Published : 17 Sep 2025, 05:56 PM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে চালু জুট টেক্সটাইল মিল প্রকল্পে সাতবছরে কেবল ২ শতাংশের মত কাজ হওয়ায় এবং ‘অনুমোদনহীন ব্যয়’ করার তথ্য দিয়ে প্রকল্পটি বন্ধ করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘শেখ হাসিনা স্পেশালাইজড জুট টেক্সটাইল মিল (প্রথম সংশোধিত সমাপ্তিকরণ)’ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে; শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তবে এখন পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণসহ ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে এসে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “আরেকটা খুব সুন্দর প্রকল্প, যেটা দেখে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা মন খারাপ করেছেন। এ সুন্দর প্রকল্প, যেটাকে আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “এখানে দুই ধরনের ব্যাপার ছিল- পাট ও তুলার সংমিশ্রণে সাশ্রয়ী মূল্যে সুতা, কাপড় ও পোশাক তৈরি করা হবে। সাশ্রয়ী সুতা কাপড় ও তৈরি পোশাক, বেনিং জ্যাকেট এগুলা তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা হবে। ভালো, ভালো আইডিয়া।
“কিন্তু কোনো কিছু করতে পারেনি। এত বছরে শুধু ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। সেটাও প্রকল্পের অনুমতি ছাড়া। তবে ভূমি অধিগ্রহণ যেহেতু হয়েছেই, তাই এর টাকাটা সরকারকে দিতেই হবে। পরে সেটা সরকারের খাস জমি হিসেবে যুক্ত হবে।”
উপদেষ্টার ভাষ্য, কেন অনুমোদন ছাড়া ব্যয় করা হল, তা নিয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) অনুসন্ধান করবে।
প্রকল্পের মূল এলাকা জামালপুর হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দেখানো হয়েছে ঢাকার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস এলাকায়। সাত বছরে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭ শতাংশ।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের আগেই প্রকল্পের ৩৪ একর জমিতে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার মাটি উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়। অথচ প্রকল্প অনুমোদন অনুযায়ী জমি উন্নয়নের বরাদ্দ ছিল মাত্র ছয় কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং অনুমোদিত কাজ ছিল ৮৫ হাজার ৬৪১ ঘনমিটার।
বাস্তবে কাজ হয়েছে অনুমোদনের প্রায় ছয় গুণ বেশি, যার ব্যয় ৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। তাতে অনুমোদনের বাইরে ২৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার কাজ হয়েছে, যা প্রকল্পের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত।
তারপরও মূল প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হওয়ায় এ প্রকল্পের ‘সমাপ্তির’ প্রস্তাব আনা হয়; যা একনেক অনুমোদন করেছে।

আরও যেসব প্রকল্প অনুমোদন পেল
এদিন সভায় আট হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার নামে নেওয়া প্রকল্পটির বাইরে আরও ১২টি প্রকল্প ছিল।
এসব প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন চার হাজার ৪৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ এক হাজার ২২৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন দুই হাজার ৬৭০ কোটি নয় লাখ টাকা।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:
>> ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারীর ক্ষমতায়নমূলক ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন; এ প্রকল্প শুরুর সময় খরচ ধরা হয়েছিল ৫৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, প্রথম সংশোধনে এটি বাড়িয়ে করা হয় ৫৮৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনে করা হয় ৬০৩ কোটি ২১ লাখ টাকা; এবার তৃতীয় সংশোধনে বেড়ে দাঁড়াল ৬৬১ কোটি ০৮ লাখ টাকা।
>> ৮৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প;
>> ৫৭৭ কোটি ২৩ টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০০০ হর্স পাওয়ার রিগ ক্রয় প্রকল্প;
>> ১ হাজার ৫৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ৪টি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ (শাহবাজপুর-৫, ৭ এবং ভোলা নর্থ-৩, ৪) এবং একটি অনুসন্ধান কূপ (শাহবাজপুর নর্থ-ইস্ট-১) খনন প্রকল্প;
>> ১৫৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় কমিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন;
>> ৬৩৬ কোটি ৯ লাখ টাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপকূলীয় এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প;
>> ২ হাজার ৫৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-২);
>> ১০৬ কোটি ০৮ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম সংশোধন)। মূল প্রকল্প ছিল ৩০১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের, এখন বেড়ে দাঁড়াল ৪০৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
>> ৪৭০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প। মূল প্রকল্প ছিল ২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকার, এখন বেড়ে দাঁড়াল ২ হাজার ৭৮০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
>> ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় কমিয়ে গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের মিরপুর পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্প;
>> ১ হাজার ১৮৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নেসকো এলাকায় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রকল্প;
>> ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী ও স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প।