Published : 22 Dec 2025, 12:27 AM
লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে মাথার ওপরে আকাশ তখন মেঘলা, তার মধ্যেই শিল্পীরা ধরলেন ‘ফিরে চল মাটির টানে’ গানটি; এরপর একে একে গেয়ে চলেন ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’সহ আরও কয়েকটি গান।
একের পর এক গান গেয়ে নানা বয়সের প্রায় ৪০ জন শিল্পী প্রতিবাদ জানালেন দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচীতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের বিরুদ্ধে। সংস্কৃতিবিরোধী অপশক্তি রুখে দেওয়ার বার্তা তারা দিলেন রবীন্দ্র-নজরুল ও দেশের গানে।
রোববার লন্ডনের সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই প্রতিবাদ সমাবেশ হয় স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে দর্শক সারিতে দেখা গেছে শতাধিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
শিশু কিশোরদের কণ্ঠে ‘ফিরে চল মাটির টানে’ ও ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’ গান দুটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতিক কর্মী ঊর্মি মাজহার ও গায়ক চিকিৎসক ইমতিয়াজ আহমেদ।
প্রতিবাদী সমাবেশ উত্তাল হয়ে ওঠে গানে-সুরে। ‘বাঁধ ভেঙে দাও”, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’সহ আরো কয়েকটি গান করেছেন শিল্পীরা। দর্শকরাও গলা মিলিয়েছেন শিল্পীদের সঙ্গে।
ছায়ানটে হামলার ঘটনায় ধিক্কার জানিয়ে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “দেশের অন্যতম বৃহৎ সঙ্গীত বিদ্যায়তন ছায়ানট, উদীচী এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপর হামলা আমাদের জাতিসত্তার, আমাদের মানবিক চেতনার উপর আঘাত বলেই আমরা মনে করছি।”
সরকারের কাছে বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এই ঘটনার বিচার প্রার্থনা করছি। অন্যথায় আমাদের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ জারি থাকবে।”
ঊর্মি মাজহার বলেন, “গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা লক্ষ্য করছি বাউল, লোকসঙ্গীতসহ অন্যান্য শিল্পীদের উপর বিভিন্ন সময়ে ক্রমাগত হামলা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আমাদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। এক কণ্ঠ হাজার কণ্ঠ হয়ে প্রতিবাদ করছে। সরকারকে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে।”
সমাবেশে যুক্তরাজ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজন বক্তব্য রাখেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন লুসি রহমান, হিমাংশু গোস্বামী, হাবিব রহমান, সৈয়দ নাহাস পাশা, গোলাম মোস্তফা, নুরুল ইসলাম, গোপাল দাস, মৃত্তিকা সংহিতা অথই, শামীম চৌধুরী, হামিদ মোহাম্মদসহ আরো কয়েকজন।
যুক্তরাজ্যের সকল সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই ঐক্য আগামী দিনগুলোতেও সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বজায় থাকার অঙ্গীকার এসেছে এই প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে।
সমাবেশের সমাপ্তি হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
যেভাবে আক্রান্ত হয় ছায়ানট ও উদীচী
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবরে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে ছায়ানট ভবনে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় ১৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে।
৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে এসে হামলা করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। প্রথমে পার্কিং লটের দিকে আগুন দেওয়া হয়। পরে তারা ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে
এ সময় হামলাকারীরা ‘ভারতের দালাল’, ‘ভুয়া’,’ নারায়ে তাকবীর’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ভাঙো’ এসব স্লোগান দেয়। প্রয়াত সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি কেটে নষ্ট করার সময় ‘নাস্তিক’ বলে সম্বোধন করে।
মিলনায়তনে হামলাকারীর যা পেয়েছেন সেটিই ভাঙচুর করে। তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পোড়ানোর পাশাপাশি ও তছনছ করা হয় বই, কাগজপত্র।
পুরো মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয় ওই রাতে। সেখানে থাকা মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্প কর্ম, কক্ষ ও অফিস রুমের বেশিরভাগ আসবাব ভেঙে ফেলা হয়।
বাদ যায়নি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও। তাদের কক্ষের আলমারির গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল ভেঙেচুড়ে ওলট পালট করা হয়েছে। রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, মূল মিলনায়তনসহ, শৌচাগারও রেহাই পায়নি ভাঙচুরের তাণ্ডব থেকে।
হামলাকারীরা সেখান থেকে বাদ্যযন্ত্রসহ নানা ধরনের সামগ্রী লুটপাটও করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, হামলাকারীদের মধ্যে একটি অংশ ছিল লুটপাটকারী। তারা বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার ভাঙচুর করে খুঁজেছে টাকা-পয়সা আছে কি না। কেউ কেউ কিছু বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে।
ছায়ানটে হামলার পরদিন ১৯ ডিসেম্বর ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে প্রতিবাদ জানান নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। সেদিন দিনভর এবং রাতেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা ভবনের সামনে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গেয়ে সংস্কৃতির পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
এছাড়া বাঙালির আপন সংস্কৃতি ও দেশীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাধীনসত্তায় বিকশিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ৬৪ বছরের পুরনো এই সংগঠনে হামলার ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে সোশাল মিডিয়ায়।
ছায়নটের শিক্ষক, পুরনো, বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষ ছায়ানট ভবনে হামলাকারীদের তাণ্ডবের ছবি প্রকাশ করে দায়ীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
এদিকে ছায়ানটে হামলার দিনই সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী হামলার হুমকি পেয়েছিল। একদিনের মাথায় শুক্রবার সন্ধ্যার পর পৌনে ৮টার দিকে তোপখানা সড়কে উদীচী কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংস্কার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।
ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাংচুর, আগুন
ছায়ানটে হামলার ঘটনায় মামলা, আসামি সাড়ে তিনশ
স্থির প্রত্যয় যাত্রায় অবিচল থাকার' অঙ্গীকার ছায়ানটের
ছায়ানটে ভাঙচুর-আগুন: 'ওরা আমার সন্তানের স্কুল পুড়িয়েছে'
ছায়ানটে হামলা: জাতীয় সংগীত গেয়ে প্রতিবাদ
ছায়ানট থেকে ফের ভেসে আসবে গানের সুর: কলকাতার শ্রাবণী-জয়তীদের প্রত্যাশা
রাজধানীতে উদীচীর কার্যালয়ে আগুন, আধা ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে