অক্টোবরে রেমিটেন্স বেড়েছে ১২ শতাংশ
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার পালিয়েছেন প্রবাসীরা।
সৌদি আরবে অস্থিরতা ও সংঘাতের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া অক্টোবর মাসে ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ (২.৮৭ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা প্রবাসীরা।
রেমিটেন্সের এই অঙ্ক গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। আগের মাস সেপ্টেম্বরের চেয়ে বেশি প্রায় ৪ শতাংশ।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এই সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার রেমিটেন্স প্রবাহের মাসিক এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের রেমিটেন্সের প্রধান উৎস পশ্চিম এশিয়ার দেশ সৌদি আরব। দেশটিতে বর্তমানে ৩৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। মোট রেমিটেন্সের ২০ শতাংশের মত আসে সৌদি থেকে।
কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাতের মধ্যে অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কয়েক দফা হামলা চালায়। এসব হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহতসহ আরও কয়েকজন আহত হন।
ফলে হামলাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীরা। সংকটের দ্রুত অবসান না হলে একদিকে যেমন ব্যাহত হতে পারে জনশক্তি রপ্তানি, অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রবাসী আয়ের প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অক্টোবরে সৌদি আরবে কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু তার মধ্যেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে।”
বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “নানা বাধাবিপত্তির মধ্যেও রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে এখন রেমিটেন্স। এই সূচকে ধাক্কা লাগলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে। অর্থনীতিতে সংকট আরও বাড়বে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৮ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছিল দেশে। দ্বিতীয় মাস অগাস্টে আসে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
সব মিলিয়ে এই অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ (১১.৪৬ বিলিয়ন) ডলার পালিয়েছেন প্রবাসীরা; যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ১ হাজার ১৪ কোটি ৯০ লাখ (১০.১৫ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল দেশে।
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি (৩৫.৫৯ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। বছরজুড়েই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে উল্লম্ফন ছিল। ১২ মাসের মধ্যে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে এই বছরের ৩০ জুন) ছয় মাসই ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি এসেছিল।
প্রতি মাসে গড়ে এসেছিল ২৯৬ কোটি ৫০ লাখ (২.৯৬ বিলিয়ন) ডলার। আগের অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছিল ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
একক মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত বছরের মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ (৩.৭৫ বিলিয়ন) ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৪৪ কোটি ২৬ লাখ (৩.৪৪ বিলিয়ন) ডলার আসে মে মাসে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ (৩.২২ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল ডিসেম্বরে।
তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৩ কোটি (২০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
এদিকে রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভও বর্তমানে সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুলাই-অগাস্ট মাসের ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পরও সন্তোষজনক রয়েছে রিজার্ভ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত অগাস্ট মাসের আমদানির তথ্যও প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সে হিসাবে বর্তমানের ৩১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
দুই মাস পর পর আকুর বিল পরিশোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
