সাগরে তেল, গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

“আমরা এর মধ্যে আলোচনা করেছি এবং আন্তর্জাতিক টেন্ডারও দিচ্ছি। আমরা যেন এগুলো ভালোভাবে উত্তোলন করতে পারি, অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে পারি," বলেন শেখ হাসিনা।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Feb 2024, 07:26 AM
Updated : 22 Feb 2024, 07:26 AM

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘দ্য টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট-১৯৭৪’ এর সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, "আমরা চাই আমাদের দেশ আরো এগিয়ে যাবে, তার জন্য যথাযথ বিনিয়োগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী যারা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে, তাদেরকে আমরা আহ্বান করব আমাদের সমুদ্রের তেল, গ্যাস উত্তোলনের জন্য।”

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে গত বছর জুলাই মাসে মডেল পিএসসি (চুক্তির খসড়া) অনুমোদন দেয় সরকার। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী মার্চ মাসের প্রথমভাগে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

মডেল পিএসসির নীতিমালায় বলা হয়েছে, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোম্পানির কাছ থেকে সরকার গ্যাস কিনবে। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির তেলের প্রতি ব্যারেলের বাজারমূল্যের ১০ শতাংশ।

তবে মোট উত্তোলিত গ্যাসের একটি অংশ সরকার বিনামূল্যে পাবে। কত অংশ বিনামূল্যে পাবে তা উত্তোলনকারী কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে ঠিক করা হবে।

তেল গ্যাস অনুসন্ধানকারী একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সনমবিল এর দুজন প্রতিনিধি মঙ্গলবার জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি শেভরনও বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে এর আগে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এর মধ্যে আলোচনা করেছি এবং আন্তর্জাতিক টেন্ডারও দিচ্ছি। আমরা যেন এগুলো ভালোভাবে উত্তোলন করতে পারি, অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে পারি।"

উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আজকের সেমিনারে যারা সম্পৃক্ত, বক্তব্য দেবেন বা পরামর্শ দেবেন, আন্তর্জাতিকভাবে যারা বিদেশি অতিথি এসেছে, আমি আন্তরিক ও ধন্যবাদ জানাই৷ আমি সবাইকে আহবান করব, আপনারা আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানে যারা বিনিয়োগ করবে তারা লাভবান হবেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।

"আমাদের আছে তরুণ সমাজ, অত্যন্ত মেধাবী। তাদেরকে যদি আমরা ভালোভাবে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে তৈরি করতে পারি, বাংলাদেশ আর পেছন ফিরে তাকাবে না। আমরা পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে চাই না। আমরা এগিয়ে যাব বীর দর্পে, একাত্তরে যেভাবে বিজয় অর্জন করেছি।"

দেশের সমুদ্র সম্পদ রক্ষার ওপর জোর দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, "আমরা কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হব না৷ আমাদের স্বাধীনতা রক্ষা করার মত সক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে।… স্বাধীন দেশে যা প্রয়োজন আমরা সেটা করে যাব। সেভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”

দেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তায় নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, নৌবাহিনীকে আমি ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীতে উন্নত করেছি। আসলে সব বাহিনীকেই আমি উন্নত করেছি। ভৌগলিকভাবে আমরা ছোট দেশ হলেও জনসংখ্যা দিক থেকে আমরা ছোট না। তাছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা অবদান রাখছি। সেখানে যারা কর্তব্য পালন করতে যাবে, তারা সব দিক থেকে দক্ষ হোক সেটা আমি চাই। প্রশিক্ষণটা বড় দরকার।

" ইতোমধ্যে চারটি মিলিটারি একাডেমি করা হয়েছে, আমাদের পরিকল্পনা আছে প্রত্যেকটা বিভাগে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে দেব। সমুদ্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য লোক দরকার। আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। আরো দক্ষ জনশক্তি যেন হয় সে উদ্যোগটা আমরা নেব। আমাদের সমুদ্রের যে সম্পদ রয়েছে, মৎস্য সম্পদ বা সামুদ্রিক অন্যান্য উদ্ভিদ, বিশেষ করে আমাদের খনিজ সম্পদ, তেল, গ্যাস উত্তোলন, সমস্ত কাজগুলো আমাদের করতে হবে। যেটা আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন। এগুলো নিরাপত্তার জন্য আমাদের নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করে দিচ্ছি।"

সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য ১৯৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “জাতির পিতা যেখানে রেখে গিয়েছিলেন সেখানেই পড়েছিল। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা যে রয়েছে, সেখানে আমাদের কোনো অধিকার ছিল না। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যা করে সংবিধান লঙ্ঘন করে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, ২১টা বছর তারা সমুদ্রসীমার অধিকার নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি।

"আমাদের স্থল সীমানার চুক্তি বঙ্গবন্ধু করে গিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেন। সেই সাথে সংবিধান সংশোধন করে চুক্তি বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তীতে সেটার কার্যকর করা হয়নি। ২১ বছর পর আমরা যখন সরকারে আসি, এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন কাজগুলো খুব গোপনীয়তার সঙ্গে শুরু করতে হয়েছিল। আমাদের সমুদ্রসীমা যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য জাতিসংঘে আমরা সই করে আসি।"

২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধী নিষ্পত্তির প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আজকে বিশাল সমুদ্রসীমার অধিকার রয়েছে, আমরা সম্ভাবনাময় একটা বিশাল অর্থনৈতিক এলাকা পেয়েছি, যা আমাদের অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখতে পারবে।” 

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক বিষয়ক ইউনিটের সচিব অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম। অন্যদের মধ্যে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বক্তব্য দেন।