সবাই মনে করত নাবিলা 'আউট অব সাইট, আউট অফ মাইন্ড', মানে আমি আর কাজ করব না এই ব্যাপারটা ছড়িয়ে গেল। যখন এই সুযোগটা পেলাম, মনে হল এটা কাজে লাগানো দরকার। মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে আমি এখনো আছি, চলে যাইনি, এবং চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে প্রস্তুত।
কারণ যখনই কারো সাথে দেখা হত, বলতাম কাজ করতে চাই আর ওরা বলত, 'আপনি নাকি আর কাজ করবেন না!' আমি কখনো এটা বলিনি, কিন্তু মানুষ নিজে নিজেই এই ধারণা পোষণ করে ফেলেছিল। বিশেষ করে মা হওয়ার পর মনে হচ্ছিল, এরকম একটা কাজ পেলে লুফে নিতে হবে, যাতে সেই ভাবনাটা কাটে।
গ্লিটজ: জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন', আর সিনেমার বনলতা সেনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
নাবিলা: পার্থক্য তো থাকবেই, কারণ কল্পনা একেক রকম। প্রায় সবার কল্পনায় বনলতা সেন বেশ কোমল, নমনীয়, দীঘল কালো চুলের এক সুন্দরী নারী এরকম একটা ভাবনা আছে। কিন্তু পরিচালক সেটা ভাঙতে চেয়েছেন। সিনেমায় বনলতা সেনকে বেশ স্ট্রং একটা চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। রিহার্সালের সময়ও উনি বলছিলেন যে আমার চোখ খুবই তীক্ষ্ণ হতে হবে। পরিচালকের কথায়, 'আমি আপনাকে দেখে যেন নিজেই ভয় পেয়ে যাই।' মানে সেই অর্থে ভয় নয়, বরং চরিত্রটাকে খুব দৃঢ়চিত্ত, দৃঢ়মনা একটা স্ট্রং পার্সোনালিটি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, যেটা সবার প্রচলিত নমনীয় ধারণা থেকে আলাদা।
এছাড়া পরিচালক জীবনানন্দের জীবনী পর্যালোচনা করেছেন, গবেষণা করেছেন এবং কবিতাটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে যে অর্থটা পেয়েছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বনলতা সেন চরিত্রটাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতই হবে বলে আমি আশা করছি। যেহেতু পরিচালকও একজন পাঠক উনারও কল্পনা করার অধিকার আছে এবং এই সিনেমায় উনি সেই কল্পনাটাকেই রেখেছেন।

গ্লিটজ: বনলতা সেন নিয়ে আপনার নিজের দর্শনটা কেমন?
নাবিলা: সিনেমাটি করতে গিয়ে বনলতা সেনকে আমি অনেকভাবে দেখেছি। কিন্তু একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে যখন প্রথম কবিতাটা পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল কী সুন্দর একটা রূপের বর্ণনা, খুবই সুন্দরী কেউ, নমনীয়তার প্রতীক, এমন একজন নারী যাকে আমরা জীবনে আকাঙ্ক্ষা করি।
আর এখন আমি দেখেছি অনেক দর্শক সিনেমা দেখে ফেইসবুকে পোস্টে লিখেছেন 'আমার বনলতা সেনকে সঙ্গে নিয়ে 'বনলতা সেন' দেখে এলাম।' তো সবাই তার আকাঙ্ক্ষার মানুষ, ভালোবাসার মানুষকে এই চরিত্রের সাথে মেলাচ্ছেন।
আমরা সাধারণত নারীকে নরম-সরম, সুন্দর চোখের অধিকারী হিসেবে ভাবি। কিন্তু আকাঙ্ক্ষার নারী আসলে অনেক রকমই হতে পারে। সুন্দরী হওয়ার পাশাপাশি সে একটা দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মানুষও হতে পারে। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে, এমন কেউ যে ব্যক্তিত্ববান, অল্পভাষী এবং সুন্দরী। কিন্তু একেকজনের কল্পনা একেক রকম হবেই।
গ্লিটজ: বনলতা সেন চরিত্রের জন্য প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছিলেন?
নাবিলা: অনেকদিন ধরে রিহার্সাল করতাম। যেদিন শুটিং হত, সেদিনের আগে প্রতিদিনই রিহার্সাল করতাম কস্টিউমসহ, মেকআপসহ, হেয়ারসহ এবং প্রপসসহ। আমাদের রিহার্সালে ক্যামেরা, লাইট পুরো প্রোডাকশন সব মিলিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ প্র্যাকটিস করা হত। একেবারে প্রস্তুত হয়ে তারপর সেটে গিয়েছি।
গ্লিটজ: সিনেমায় খাইরুল বাসার জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
নাবিলা: কাজের অভিজ্ঞতা সবার সাথেই খুব ভালো ছিল। সবাই খুব প্রফেশনাল ছিলেন, যার যার চরিত্র নিয়ে সবাই অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন। সবার সাথে কাজ করে ভালো লেগেছে।

গ্লিটজ: দর্শক কেন বনলতা সেন দেখবেন?
নাবিলা: আমার কাছে মনে হয়, যারা সাহিত্যপ্রেমী তাদের অবশ্যই দেখা উচিত। প্রথম দুই-তিন দিন হল ভিজিট করতে গিয়ে দেখলাম প্রচুর প্রবীণ মানুষ এসেছেন। সত্তর বছরের বেশি বয়সী, এমনকি পঞ্চাশ-ষাটের উপরেও অনেকে। শুনেছি কেউ কেউ ২০ বছর, ২৪ বছর পর প্রথমবার সিনেমা দেখতে এসেছেন।
এটা খুব ভালো লেগেছে। কারণ এই প্রবীণ দর্শকরা যে সময়ে বড় হয়েছেন, তখন ঘরে ঘরে সাহিত্যচর্চা ছিল। বিনোদনের মাধ্যম ছিল বই, কবিতা, আবৃত্তি, আড্ডায় গান। আমাদের প্রজন্ম সেখান থেকে অনেকটা সরে এসেছে, এখন বিনোদনের মাধ্যম হয়ে গেছে ফেইসবুক আর টিকটক। সিনেমার ভেতরে একটা লাইন শুরু হলেই কিছু প্রবীণ দর্শক পরের লাইনটা ধরে আবৃত্তি করছিলেন। এই দৃশ্যটা সত্যিই অসাধারণ ছিল।
আমার মনে হয়েছে, সিনেমা শুধু তরুণ প্রজন্মের জন্য কেন হবে? এই প্রবীণ দর্শকরাও আমাদের দেশের নাগরিক, তাদেরও বিনোদনের অধিকার আছে। তাছাড়া তরুণ দর্শকরাও ফেইসবুকে লিখছে যে সিনেমায় অনেক সুন্দর মেটাফোরিক ব্যাখ্যা আছে, যেটা তাদের ভালো লাগছে। যারা একটু ভিন্নধর্মী সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা নিতে চান, কিছু প্রশ্ন নিয়ে হল থেকে বের হতে চান তাদের দেখা উচিত। এটা একটু আলাদা ধাঁচের সিনেমা। দেখে ভালো লাগতেও পারে, নাও পারে কিন্তু অভিজ্ঞতাটা নেওয়া উচিত।
গ্লিটজ: সামনে কোনো পরিকল্পনা বা কাজ নিয়ে এগোচ্ছেন?
নাবিলা: উপস্থাপনার দিক থেকে অনেক শো পাচ্ছি। মে মাসটা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে তিনটা অনুষ্ঠান করতেই পারিনি, বনলতা সেনের ব্যস্ততা ছিল, পাশাপাশি আরেকটা অনুষ্ঠানের শুটিং চলছিল। উপস্থাপনায় বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং প্রজেক্ট আসছে এবং ভালো লাগছে যে অনুষ্ঠানগুলো আমাকে মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের কাজও সামনে আছে।