Published : 21 Dec 2025, 11:12 PM
দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় মর্মাহত হয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শ্রাবণী সেন, জয়তী চক্রবর্তী, সৌম্যজিৎ দাস ও প্রমিতা মল্লিক জানিয়েছেন বাঙালির আপন সংস্কৃতি বিকশিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন এই সংগঠনে হামলার ঘটনায় তারা ‘স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ’।
তবে তারা আশা রাখছেন, ফের ঘুরে দাঁড়াবে ছায়ানট। সুর-গানে-ছন্দের তালে ফিরবে এই সংগঠনটি।
কলকাতার অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’ ও বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা বলেছেন, দুই বাংলার সঙ্গীতশিল্পীদের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছায়ানট। হামলার ঘটনার ধিক্কার জানিয়েছেন তারা।
রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী শ্রাবণী সেন বলেন, “বাংলাদেশের ছায়ানটের নাম পৃথিবী জোড়া। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু গুণী শিল্পীকে আমরা পেয়েছি। আমরাও শিখি এই প্রতিষ্ঠান থেকে।“
যা ঘটেছে তা ভাবনার 'বহু বাইরে' বলে মন্তব্য করেছেন শ্রাবণী সেন।
তিনি বলেন, “সনজীদা খাতুনের ছবিও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমার মন অত্যন্ত খারাপ। কবে আবার সব ঠিক হবে, জানি না।”
ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকবার এসেছেন সঙ্গীতশিল্পী জয়তী চক্রবর্তী। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই তার অত্যন্ত কাছের বলে জানান তিনি।
জয়তীর কথায়, এমন অন্ধকার দিন যে কখনও দেখতে হবে, সেটা কল্পনাও করেননি তিনি।
“মনের মধ্যে যে ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ, হতাশা কাজ করছে, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই অসম্ভব। অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। সনজীদা খাতুন, লালন সাঁইয়ের ছবি, তবলা-হারমোনিয়াম যেভাবে মাটিতে পড়ে আছে, সেটা চোখে দেখা যায় না”, বলেন জয়তী চক্রবর্তী।
ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় কয়েকবার অনুষ্ঠান করেছেন গায়ক সৌম্যজিৎ দাস। সঙ্গে ছিলেন গায়ক-সুরকার সৌরেন্দ্র। তাদের ইচ্ছা ছিল একবার ছায়ানট ভবনে অনুষ্ঠান করার।
স্বপ্নের ও আবেগের সেই প্রতিষ্ঠান পুড়তে দেখে মন ভারাক্রান্ত সৌম্যজিতের। হারিয়েছেন কিছু বলার ভাষাও।
তিনি বলেন, “হারমোনিয়াম, তবলা পুড়তে দেখলে একজন শিল্পীর কী যন্ত্রণা হতে পারে, সেটাই হচ্ছে। তবে আশা হারালে তো চলবে না। বিশ্বাস রাখি এক দিন সব ঠিক হবে। আবার ছায়ানট থেকে ভেসে আসবে গানের সুর। তবলায় বোল উঠবে, হারমোনিয়ামে তৈরি হবে সুরের সরগম।”
ছায়ানটের অনুষ্ঠানে গান শোনানো কলকাতার গায়িকা প্রতিমা মল্লিকের কথায়, “শুধুই নজরুলগীতি বা রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানো বা পরিবেশন করা নয়, নিখুঁত ভাবে গান তোলানোর অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’।
“বাংলা এবং বাঙালির সংস্কৃতি যত্নে আগলে রাখাই যেন এই প্রতিষ্ঠানের ব্রত। সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্ণধার প্রয়াত সনজীদা খাতুন, লালন ফকিরের মতো ব্যক্তিত্বের ছবি ছিঁড়ে ফেলেছে আক্রমণকারীরা। পুড়িয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্র। তছনছ এত দিনের সংরক্ষণ। যেন বাংলার যা কিছু, তারই ধ্বংসসাধনের চেষ্টা!”
প্রয়াত সনজিদা খাতুনের সঙ্গে হৃদ্যতার কথা বলেন প্রতিমা।
হামলার ঘটনায় ধিক্কার জানিয়ে প্রতিমা বলেন, “যে গান ব্যাধি কমাতে ব্যবহৃত হয় সেই সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এর চেয়ে ঘৃণ্য ঘটনা আর কী হতে পারে! প্রতি মুহূর্তে ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি, ধিক্কার জানাচ্ছি।”
তিনি আশা রাখেন, যতই আঘাত আসুক, প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের মনে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদই পরিস্থিতি বদলে দেবে।
“শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এগিয়ে আসবেন ‘ছায়ানট’-এর ঐতিহ্য রক্ষায়। ছাই সরিয়ে যে ভাবে ফিনিক্স পাখি ডানা ঝাপটে ওঠে, সে ভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য মেনে আরও এক বার সংরক্ষিত হবে বাংলা ও বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি।“
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবরে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে ছায়ানট ভবনে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে।
৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে এসে হামলা করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। প্রথমে পার্কিং লটের দিকে আগুন দেওয়া হয়। পরে তারা ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
এ সময় হামলাকারীরা ‘ভারতের দালাল’, ‘ভুয়া’,’ নারায়ে তাকবীর’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ভাঙো’ এসব স্লোগান দেয়। প্রয়াত সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি কেটে নষ্ট করার সময় ‘নাস্তিক’ বলে সম্বোধন করে।
মিলনায়তনে হামলাকারীর যা পেয়েছেন সেটিই ভাঙচুর করে। তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পোড়ানোর পাশাপাশি ও তছনছ করা হয় বই, কাগজপত্র।
পুরো মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয় ওই রাতে। সেখানে থাকা মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্প কর্ম, কক্ষ ও অফিস রুমের বেশিরভাগ আসবাব ভেঙে ফেলা হয়।
বাদ যায়নি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও। তাদের কক্ষের আলমারির গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল ভেঙেচুড়ে ওলট পালট করা হয়েছে। রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, মূল মিলনায়তনসহ, শৌচাগারও রেহাই পায়নি ভাঙচুরের তাণ্ডব থেকে।
হামলাকারীরা সেখান থেকে বাদ্যযন্ত্রসহ নানা ধরনের সামগ্রী লুটপাটও করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, হামলাকারীদের মধ্যে একটি অংশ ছিল লুটপাটকারী। তারা বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার ভাঙচুর করে খুঁজেছে টাকা-পয়সা আছে কি না। কেউ কেউ কিছু বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে।
বাঙালিকে আপন সংস্কৃতি ও দেশীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাধীনসত্তায় বিকশিত হতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট এর আগে প্রাণঘাতি হামলার মুখেও পড়েছে।
পাকিস্তানি শাসকদের বাধা উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং তার সূত্র ধরে পরে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের জন্ম। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে এটি পরিচিতি পেয়েছে।
বর্ষবরণেই সেই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটিই ২০০১ সালে ভয়াবহ এক বোমা হামলার শিকার হয়। এতে প্রাণ য়ায় ১০ জনের এবং আহত হন বেশ কয়েকজন।
এরপরও দমে যায়নি ছায়ানট; সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সংগীতের দুই পুরোধা ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে এগিয়ে যায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
এদিন রাতের হামলার পর সংগঠনটির সদস্য, ছাত্র ও শুভাকাঙ্খীরা সোশাল মিডিয়ায় সরব হয়ে বলেছেন, এ আঘাতেও তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না।
ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাংচুর, আগুন
ছায়ানটে হামলার ঘটনায় মামলা, আসামি সাড়ে তিনশ
স্থির প্রত্যয় যাত্রায় অবিচল থাকার' অঙ্গীকার ছায়ানটের