আন্দোলন ও সরকার পতনের আগে ও পরের ধ্বংসযজ্ঞ, ক্ষমতার পালাবদলের পর পুলিশহীন দিনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ার মধ্যে বন্যার ভয়াবহতায় অর্থবছরের শুরুটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হল না।
Published : 04 Sep 2024, 01:42 AM
ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে মেট্রোরেলের স্টেশন ভেঙে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন অনেকে; তাণ্ডবে তছনছ হয়েছে রাজধানীবাসীর যাতায়াতে স্বস্তির বাহন হয়ে ওঠা এ মেট্রোট্রেন।
হামলার সেই দিন ১৮ জুলাই বন্ধ হওয়া মেট্রোট্রেনের চাকা আবার ঘুরেছে ২৫ অগাস্ট। এক মাস সাত দিন পর মেট্রোরেল চালু হলেও মাঝের দিনগুলোতে যানজটের পুরনো রূপ আবার ফিরেছিল রাজধানীজুড়ে। ভোগান্তির হিসাব বাদ দিলেও এতে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সেই তথ্য জানা মুশকিল।
শুধু মেট্রোরেল নয়, বিভিন্ন জায়গায় হামলা-ভাঙচুরে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করা ধ্বংসযজ্ঞের এমন ঘটনা তখনই শেষ হয়নি। সরকার পতনের পরও নির্বিচার হামলা আর আক্রমণের ঘটনা ঘটে দেশজুড়ে, চলে লুটপাটও। আন্দোলনের উত্তাল সেসব দিনে বিপুল কর্মহীন সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করেছে ধীর।
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুছিয়ে ওঠার আগেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১১ থেকে ১২টি জেলা ভাসিয়ে নিয়েছে অগাস্টের ভয়াবহ এক বন্যা। অতি ভারি বৃষ্টির মধ্যে ভারত থেকে নেমে আসা তীব্র ঢলে গত ২০ অগাস্ট থেকে দেখা দেয় এ বন্যা। অল্প সময়ের মধ্যে তা বিস্তৃত হয় জেলায় থেকে জেলায়। ফেনী ও নোয়াখালীর শহর থেকে গ্রাম ডুবে গেছে, ভেসে গেছে মানুষের বাড়িঘর, সহায় সম্বল।
বন্যার পানি জমে মহাসড়ক তলিয়ে গেলে প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য আনা ও পাঠানো একেবারে তিন দিনের মত বন্ধ হয়ে যায়। এক সপ্তাহ পর পানি নেমে যাওয়ায় ভেসে উঠতে শুরু করেছে ক্ষত। পানিতে তলিয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে। সরকাররের তরফে বলা হয়েছে, আট হাজারের বেশি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া এসব জেলায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতেই সময় লাগবে; এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও নেমেছে স্থবিরতা।
এর আগে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের এক দফায় রূপ নিলে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ে; সহিংসতা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ছাত্রদের আন্দোলন পরে ছাত্র-জনতার তুমুল গণ আন্দোলনে রূপ নিলে সরকারের পতন ঘটে ৫ অগাস্ট; প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
এরপর ভাঙচুর, হামলা ও জ্বালাও-পোড়াও ছড়িয়ে পড়ে অনেক এলাকায়। সরকার পতনের দিনই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে প্রায় শতবিঘা জমির উপর স্থাপিত অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী গাজী গ্রুপের টায়ার প্রস্তুতকারী কোম্পানি গাজী টায়ারসের কারখানায় চলে বেশুমার লুটপাট। ব্যাপক লুটপাটের পর দেওয়া হয় আগুন, যা নেভে একদিন পর।
সেদিন গেট না খোলায় ট্রাক দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢোকে হাজার খানেক ব্যক্তি। যে যেভাবে পেরেছে নিয়ে গেছে জিনিসপত্র; পিকআপে করে টায়ারসহ কারখানার পণ্য নিয়ে যেতেও দেখা যায় অনেককে।
তবে একই কারখানায় এর থেকে বেশি ভয়াবহতা দেখা যায় ২০ দিন পর, ২৫ অগাস্ট। সেদিন গাজী গ্রুপের কর্ণধার গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেপ্তার হলে বিকালেই গাজী টায়ারসের কারখানাটিতে চলে আরেক দফা লুটপাট। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এটির মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে সেদিন বাস থেকে নেমে যাত্রীরাও লুটপাটে অংশ নেয়। পরে বিশাল কারখানা ভবনে দেওয়া হয় আগুন; প্রায় ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলা আগুনে পুড়েছে ভবনটি।
পুড়ে যাওয়া সেই গাজী টায়ারসের অবকাঠামো এখন রূপকথার ভূতুড়ে প্রাসাদের মতো হয়ে গেছে; যেখানে দেখা যায় ছাই-ভস্ম, পোড়া লোহালক্কড় আর নিখোঁজদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের।
এতে কত জন মারা গেল, নিখোঁজ হলো বা এর ফলে আর্থিক ক্ষতিই বা কত তার হিসাব এখনও মিলেনি।
তবে সরকার পতনের দিন প্রথম ঘটনায় এ কারখানার ব্যবস্থাপক পর্যায়ের এক কর্মকর্তার দাবি, প্রায় হাজার কোটি টাকার টায়ার পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সেদিন কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে লুটপাট চালানো হয়েছে ৩৩ হাজার ভোল্টের জেনারেটর রুমে। টায়ার প্রস্তুতকারী এই কারখানা প্রাঙ্গণে ছয় তলা আবাসিক ভবন ও পাশের অন্তত ৫০টি টিনসেডের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ দুটো ঘটনাই সহিংস হয়ে ওঠা জুলাই-অগাস্টের গণ আন্দোলনের সময়কার ক্ষতির টুকরো চিত্র।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে মেট্রোরেলের মত তাণ্ডবের শিকার হয়েছে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষতির মুখে পড়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও।
আর ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশজুড়ে চলেছে ভাঙচুর, লুটপাট ও জ্বালাও পোড়াও। মানুষের লোভের বলি হয়েছে আগের সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলীয় নেতাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রাণহানির পাশাপাশি সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে।
সহিংসতায় জীবনযাত্রা থমকে যায়, সড়ক যোগাযোগ স্থবির হয়ে পড়ে, ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দৈনন্দিন কার্যক্রম ধীর হওয়ার স্থবির হয়ে পড়ে পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির কাজও।
জ্বালাও পোড়াও ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে কারফিউ জারির মত একের পর এক ঘটনায় রক্ত ঝরেছে রাজপথে, আন্দোলনে উত্তাল ছিল চারিদিক-যার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও।
করোনাভাইরাস মহামারী ও ইউক্রেইন যুদ্ধের ধাক্কার দুই বছর পরও যে অর্থনৈতিক সংকট চলছিল তা থেকে মুক্তির আশায় টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতা থাকা শেখ হাসিনা সরকার নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই হোঁচট খেয়েছে।
আন্দোলন ও সরকার পতনের আগে ও পরের ধ্বংসযজ্ঞ, ক্ষমতার পালাবদলের পর পুলিশহীন দিনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ায় অর্থবছরের শুরুটা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো হল না।
আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে উৎপাদন, পণ্য সরবরাহ, প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ ও রাজস্ব আহরণে ভাটা দেখা গিয়েছে; আরও ক্ষত বাড়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সবার আগে পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা
বিদেশি মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের রপ্তানিতে ধাক্কা লেগেছে সবার আগে। কারখানায় কাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি ইন্টারনেট ’শাটডাউন’ ও সহিংসতার ঘটনা ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। পণ্য রপ্তানিতে বাড়তি ঝামেলা ও ব্যয়ের চাপ সামলাতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের।
রপ্তানি আয় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকরক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক শোভন ইসলাম।
স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমনিতেই জুলাইয়ে রপ্তানি কম থাকে। তবে এ বছর কী হয়েছে তো জানেনই।”
বাংলাদেশ গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই মাসে রপ্তানি থেকে আয় করে ৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে পোশাক রপ্তানি থেকে আসে ৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮৬ দশমিক ০৫ শতাংশ।
এ খাতের ওপর ভিত্তি করেই দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বাড়ে; তবে সংঘাত আর নৈরাজ্যের পর কারফিউয়ের মধ্যে দেশের ব্যাংকিং চ্যানেল এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সবচেয়ে বড় এ খাতেই।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাইতে পোশাক খাতে রপ্তানি হয় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ কম।
এনবিআরের তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত রপ্তানি আয়ের একটা পার্থক্য থাকে মূসক আইনে রপ্তানির সংজ্ঞায়নে ভিন্নতার ফলে। শোভন বলেন, “তাই হয়ত রপ্তানি আয় এতটা নাও কমতে পারে।”
দেশের রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এ প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে উৎস হিসেবে দেখিয়ে রপ্তানি আয়ের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সদ্য সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি-ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) তথ্য প্রকাশ করলে রপ্তানির তথ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসে। এতে লেনদেনের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবের তথ্য উল্টে যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে ইপিবির তথ্য অনুযায়ী রপ্তানি হয় ৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা। আর বাংলাদেশ ব্যাংকে এই সময়ে রপ্তানি আয় আসে ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের। তাতে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ১৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান ধরা পড়ে।
এ ঘটনার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুনের এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের রপ্তানি তথ্য আর প্রকাশ করেনি ইপিবি।
এদিকে ইপিবির সঙ্গে রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার সমাধান টেনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় এসেছে দেশে।
তবে এনবিআরের তথ্য বিবেচনায় ধারণা করা হচ্ছে পোশাক খাতের রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে ধাক্কা লাগবে।
রাজস্ব আহরণে ভাটা
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা বাড়তে থাকলে ১৮ জুলাই অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন রাত থেকে বন্ধ হয়ে যায় ব্র্যাডব্যান্ড ইন্টারনেট, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল আগেই।
১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি হলে সারাদেশে সেনা নামানো হয়। বন্ধ হয়ে যায় কল কারখানার উৎপাদন। পরিবহন বন্ধ থাকায় কারখানা থেকে বন্দরে চালান পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে বন্দরে যেসব রপ্তানি পণ্য পৌঁছেছিল, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় সেগুলোর শিপমেন্ট আটকে যায়।
একই কারণে শিল্পের জন্য আমদানি করা কাঁচামাল বন্দর থেকে ছাড় হচ্ছিল না। পরে কাস্টম হাউজগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় শিল্পের কাঁচামাল ও পচনশীল পণ্য ম্যানুয়ালি খালাসের নির্দেশনা দেওয়া এনবিআর থেকে।
সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর পর এবং বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরায় আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন শুরুর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম যেমন বিঘ্ন হয়, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব আহরণেও ঘাটতির শঙ্কা বাড়ে।
এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কাস্টমসের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ ছিল ৭ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। এ অর্থবছরের জুলাইয়ের তথ্য এখনও প্রকাশ হয়নি।
তবে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের তথ্যে দেখা যায়, জুলাইয়ে কাস্টমস থেকে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “অ্যাসাইকুডার তথ্যে বকেয়াসহ দেখায়। অনেক টাকা পরিশোধ হয়নি কিন্তু যেহেতু মাল খালাসের মাধ্যমে সে পরিমাণ রাজস্ব আসার কথা, সেটিও থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, জুলাইয়ে অ্যাকচ্যুয়াল রাজস্ব আহরণ অনেক কমবে।”
মূসক ও আয়করেও একই রকম প্রভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা এ কর্মকর্তার।
বাণিজ্যে ‘অচলতার’ ফলে রাজস্ব ঘাটতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানও।
তিনি বলেন, “ইকোনমি আবার যখন ভালো হবে এর ইফেক্ট আমরা ভালোভাবে পাব।”
এনবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর রোববার দুপুরে ঢাকার আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আব্দুর রহমান খান। এর আগে সকালে তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নৈরাজ্যের ধাক্কা কাটিয়ে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন হবে এমন প্রশ্নে আব্দুর রহমান বলেন, “লক্ষ্যমাত্রা তো অর্জনের চেষ্টা করাই লাগবে। এই জন্য আমাদের অফিসারদের বলব ডিউ ডেলিজেন্স, প্লানিং এবং প্রোপার এক্সেকিউশন করতে। হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে। ইন্টেন্স হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে তাদেরকে। হার্ড ওয়ার্ক করলে রেজাল্ট আসবেই।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরকে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
আগের অর্থবছর তথা ২০২৩-২৪ এ দেওয়া হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায়ের গতি কম হওয়ায় এটি সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআর অর্থবছর শেষে এটিও আদায় করতে পারেনি। বরং রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে থেকে অর্থবছর শেষ করে এনবিআর।
সাধারণত রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় এ প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি করে থাকে। অর্থনীতির চলমান সংকটের মধ্যে জুলাই-অগাস্টের স্থবিরতায় অর্থবছর শেষে আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ২৫ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভবই ধারণা করা যায়। এনবিআরের ইতিহাসে এ ধরনের ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি’ দেখা যায়নি।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ‘কম’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুনে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ; আগের অর্থবছরের একইসময়ে যা ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল।
অর্থবছরের শেষ মাস শেষে এসে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা।
অনেকের ধারণা ছিল আগের সরকার টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসায় রাজনৈতিক ‘স্থিতিশীলতাকে’ কাজে লাগিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করে তুলবে। নতুন অর্থমন্ত্রী ও নতুন বাজেট পাওয়ায় বেসরকারি খাত চাঙ্গা হবে। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি বেড়ে নতুন নতুন বিনিয়োগও আসবে।
তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি এবং অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে সরকার পতনে সব হিসাব উল্টে যায়; ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) মো. এজাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কম হবে। এমনিই জুলাইয়ে কম থাকে। তবে আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে ‘পলিটিক্যাল আনরেস্ট’ ছিল না, এবার যেহেতু ছিল। তাই কম হওয়ার কথা।”
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
বিদেশি ঋণ ছাড়ের কী অবস্থা
ডলার সংকটের মধ্যে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিদেশি ঋণ ছাড় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমে যায় ১৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।
গত অর্থবছরের জুলাইয়ে প্রতিশ্রুত অর্থ থেকে ৪০ কোটি ৫৭ লাখ ডলার ছাড় করে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী এবং ঋণদাতা সংস্থা ও দেশ। অথচ এর আগের অর্থবছর তথা ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার; কমেছে ৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী জুলাইতে ছাড় হওয়া অর্থের পুরোটাই প্রকল্প ঋণ হিসেবে পায় বাংলাদেশ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতার মধ্যে মাসটিতে বিদেশি ঋণ ছাড়েও বড় ধাক্কা এসেছে।
উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ বিদেশি অর্থ এসেছে জুলাইয়ে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে গেছে ঋণ শোধ করতেই।
সাধারণত অর্থ ছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ কমই থাকে, যার পরিষ্কার ছাপ রয়েছে ২০২৩-২৪ ও তার আগের অর্থবছরেও।
অগাস্টের তথ্য পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
ঋণ ছাড়ের কার্যক্রমে ‘স্থবিরতা’ আছে কী না জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ন সচিব (ফাবা ও আইসিটি) সৈয়দ আশরাফুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ধারণা থেকে বলা সম্ভব না। এখনও ডেটা আসতে শুরু করেনি।
“তবে আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীদের মূল্যায়ন বাংলাদেশ নিয়ে ইতিবাচক। ফলে রাজনৈতিক ‘অস্থিতিশীলতার প্রভাব’ এখনও বোঝা যাবে না। অগাস্টের পরে বোঝা যাবে। আশা করছি, বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে সমস্যা হবে না।”
একই ধরনের সুর মেলে বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদৌলায়ে সেক’র কণ্ঠে।
গত মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের আলোচনা শেষে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধ নিয়ে শঙ্কা বা উদ্বেগ আছে কি না-এমন প্রশ্নে আবদৌলায়ে বলেন, “এটি নিয়ে কখনও উদ্বেগ ছিল না। গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অংশীদার।”
তিনি তখন আর্থিক খাতের সংস্কারে বাংলাদেশের সঙ্গ কাজের প্রতিশ্রুতিও দেন।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ডিজিটালাইজেশনে কাজের জন্য একই প্রতিশ্রুতি দেন ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের-আইএফসির কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল) মার্টিন হল্টম্যান।
বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই উন্নয়নে আগের মতোই পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে আরেক উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।
একই দিনে ইআরডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা শেষে ঋণ ছাড় ও সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “এখন প্রথম কাজ হচ্ছে, উই শুড ক্রিয়েট আ গুড ইমেজ। কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কাজের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, তারাও কমিট করেছে এক্ষেত্রে কাজ করবে।”
এলসি জটিলতা, তারল্য সংকট
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তিনি এক লাখ ডলারের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য গত ১৮ জুলাই একটি বেসরকারি ব্যাংকে আবেদন করেন। কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে এবং ব্যাংক বন্ধ থাকায় এলসি খুলতে ২৫ জুলাই লেগে যায়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমকে তিনি বলেন, “এই সংকট ছাড়াই তো ব্যাংক এলসি খুলতে গড়িমসি করে। তার মধ্যে এলসি খুলতে আরও বিলম্ব হল। তাতে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে দিনে প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি এলসি খোলা হয়। তবে ব্যাংক টানা বন্ধ থাকার সময়ে দিনে বকেয়া ঋণপত্রের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৩০-৪০ মিলিয়ন ডলার।
একই ধরনের কথা বলেন অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি- এবিসিসিআইর সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জাম হোসেনও।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংক বন্ধ থাকার কারণে এলসি খোলা তো বন্ধ ছিলই, সঙ্গে গার্মেন্ট কারখানাগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছিল। তাতে উৎপাদনে ব্যাহত হয়েছে। এখন ক্ষতি পোষাতে ছুটির দিনগুলোতেও কারখানা সচল রাখতে হবে।”
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টেফোর ডটকমকে বলেন, “কারফিউয়ের সময় ব্যাংক বন্ধ ছিল। ফলে এলসি খোলা সম্ভব হয়নি। এলসি কত কমল এই কয়দিনে, এটা মাস শেষ হলে বলা যাবে। তবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।”
জুলাই মাস শেষ হলেও সামগ্রিক এলসি কত কমল তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। তবে এটি যে স্বাভাবিকভাবেই কমবে তা উপরের পরিসংখ্যান, এলসি বন্ধ ও জটিলতার তথ্যেই বোঝা যায়।
এতে উৎপাদন ব্যহত হয়। এর সাথে যুক্ত হয় ব্যাংকের তারল্য সংকট।
“রপ্তানি আয় কম। রপ্তানি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে তারল্যও পাচ্ছি না। ফলে জুলাইয়ের বেতন দিতে সমস্যা হচ্ছে,” জানান স্প্যারো অ্যাপারেলসের শোভন ইসলাম।
তিনি বলেন, “আমরা নানাবিধ সংকটে আছি। রপ্তানি কম। ব্যাংকে আবার তারল্য সংকট।”
এডিপি বাস্তবায়ন ধীর
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যয় সাশ্রয়ের প্রভাব আগেই পড়েছিল উন্নয়ন কার্যক্রমে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছিল সংশোধিত এডিপির ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ। যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম।
আগের অর্থবছরও তথা ২০২২-২৩ অর্থবছরেও এটি ছিল ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
অর্থবছর শেষে বাস্তবায়নের মাত্রা বাড়লেও শুরুতে ছিল ‘মন্থর’। অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয় মাত্র ২৭ শতাংশ। এডিপির আওতায় অর্থ ব্যয়ের এ হার ছিল গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অথচ কেবল জুনেই বাস্তবায়ন হয় ২৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। যদিও এ পরিসংখ্যানও গেল পাঁচ বছরের মাঝে সবচেয়ে কম।
দেশে অর্থবছর আগানোর সাথে সাথে এডিপি বাস্তবায়ন প্রবণতা বাড়ে। বর্ষা, রাজস্ব আয় করে পরে বাস্তবায়ন, কর্মকর্তাদের ‘উদাসীনতা’ এমন নানা কারণ এখানে দেখা যায়।
এর ফলে অর্থবছরের প্রথম মাসে বাস্তবায়ন থাকে খুবই কম। তবে চলতি অর্থবছর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনে এর প্রবণতা ছিল আরও বেশি।
আইএমইডির যুগ্ন সচিব (সমন্বয় ও এমআইএস সেক্টর) ওয়াহিদা হামিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৪টির তথ্য পেয়েছি। ১৩টি এখনও বাকি। সবগুলোর অবস্থায়ই আগের বছরের তুলনায় ‘মন্থর’।”
গত বছর জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১ দশমিক ২৭ শতাংশ।
রেমিটেন্স ১০ মাসে সর্বনিম্ন
ইন্টারনেটবিহীন সময়ে ব্যাংক বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স আসে ১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম।
একক মাস হিসেবে জুলাইয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর পরিমাণ ১০ মাসের মধ্যে কম। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেমিটেন্স এসেছিল ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ের আগের মাস জুনে ৪৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছিল ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। তাতে ভর করে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিটেন্স আসে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি।
চলতি পঞ্জিকা বছর ২০২৪ সালে মার্চ ছাড়া সব মাসে রেমিটেন্স ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। মার্চে এসেছিল ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।
জুলাইয়ে রেমিটেন্স কম আসার কারণ হিসেবে কোরবানি ঈদের পরের মাস এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে মৃত্যু ঘিরে সহিংস রূপ পাওয়ায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকার কথা বলছেন ব্যাংকারসহ বিশ্লেষকরা।
অবশ্য গণআন্দোলনে উত্তাল জুলাইয়ের ধাক্কা কাটিয়ে অগাস্টে রেমিটেন্স বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এবার অগাস্টে রেমিটেন্স এসেছে ২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে রেমিটেন্স বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
রিজার্ভ কমেছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য মতে, জুনের শেষ দিনের তুলনায় জুলাইয়ের শেষ দিন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
জুলাই মাস শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, জুন শেষে যা ছিল ২১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
এমতাবস্থায় রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছেন সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়া অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেছেন, “রিজার্ভ থেকে কোন ডলার বিক্রি করা হচ্ছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এক ডলারও বিক্রি করা হয়নি।
‘আকাশছোঁয়া’ মূল্যস্ফীতি, ৩০ মাসে ‘কম’ মজুরি
গত ২০২২ সালের জানুয়ারির পর থেকে টানা ৩০ মাস দেশে মজুরি প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মজুরি হার সূচকে দেখা যায়, জুলাইয়ে স্বল্প মজুরি ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। জুনে যা ছিল ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অন্যদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে, যা জুনেও ছিল এক অঙ্কের ঘরে। গত অর্থবছরের শেষ মাস তথা জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এখন তাহলে করণীয় কী?
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও বাণিজ্যে স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হিসেবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “লাইন অর্ডার ঠিক করা, ব্যাংকের তারল্য সংকট কমানো ও এলসি জটিলতা কাটানো, এনবিআরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ ও বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এমন আইন ও বিধান বাতিল করতে হবে।”
অর্থনীতি ও ব্যাবসা সংক্রান্ত দেশের সকল তথ্য সঠিকভাবে পাওয়ারও দাবি তুলেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের দাবিগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি। মাত্র ১৪ দিন তারা দায়িত্ব নিয়েছেন। কোনো কিছু ওভার নাইট পরিবর্তন হয়ে যাবে না। আমাদের সকলকে সাহায্য করতে হবে।
”তবে আমরা আশাবাদী, দ্রুত সময়ে সংকট থেকে বেরিয়ে আসব।”
গণ আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া চলমান অর্থনৈতিক ক্ষত সারাতে অর্থবছরের “লক্ষ্যগুলো পুনঃনির্ধারণ, নতুন প্রকল্পে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা ও বাজার ব্যবস্থাপনায়” জোর দেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “গণ আন্দোলনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ব্যহত হয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। তবে এখনও অর্থবছরের সাড়ে ১০ মাস আছে। দ্রুত সব ঠিক হবে না, তবে আরেকটু সময় নিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
“মধ্যমেয়াদে সংকট কাটাতে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল সেগুলো পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। বিশেষত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী রিভিজিট করতে হবে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা রিভিজিট করতে হবে।”
আন্দোলন ঘিরে ভাংচুর হওয়া অবকাঠামো ও সরকারি ব্যবস্থাপনা পুনরায় সাজাতে অর্থ লাগবে। সেক্ষেত্রে রাজস্ব লক্ষ্য কমিয়ে সমাধান কীভাবে হবে জানতে চাইলে সামষ্টিক অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, “রাজস্ব কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সেই ব্যবস্থা তো নিতেই হবে। ঋণ খেলাপি ও কর খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
“একইসাথে যেসকল মেগা প্রকল্প সমাপ্য, সেগুলো বাদে নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। অবশ্যই সেগুলো নির্বাচিত হতে হবে।”
স্বল্পকালীন সময়ের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আমদানি কার্যক্রম সচল রাখায় জোর দিতে হবে।”
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির পূণরুদ্ধারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘সময় নিয়ে’ আসন্ন নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।
আওয়ামী সংশ্লিষ্ট শিল্পগ্রুপের কী হবে?
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংক ও আর্থিক খাতেও পালাবদলের হাওয়া লাগে। তখন আবার আলোচনায় আসে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস আলমের নাম; যার বিরুদ্ধে আগের সরকারের সময় ‘প্রভাব‘ খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানায় আসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সরকার পতনের পরদিনই বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপকে বিতাড়িত করার দাবি ওঠে। এ নিয়ে গোলাগুলির মতো ঘটনাও ঘটে। তার মালিকানাধীন আরেক ব্যাংক এসআইবিএলেও বিক্ষোভ করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এর মাঝেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম মালিক সালমান এফ রহমানকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হকার শাহজাহানকে (২৪) হত্যার অভিযোগে সদরঘাট থেকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিলে এ শিল্পগ্রুপের পরিচালনা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এরমধ্যেই বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির পরিচালক পদ হারান সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান (শায়ান এফ রহমান)। ব্যাংকটির পর্ষদ থেকে বাদ যাওয়ায় ভাইস চেয়ারম্যানের পদও হারিয়েছেন তিনি।
প্রবল গণ আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকারের আমলে অবৈধ সুবিধা, নানান সমালোচনা ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত দেশের বড় শিল্প গোষ্ঠী যাদের বিষয়ে নানান অভিযোগ আসছে সেগুলোর কী হবে জানতে চাইলে মীর নাসির বলেন, “সরকার সম্ভবত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হাত দেবে না।
”তবে কোন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ঊর্ধ্বতনরা বিদেশে পালিয়ে গেলে এবং সেখানে জনগণের স্বার্থ থাকলে আন্তর্জাতিক বিধান ও প্রাক্টিস অনুযায়ী ব্যবস্থাপক নিয়োগ দিতে পারেন সরকার।”
জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই মত দেন তিনি।
আরও পড়ুন:
স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ীরা
১৩ বছরে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন
নৈরাজ্যের ধাক্কা কতটা ভোগাবে, শঙ্কায় পোশাক খাত
জুলাইয়ে রেমিটেন্স কমল সাড়ে ৩%, দশ মাসে সর্বনিম্ন