Published : 30 Sep 2025, 09:12 PM
‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি এক হওয়ায়’ দেশে ১০-১৫টি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির’ জন্ম হয়েছে মন্তব্য করে তাদের ‘শাস্তি’ দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
শুধু সম্পদ জব্দ না করে তা সরকারের অধীনে নিয়ে আনার সুপারিশ করে তিনি বলেছেন, “তারা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসব গ্রুপকে বাংলাদেশ ব্যাংক শনাক্ত করে ফেলেছে। এখন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি) এর যৌথ উদ্যোগে ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’ এর জুলাই-আগস্ট সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক শক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তির স্বার্থটা যখন এক হয়ে যায়, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত অনেক কোম্পানি তৈরি হয়। শুধু তাদের সম্পদ জব্দ করাই যথেষ্ট না, এই সম্পদ উদ্ধার করে সরকারের খাতায় নিয়ে আসতে হবে।”
অনুষ্ঠানে জুলাই-অগাস্ট সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই এর মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।
সেখানে তিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলেন, “আমরা কিছু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্ম দিয়েছি। ওই সব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তলানির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও দক্ষতা যদি আমরা রক্ষা না করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে আবারও নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জন্মগ্রহণ করতে পারে।”
পরে সাংবাদিকরা ফরাসউদ্দিনের কাছে জানতে চান, নতুন জন্ম নেওয়া ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির’ সঙ্গে সরকারের আচরণ কেমন হওয়া উচিত।তার উত্তরে ফরাসউদ্দিন তার মতামত দেন।
ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে ফরাসউদ্দিন বলেন, “আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রেও এমন উদ্যোগ নিয়ে কোনো ফল আসেনি। ব্যাংক মার্জারের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি একমত না। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা হল ব্যাংক মার্জার। এর আগেরবার উদ্যোগ নেওয়ার সময়ে দ্রুত করে ফেলার পক্ষে ছিলাম। এখন যারা ব্যাংক খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা সৎ ও দক্ষ। আশা করি তারা ভালোভাবে কাজটি করতে পারবেন।”
ফরাসউদ্দিন বলেন, “কোনো একজন কুলাঙ্গারের সম্পদ থেকে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা যদি স্বাধীন থাকেন, তাহলে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার কী কারণ আছে? কিন্তু এটা হচ্ছে এবং এটা ভালো ফল দেবে বলে মনে করি না। এতে ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমে যাবে।”
তিনি বলেন, “আমি সরকারকে বলব, ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়টি খুব সীমিত রাখতে হবে। ওই যে ১০-১৫ জন কুলাঙ্গারের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।”
খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনতে শুধু সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “তফসিলি ব্যাংক দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিতে পারবে না। এটি বন্ধ করতে হবে। নইলে মূলধনীবাজার (পুঁজিবাজার) দাঁড়াতে পারবে না।”
আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন জায়গায় ‘খুব বড় ধরনের দুর্নীতি’ হয়েছে মন্তব্য করে ফরাসউদ্দিন বলেন, “এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের পথ অনুসন্ধান নিজেদের করতে হবে। বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত সঠিক পথে রয়েছে। তাই খুব সাহসের সঙ্গে নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হবে।”
প্রতি বছরে নতুন করে ২০ লাখ করদাতা শনাক্ত করার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বলেন, “আমাদের পুরনো করদাতার উপর নির্ভরতা কাটাতে না পারলে কর আদায় বাড়েবে না। জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বাড়লে কর আদায় বাড়বে না।’’
ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকদের আরো ক্ষমতা ও সুযোগ বাড়িয়ে তাদের একটি তালিকা করার সুপারিশ দেন ফরাসউদ্দিন।
অনুষ্ঠানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রত্যাশার অনেক নিচে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, “কোনো দেশে অর্থ পাচার বন্ধ থাকে না। তবে আমাদের ব্যর্থতা হল এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা। এখনো অর্থ পাচার হচ্ছে। দেশ থেকে যে হাজার লোক বিদেশে পালিয়েছেন, সবাই তো বিদেশে আগে থেকে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। ফলে তারা দেশ থেকে টাকা নিচ্ছেন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এর দায়িত্ব তদারকির জন্য একটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।
বাংলাদেশে অস্টেলিয়া দূতাবাসের উপ-প্রধান ক্লিনটন পবকে বলেন, “ব্যাংকিং, কর ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন প্রশাসনিক সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে, যদি এগুলো অব্যাহত থাকে। তবে এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশ তার সংস্কারযাত্রা অব্যাহত রাখবে বলে আশা করি।”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী বলেন, “অর্থ পাচার রোধ ও অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আজকে যারা টাকা পাচার করছে, তারা আমাদের নাগরিক সমাজের অংশ। রাষ্ট্র কেন এটাকে বন্ধ করতে পারছে না, সেটি দৃঢ়ভাবে বলা দরকার।”
সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ায় অল্পসংখ্যক গোষ্ঠী দায়মুক্তির সাথে অনিয়ম চালিয়ে গেছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে জনআস্থা দুর্বল করেছে। সরকারের উচিত বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া এবং একটি শাসন কাঠামো গ্রহণ করা, যা ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সমতুল্য।”