Published : 23 Dec 2024, 12:33 AM
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে নীতি (পলিসি) শাখা আলাদা করার সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হলেও এর নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, তা নিয়ে নানা দাবি উঠেছে।
আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চাওয়া, নীতি শাখার নিয়ন্ত্রণে তাদেরকেই রাখা হোক। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, নীতি প্রণয়নের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) অধীনে গেলে এবং ‘অনভিজ্ঞ’ কাউকে সেখানে বসালে কর আদায়ে সমস্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে পরামর্শক কমিটি বলেছে, নীতি শাখা আলাদা করার পক্ষে সবাই একমত হলেও সেটি আইআরডির অধীনে রাখার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
গত ৮ অগাস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারে হাত দেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরে গত ৯ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ ও নাসিরউদ্দীন আহমেদ, সাবেক সদস্য (কর) মো. দেলোয়ার হোসেন, সাবেক সদস্য (শুল্ক) ফরিদ উদ্দিন এবং সাবেক সদস্য (কর) আমিনুর রহমান কমিটিতে আছেন।
সম্প্রতি একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, পরামর্শক কমিটি এনবিআর থেকে প্রশাসন ও নীতি (পলিসি) শাখা পৃথক করার বিষয়ে সুপারিশ করতে যাচ্ছে, যেখানে আইআরডির অধীনে এ শাখা পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
মূলত এমন খবর সামনে আসার পর অসন্তোষ প্রকাশ করেন আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ট্যাকসেশন) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কর কমিশনার মো. লুৎফুল আজীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "কর নীতির বিষয়টি টেকনিক্যাল। দীর্ঘদিন একটা সার্ভিসের অভিজ্ঞদের ছাড়া অন্যদের এ দায়িত্ব দেওয়া হলে কর আদায়ে সমস্যা হবে। সেটি ব্যবসাবান্ধব হবে না।
"বরং আমরা চাই, বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ রাখা হোক। প্রতিনিধি থাকুক, কিন্তু কাজটি অবশ্যই আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারদের কাছে থাকতে হবে।"
নীতি শাখা আইআরডিতে গেলে বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারদের প্রেষণে সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেজন্য এনবিআর কর্মকর্তারা চান, এ শাখা আলাদা হলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদেরও রাখা হোক।
পরামর্শক কমিটির সুপারিশ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, “আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সকলেই চায় নীতি শাখা আলাদা হোক। আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারাও চান।
"কিন্তু আইআরডির অধীনে হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত নয়। আগে কথা হয়েছিল। হালনাগাদ তথ্য হল, এটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আমরা এখনও প্রতিবেদন জমা দিইনি। দিলে বিস্তারিত বলতে পারব।"
এ বিষয়ে বিসিএস (কর) ও বিসিএস (শুল্ক ওভ্যাট) অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “পরামর্শক কমিটির সম্ভাব্য সুপারিশ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সূত্র ধরে এনবিআরের কর শুল্ক ও ভ্যাট ক্যাডারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
“এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা দ্রুত এনবিআরে যৌথসভা করেন এবং করণীয় হিসেবে পরামর্শক কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।”
কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা যা চান
কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা একটি আলাদা রাজস্ব নীতি কাউন্সিল, কমিশন বা ইউনিট করার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন পরামর্শক কমিটিতে।
তাতে বলা হয়, আয়কর বা শুল্ক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে জ্যেষ্ঠ সচিব পদমর্যাদা দিয়ে চেয়ারম্যান করার পক্ষে তারা। সেখানে বর্তমানের মত আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক নীতির সদস্য থাকবেন আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক ও নীতি বিশ্লেষকও পদেও এ দুই ক্যাডার থেকে বাছাইয়ের কথা বলেছেন তারা। এই দুই পদে তারা প্রেষণের ক্ষেত্রে যথাক্রমে গ্রেড-৩ ও গ্রেড-৫ এ পদায়ন করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ, তথ্য বিশ্লেষক ও হিসাববিদদের জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার প্রত্যাশা রাখেন এই কর্মকর্তারা।
তাদের প্রস্তাব হল, এর বাইরে সমান্তরালে একটি নীতি পরামর্শক কমিটি থাকবে। সেখানে দেশের ‘স্বনামধন্য’ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, গবেষক ও ট্যারিফ কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা থাকবেন।
ব্যবসায়ী মহল, কমিউনিটি বা নাগরিক সমাজ থেকে যেসব নীতির পরামর্শ আসবে, তা এই কমিটি বিশ্লেষণ করে এবং গবেষণা করে রাজস্ব নীতি কমিশন বা কাউন্সিলকে পাঠাবে। আবার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিটির মাধ্যমে যাচাই করে নেবে বলে প্রস্তাব রেখেছেন তারা।