২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজস্ব নীতি প্রণয়নে কমিশন গঠনের সুপারিশ, চালাবেন শুল্ক-কর ক্যাডাররা

সুপারিশে পরামর্শক কমিটি বলেছে, রাজস্ব কমিশন হবে সরকারের বিভাগ পদমর্যাদার। নীতি বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায়ের কাজ বর্তমানের মত এনবিআরই করবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Jan 2025, 01:31 AM

Updated : 26 Aug 2026, 11:18 AM

‘আপসকামিতা ও স্বার্থের সংঘাত’ বন্ধের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে নীতি (পলিসি) প্রণয়ন শাখা আলাদা করার সুপারিশ করেছে সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটি।

এ জন্য ‘রাজস্ব কমিশন’ গঠনের পরামর্শ দিয়ে অর্থ উপদেষ্টার কাছে একটি ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’ জমা দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনবিআর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি বিভাগ হবে, যার প্রধান হবেন জ্যেষ্ঠ সচিব পদমর্যাদা একজন চেয়ারম্যান। তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে আয়কর বা শুল্ক ক্যাডার থেকে। রাজস্ব নীতির প্রধান বা চেয়ারম্যানও হবেন শুল্ক বা আয়কর ক্যাডারের কর্মকর্তা; তার পদমর্যাদাও হবে জ্যেষ্ঠ সচিব।

বর্তমানে রাজস্ব নীতি ও প্রশাসন একত্রে কাজ করছে; যার প্রধান করা হয় প্রশাসন ক্যাডারের একজন সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিবকে। এখন যিনি দায়িত্বরত আছেন, তিনি আয়কর ক্যাডারের হলেও উপসচিব হয়ে সচিবালয়ে গিয়ে সেখান থেকেই সচিব হয়েছেন।

এর আগে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজস্ব নীতি ও প্রশাসন বিভাগ আলাদা করে একটি আদেশ জারি করেছিল। কিন্তু পরে তার বাস্তবায়ন আর হয়নি।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত অগাস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারে হাত দেয়। গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের রাজস্ব বোর্ড সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটি।

কমিটিতে আছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দীন আহমেদ, সাবেক সদস্য (কর) দেলোয়ার হোসেন, সাবেক সদস্য (শুল্ক) ফরিদ উদ্দিন ও সাবেক সদস্য (কর) আমিনুর রহমান।

মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন অর্থ উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছি।এখন শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হবে, তা সরকারই ঠিক করবে।”

‘আরও প্রতিবেদন দেওয়ার কথা আছে’ জানিয়ে সাবেক এই এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “নীতি শাখা আলাদা করার দাবি ছিল। জরুরি ভিত্তিতে আমি সেটা দিয়েছি।”

আলাদা করার ‘নীতিগত সিদ্ধান্তে’ সব পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আলাদা করার সিদ্ধান্তে ঐকমত্য থাকলেও নীতি শাখার নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, তা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয় সুপারিশ জমার আগেই। 

আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চাওয়া, নীতি শাখার নিয়ন্ত্রণে তাদেরকেই রাখা হোক। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, নীতি প্রণয়নের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) অধীনে গেলে এবং ‘অনভিজ্ঞ’ কাউকে সেখানে বসালে কর আদায়ে সমস্যা হতে পারে।

এ বিষয়ে পরামর্শক কমিটি বলেছে, নীতি শাখা আলাদা করার সুপারিশ হলেও সেটি আইআরডির অধীনে রাখার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এনবিআর থেকে নীতি শাখা পৃথক যেভাবে

পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদনে নীতি শাখা আলাদা করার যৌক্তিকতায় বলা হয়, বর্তমানে কর নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব একই সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। এর ফলে নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে ‘আপসকামিতা, দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাত ও নানা অনিয়মের’ অভিযোগ আসছে।

গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাজ একটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে করায় নীতি-নির্ধারক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নীতি প্রণয়নে বেশি সময় দিতে হয় বলেও মনে করেন কমিটির সদস্যরা। এতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এনবিআর পর্যাপ্ত কার্যক্রম নিতে পারছে না। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্ব কমিশন নামে একটি স্বাধীন সংস্থা রাজস্ব নীতি প্রণয়নের কাজ করবে। এই কমিশন সরকারের বিভাগ মর্যাদার হবে। আর নীতি বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায়ের কাজ বর্তমানের মত এনবিআরই করবে। সেজন্য এনবিআর পুনর্গঠন করতে হবে।

এনবিআরের বর্তমান কাঠামো পুনর্গঠন করে আয়কর বিভাগ (প্রত্যক্ষ কর) এবং শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগের (পরোক্ষ কর) সমন্বয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র বিভাগে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। 

সেখানে সচিব পদমর্যাদায় কর্মরত আয়কর ও কাস্টমস বিভাগের সদস্যদের মধ্য থেকে যোগ্যতম সদস্যকে সচিব/সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় বোর্ডের চেয়ারম্যান করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এনবিআর চেয়ারম্যান সরাসরি অর্থমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করবেন। রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যরা সচিবালয়ের সমপদমর্যাদাধারীদের মত সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

অন্যদিকে রাজস্ব নীতি কমিশনের ক্ষেত্রে আয়কর বা শুল্ক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠ সচিব পদমর্যাদা দিয়ে চেয়ারম্যান করা হবে। সেখানে বর্তমানের মত আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক নীতির সদস্য থাকবেন আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

এ কমিশন সরকারের উন্নয়নের নীতি কৌশল, অংশীজনদের প্রস্তাব-পরামর্শ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে নীতি প্রণয়ন করবে। আয়কর, ভ্রমণ কর, দানকর, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, আবগারি শুল্কসহ অন্য শুল্ক-কর হার নির্ধারণ করবে। 

প্রয়োজনে শুল্ক-করসংক্রান্ত বিধিবিধান প্রণয়ন, সংশোধন ও পরিবর্তন করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি দেবে। পাশাপাশি আইন ও বিধি এবং প্রজ্ঞাপনের ব্যাখ্যাও দিতে পারবে।

অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ, তথ্য বিশ্লেষক ও হিসাববিদদের জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সুপারিশে বলা হয়, সমান্তরালে একটি নীতি উপদেষ্টা পরিষদও থাকবে। সেখানে দেশের ‘স্বনামধন্য’ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, গবেষক এবং ট্যারিফ কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা থাকবেন।

ব্যবসায়ী মহল, কমিউনিটি বা নাগরিক সমাজ থেকে যেসব পরামর্শ আসবে, তা এই কমিটি বিশ্লেষণ করে এবং গবেষণা করে রাজস্ব নীতি কমিশন বা কাউন্সিলকে পাঠাবে। আবার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিটির মাধ্যমে যাচাই করে নেবে বলে প্রস্তাব রেখেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিষদ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রাজস্ব কমিশনকে নিয়মিত পরামর্শ দেবে।

পুরনো খবর

নীতি শাখা আইআরডিতে ছাড়তে নারাজ আয়কর ও শুল্ক ক্যাডাররা