Published : 16 Jun 2026, 03:21 PM
গত এপ্রিল মাসে ৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা, যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি এবং সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নতুন সরকার আসার পর আমদানি বাড়াকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তারা বলছেন, নির্বাচনের পর রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং তার ফল হিসেবেই মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের নভেম্বরে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল। এর পর আর কোনো মাসেই ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি হয়নি দেশে। মাঝে দুয়েক মাস ছাড়া বেশিরভাগ মাসের আমদানি ব্যয় ছিল ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
গত মার্চ মাসেও আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার; এপ্রিলে তা এক লাফে বেড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৬১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, জুলাই-এপ্রিল সময়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই ১০ মাসে ২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ সময়ে ৫৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৫০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য হল এমন কাঁচামাল বা উপকরণ, যা চূড়ান্ত পণ্য তৈরির লক্ষ্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্লাস্টিক, তৈরি পোশাক, পাট ও হালকা প্রকৌশলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে এই পণ্যগুলো উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই ১০ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ ৭২ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ৭ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে।
এই ১০ মাসে এ খাতে ১৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে খরচ হয়েছিল ১৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।
ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল; তার সুফলও মিলেছিল। আমদানি ব্যয় বেশ কমে এসেছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, অন্তবর্তী সরকারের সময়েও তা চলতে থাকে। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে যেসব বিনিয়াগকারী এতদিন হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন অনুকুল পরিবেশের জন্য, সেই পরিবেশটা আসায় তারা এখন নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে বিনিয়োগ করছেন। নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছেন।”
এ কারণে ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “নতুন সরকারের চার মাস হয়েছে। শুরুটা ভালোই হয়েছে। সবাইকে আশা জাগিয়েছে। এরই মধ্যে বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
“এই তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ পাবেন উদ্যোক্তারা। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ বাড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আর তাতেই আমদানি বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আরও দুই-তিন মাসের তথ্য পেলে পরিস্কার বোঝা যাবে। বিদেশি মুদ্রার মজুদ এখন মোটমুটি সন্তোষজনক আছে। আমদানি বাড়লেও খুব একটা সমস্যা হবে না।”
অর্থনীতির সূচকগুলোতে এখন ভালো লক্ষণই দেখছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডলার-সঙ্কট কেটে গেছে। রিজার্ভ বাড়ছে। ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া একটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।
“এখন ক্যাপিটাল মেশিনারি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বাড়া খুবই ভালো লক্ষণ; এটা বিনিয়োগে যে মন্দা চলছিল, তা কেটে যাওয়ার আভাস দিচ্ছে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে; অর্থনীতি গতি পাবে।”
এই পর্যায়ে এসে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন করে বা সম্প্রসারণ করে কোনো উদ্যোক্তাই কিন্তু লাভের মুখ দেখতে পারবে না। তাই সুদের হার যেনো কমে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”