সিটি ভোট: জমজমাট প্রচার শেষে ভোটের অপেক্ষা

টানা তিন সপ্তাহ নগরীর প্রার্থীদের অলিগলি চষে বেড়ানো, পোস্টারে-পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সরগরম মাইকিং আর জনসংযোগ সাঙ্গ হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2020, 07:55 PM
Updated : 30 Jan 2020, 07:55 PM

প্রচারের যজ্ঞশেষে এবার ভোটারের রায়ের অপেক্ষায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রায় সাড়ে সাতশ’ প্রার্থীর সঙ্গে গোটা দেশ।

নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে দুই সিটিতে ভোটের প্রচার। শুক্রবার কেন্দ্রে কেন্দ্রে যাবে ইভিএমসহ ভোটের সরঞ্জাম।

১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে সম্পূর্ণ ভোটই গ্রহণ হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। এরই মধ্যে ইভিএম নিয়ে প্রদর্শনী ও ভোটের মহড়া শেষ হয়েছে।

নিরাপত্তার জন্য বৃহস্পতিবার নির্বাচনী এলাকায় নেমেছে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ভোটের পরিবেশ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ‘পুরোপুরি’ নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কাজ করে যাচ্ছে।

“আমি মনে করি, নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সুন্দর রয়েছে।”

বৃহস্পতিবার শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করেছেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা, শেষবারের মতো ভোটারের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন তারা। প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের স্লোগানে-স্লোগানে পুরো রাজধানী ছিল মিছিলের নগরী।

১০ জানুয়ারি থেকে ঢাকার দুই সিটি ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়। কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনার বাইরে এই নির্বাচনের প্রচারণার সময়কে বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় উৎসবমুখরই মানছেন পর্যবেক্ষকরা।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক ছিল শেষ সময়ে। উত্তরের অন্তত ৬৭টি ও দক্ষিণে অন্তত ১০৭টি লিখিত অভিযোগ পড়েছে। এরমধ্যে সবগুলোই নিষ্পত্তি করা হয়েছে জানিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়।

শেষ সময়ে এসে অননুমোদিত নির্বাচনী ক্যাম্প, পোস্টার, ব্যানার সরাতেও উদ্যোগ নেন রিটার্নিং কর্মকর্তা  ইসির যুগ্মসচিব আবুল কাসেম ও আব্দুল বাতেন।

শেষ প্রচারে আশা-শঙ্কা

বেলা ১১টায় ভাষানটেক বস্তিতে শেষ দিনের প্রচারণা শুরু করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নৌকার প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। দুপুরের পর বাড্ডার নতুনবাজার এলাকায় প্রচার চালান তিনি।

ভাসানটেক ও আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ শেষে বিকেলে নতুন বাজার এলাকায় যান আতিক। সেখানে নির্বাচনী গণমিছিলে অংশ নেন আতিকুল ইসলাম।

এ সময় আশপাশের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরাও মিছিল নিয়ে আসেন। মেয়র থাকার সময় নতুন ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে আবার ম্যান্ডেট চান আতিক।

শেষ দিনের প্রচারে নেমে নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বলে জানান গত নয় মাস ঢাকা উত্তর সিটির দায়িত্ব পালন করে আসা নৌকার মেয়রপ্রার্থী আতিক।

এক প্রশ্নে আতিকুল বলেন, “অবশ্যই, অবশ্যই শতভাগ আশাবাদী। আমি বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ। আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই মানুষের স্রোত দেখেছি। পথসভা আর পথসভা থাকে না, সেটা রূপ নেয় জনসভায়। যেখানে জনসভা করি সেটি রূপ নেয় জনসমুদ্রে। মানুষের জোয়ার নেমেছে।”

এদিন স্বামীর পক্ষে ভোট চেয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় গণসংযোগে নামেন আতিকের স্ত্রী শায়লা সাগুফতা ইসলাম।

পরিবেশ নিয়ে নানা শঙ্কা প্রকাশ করে ভোটের আগে শেষ ৪৮ ঘণ্টায় নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোটের জন্য ‘দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ’ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন আতিকুলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল।

বিকালে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় এক নির্বাচনী পথসভায় তিনি বলেন, “ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন শঙ্কা আছে, ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা আছে, তেমনিভাবে ইভিএম ব্যবহার নিয়েও শঙ্কা আছে।

“আমরা আশা করি, নির্বাচন সুষ্ঠু রাখার জন্য যাদের সব ক্ষমতা দেওয়া আছে, সেই নির্বাচন কমিশন আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক সকল পদক্ষেপ নেবে। সাধারণ ভোটাররা যেন নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোট দিতে পারেন সে ব্যবস্থা তারা নেবে।”

আনুষ্ঠানিক প্রচারের শেষ দিনে মগবাজার ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের পর সন্ধ্যার পর গুলশান এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যান তাবিথ আউয়াল।

ঢাকা দক্ষিণে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস রাজারবাগ এলাকায় বেলা ১১টায় শেষ দিনের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার বিকালে মতিঝিল এলাকায় বিজিবি সদস্যদের টহল। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

দুপুরে গোপীবাগ এলাকায় গণসংযোগ শুরু করার আগে এক পথসভায় বক্তব্য দেন তাপস। বিএনপি ১৭০ কেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র করছে বলে সেখানে অভিযোগ করেন তিনি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলেন, “আমরা কিছুটা শঙ্কিত, যদিও আমি আশা করব সকল ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হবেন এবং তাদের ভোট প্রয়োগ করবেন।

“আমরা এটাও খবর পেয়েছি, ১৭০টি কেন্দ্র দখলের একটা ষড়যন্ত্র ও পাঁয়তারা হচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করব যাতে তারা আশু পদক্ষেপ নেয়, যাতে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকে। আমি বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে নৌকার বিপুল ভোটে বিজয় হবে।”

তাপসের বক্তব্যের জবাবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইশরাক হোসেন বলেছেন, ধানের শীষের গণজোয়ার দেখে এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

”এটা একেবারে অবাস্তব কথা। আমার কাছে তথ্য আছে, আওয়ামী লীগ সারাদেশে জেলা কমিটি করে লঞ্চ ভরে ঢাকায় লোক আনতেছে। তারা পুরো ঢাকা শহরে এ কাজটি করছে। আমি খুব শঙ্কিত যে, তারা ভোটের দিন কী করতে চাচ্ছে।”

প্রচারের শেষদিন বিকালে নিজের গোপিবাগ, টিকাটুলি এলাকায় গণসংযোগ করেন বিএনপির প্রার্থী। পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চান তিনি।

ইসলামপুরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন অবিভক্ত ঢাকার প্রয়াত মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক।

এদিন ছেলের পক্ষে ভোট চেয়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন ইশরাকের মা ইশমত আরা।

পরিবেশ সুষ্ঠু আছে: সিইসি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেন, “যে কোনো সময়ের চেয়ে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে। প্রার্থীরা তাদের প্রচার চালাচ্ছেন। কোন বাধা দেখি না। আমাদের কাছে ধরপাকড়ের তথ্য নেই।”

নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কোনো ক্রিমিনাল, সন্ত্রাস, বোমাবাজ যদি এখানে আসে তাদেরকে তো পুলিশ নজরদারিতে রাখবে এবং ধরবেই। কোনো বাসা বাড়িতে তল্লাশি করা বা রেইড করা হচ্ছে না।

“অন্যান্য জায়গায় যদি বাইরে থেকে এসে থাকে সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে বলেছি, নিষ্প্রয়োজনে কেউ যেন ঢাকায় না আসে। আবার বলেছি ভোটকেন্দ্রের চারপাশে যেন নিষ্প্রয়োজনীয় কোনো জটলা না থাকে।”

“আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। ভোট দিয়ে যেন ভোটট কেন্দ্রে কেউ না থাকে এটা আমরা চাচ্ছি।”

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেছেন, আপাতত কোথাও কোনো ঝুঁকি তিনি দেখছেন না।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকে যখন ‘বহিরাগত ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী’ ঢাকায় জড়ো করার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তখনই তার এই বক্তব্য আসে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।”

‘ছোটখাটো’ যে দু-একটি ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভীতি ছড়াতে চাই না: ডিএমপি কমিশনার

সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বহিরাগতদের উপর নজরদারি রাখলেও গ্রেপ্তারের আতঙ্ক ছড়াতে চান না বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম।

 অন্যদিকে ভোটার ছাড়া ভোটকেন্দ্রে অন্য কেউ ভিড় করলে গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।

ডিএমপি কমিশনার শফিকুল বলেন, “বাহির থেকে যে মানুষ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং নানাবিধ কাজের জন্য এসেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃহস্পতিবার একুশের বইমেলার নিরাপত্তা প্রস্তুতি ঘুরে দেখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

“আমরা এসব লোকজন সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছি এবং কোন এলাকা থেকে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ আছে কি না, কোনো মামলা আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।”

র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের আগের দিন ঢাকা শহর শুধু ভোটারদের জন্যই।

“যারা প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার কাজে সহযোগিতা করতে গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন, তাদের আর ঢাকায় থাকার প্রয়োজন নেই।”

এই দুদিন ঢাকাবাসীকে পরিচয়পত্র বহনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা চাই, জরুরি বিষয় ছাড়া ঢাকাবাসীই শুধু ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অবাঞ্ছিত কেউ যেন না থাকে। নিয়ম বহির্ভূত কাজ যেই করবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

কেন্দ্রে যাবে ইভিএমসহ নির্বাচন সামগ্রী

বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ইভিএমসহ নির্বাচনী মালামাল পাঠানো হবে শুক্রবার।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও আনুষঙ্গিক মালামাল রাজধানীর ৮টি স্থান থেকে শুক্রবার বিতরণ করা হবে। দক্ষিণ সিটির ভোটের সরঞ্জামও যাবে ৮টি স্থান থেকে।

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ও বিচারিক হাকিমদের নেতৃত্বে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএন সদস্যদের মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স নির্বাচনী এলাকায় টহলে থাকবেন ।আর পুলিশসহ অঙ্গীভূত আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা থাকবেন কেন্দ্রে কেন্দ্রে।

দুই সিটির ২৪৬৮টি ভোট কেন্দ্রের ১৪ হাজার ৪৩৪টি ভোটকক্ষে শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা একটানা ভোট হবে। দুই সিটিতে ভোটের দায়িত্বে থাকবেন অর্ধলক্ষের বেশি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।

বিতর্কে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক

সিটি নির্বাচনের পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়া দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এবার দেশীয় সংস্থার ১০১৩টি ও দূতাবাসের অন্তত ৭০ জন কর্মকর্তা পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র নিয়েছেন।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে গিয়ে দূতাবাস কর্মকর্তারা যেন তাদের কর্মপরিধির সীমা লংঘন না করেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি।

বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম বলেন, “মান্যবর রাষ্ট্রদূতদের যথেষ্ট সম্মান করি। বাংলাদেশের মতো এত আদর-যত্ন কেউ করে না। সেটা তো অব্যাহত থাকবে। কিন্তু আতিথেয়তা মানে এই নয় যে কেউ সেটির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করবে।”

এই সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৭০ জনের বেশি বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে দূতাবাসগুলোর নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি ও সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকরা রয়েছেন।

কূটনীতিকদের জন্য যে নিয়ম কানুন, সেটা দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ‘প্রযোজ্য হতে পারে না’ বলে স্মরণ করিয়ে দেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচটি ইমাম।

তিনি বলেন, “তাদের কোনো কূটনৈতিক দায়মুক্তিও নেই। কাজেই তাদের বেলায় আইন কানুন যেভাবে আছে সেভাবেই যেন পালন করা হয়। তারা অনেক কিছু করতে পারবে কিংবা যেখানে সেখানে যেতে পারবে তা মনে করার সুযোগ নেই।”

এই ‘বিদেশি পর্যবেক্ষকরা’ যেন বিধি-বিধান মেনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন সি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জোরাল পদক্ষেপ চেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা।

এর আগেরদিন বুধবার নির্বাচন কমিশনে দেশিয় পর্যবেক্ষক সংস্থার কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দল অনুসারী সংস্থাগুলোই পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে এসব সংস্থা ভোট ভালো না হলেও প্রতিবেদন দেবে ‘ভালো হয়েছে’।

আইন শৃঙ্খলার চাদরে ঢাকা

বৃহস্পতিবার থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর অর্ধ লক্ষ সদস্য মাঠে থাকছেন। নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করতে দুই সিটিতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েন

নিরাপত্তা সদস্য: কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ ও আনসার-ভিডিপির সদস্য থাকছে ৪১ হাজার ৯৫৬ জন। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে  ১৮ জন করে সদস্য মোতায়েন থাকবে।

মোবাইল ফোর্স: পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে গঠিত ১২৯টি মোবাইল ফোর্সে থাকবেন ১ হাজার ২৯০ জন,

স্ট্রাইকিং ফোর্স: ৪৩টি স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকবেন ৪৩০ জন,

রিজার্ভ: রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকবেন ৫২০ জন।

র‌্যাব: দুই সিটিতে র‌্যাবের টিম থাকবে ১৩০টি। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে টিম দায়িত্ব পালন করবে। গড়ে ১১ জন করে এতে মোট ১ হাজার ৪৩০ জন র‌্যাব সদস্য থাকবেন।

রিজার্ভ: দুই সিটিতে র‌্যাবের ১০টি রিজার্ভ টিম থাকবে, তাতে ১১০ জন সদস্য থাকবেন।

বিজিবি: রিজার্ভসহ দুই সিটিতে ৭৫ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্বে পালন করবেন। প্রতি প্লাটুনে গড়ে ৩০ জন করে মোট ২ হাজার ২৫০ জন বিজিবি সদস্য থাকবেন ভোটের দায়িত্বে।

হাকিম:  ৩০ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী অপরাধ দমন ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুই সিটিতে থাকবেন ১৭২ জন নির্বাহী এবং ৬৪ জন বিচারিক হাকিম।

ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা

দুই সিটিতে দুজন রিটার্নিং অফিসার মোট ৪৩ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে এবারের সিটি নির্বাচন পরিচালনা করবেন।

প্রতি ভোটকেন্দ্রে ১ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, প্রতি ভোটকক্ষে ১ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ২ জন পোলিং অফিসার দায়িত্বে থাকবেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার বিকালে মতিঝিল এলাকায় বিজিবি সদস্যদের টহল। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

দুই সিটিতে সব মিলিয়ে ২৪৬৮ জন প্রিজাইডিং আফিসার, ১৪ হাজার ৪৩৪জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ২৮ হাজার ৮৬৮ জন পোলিং আফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।

ইভিএম কারিগরি টিম: দুই সিটি ভোটের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে প্রতি কেন্দ্রে দুইজন করে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।

সব কেন্দ্রে ইভিএম-এর ব্যবস্থাপনায় সশস্ত্র বাহিনীর ৫ হাজার ২৮০ জন সদস্য থাকবেন। তারা শুধু ইভিএম পরিচালনার দায়িত্বে পালন করবেন।

ভোট তথ্য

উত্তর সিটি করপোরেশন: সাধারণ ওয়ার্ড ৫৪টি, সংরক্ষিত ১৮টি, মোট ভোট কেন্দ্র ১৩১৮টি, মোট ভোট কক্ষ ৭৮৪৬।

মোট ভোটার ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ জন পুরুষ, ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন নারী।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫টি, সংরক্ষিত ২৫টি, মোট ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ১৫০টি, মোট ভোট কক্ষ ৬ হাজার ৫৮৮টি।

মোট ভোটার ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। তাদের মধ্যে ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ জন পুরুষ; ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন নারী।

এবার মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরসহ মোট ৭৪৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে মেয়র ১৩জন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক